ঈদযাত্রায় যাত্রীদের বিভিন্ন স্থানে ভোগান্তি শুরু হয়ে গেছে
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া :অফিস-আদালত, গার্মেন্টস ও শিল্প-কারখানায় এখনও ছুটি শুরু হয়নি।ঘরে ফেরার জন্য মানুষ সেভাবে পথে নামেননি। অথচ ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ ও সিলেটগামী যাত্রীদের বিভিন্ন স্থানে ভোগান্তি শুরু হয়ে গেছে। নরসিংদীর মাধবদী থেকে পাঁচদোনা পর্যন্ত যানজটে ঢাকা-সিলেট, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশপাশ জেলার মানুষ আটকে পড়ছেন। দক্ষিণের ২১ জেলার যাত্রীরা পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং শিমুলিয়া-মাঝিরকান্দি রুটে ফেরি পারের জন্য ঘাটেই কাটছে কয়েক ঘণ্টা। রাজধানীর উত্তরা থেকে আশুলিয়া হয়ে বাইপাইল পর্যন্ত যানজট প্রতিদিনের চেনা চিত্র। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলায় উন্নয়ন কাজের জন্য সড়ক সরু হওয়ায় ধীরে চলছে গাড়ি।প্রতিনিধিরা সরেজমিন এমন চিত্রই পেয়েছেন। পরিবহণসংশ্লিষ্টরা জানান, বৃহস্পতিবার সব ধরনের প্রতিষ্ঠান ছুটির পর পথে মানুষের ঢল নামবে। এতে অন্যান্য মহাসড়কেও গাড়ির চাপ বেড়ে যাবে। তখন সংকট আরও বাড়তে পারে।এদিকে হাইওয়ে পুলিশের এক প্রতিবেদনেও মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ ১১টি স্থানে সাত কারণে ঈদযাত্রায় যানজটের আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের যাত্রীদের ভোগান্তি বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। যেসব স্থানে বেশি যানজট হতে পারে সেগুলোর মধ্যে আছে-বাইপাইল মোড়, বাইপাইল-ধউর ব্রিজ, টঙ্গী ব্রিজ থেকে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা, গাজীপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সফিপুর বাসস্ট্যান্ড। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুর থানাধীন গোড়াই মোড় ও কালিয়াকৈরের উত্তর হিজলাতলীতেও যানজট হতে পারে। এছাড়াও রয়েছে এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু, নকলা ব্রিজ থেকে হাটিকুমরুল মোড়, ভূইয়াগাঁতি থেকে চান্দাইকোনো পর্যন্ত, মেঘনা টোল প্লাজা এবং সাটুরিয়ার গোলড়া বাসস্ট্যান্ড। সাত কারণে এসব স্থানে যানজটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণগুলো হলো-বাস স্টপেজ না থাকা, চলমান উন্নয়নকাজ, ভাঙা-সরু রাস্তা, দুর্বল ও নলকা ব্রিজ, টোল প্লাজায় পর্যাপ্ত বুথের অভাব, রাস্তা খানাখন্দে ভরপুর এবং মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন।তবে জনদুর্ভোগ সহনীয় রাখতে উত্তরবঙ্গের যাতায়াত পথের নওজোর, সফিপুর, গড়াই ও নলকা সড়ক সেতু খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগ। সড়কের বিভিন্ন স্থানে সংস্কার করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে বসছে সিসি ক্যামেরা। রোববার থেকে ঈদ পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে হাইওয়ে পুলিশের ১৭১টি মোবাইল ডিউটি ও ১১৯টি পকেট ডিউটি মোতায়েন করেছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১৮টি ওয়াচ টাওয়ার ও ১৪টি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং শিমুলিয়া-মাঝিরকান্দি রুটে ফেরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়। মাঝিরকান্দিতে নতুন ফেরিঘাটও নির্মাণ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।ঈদের বাড়তি যাত্রী চাপ সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি আছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম। রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এবার কোভিড পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ বেশি থাকবে। সেটা বিবেচনায় রেখে আমাদের অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে।
ভোগান্তি হ্রাসে নেওয়া পদক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পরিবহণ মালিকদের কিছু সুপারিশ ছিল, আমরা সেগুলো বিবেচনায় নিয়েছি। যানজট যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে, ডেডলক যেন না থাকে। এখনো কিছু কিছু জায়গায় কাজ অসম্পন্ন রয়েছে। আমরা সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছি। ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ঠিকভাবে হলে ঈদে যানজট সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘জয়দেবপুর মোড় থেকে এলেঙ্গা মোড় পর্যন্ত তিনটি ফ্লাইওভার ছিল; বাজার, শহর থাকায় এখানে যানজট সব সময় লেগেই থাকত। নওজোর, সফিপুর ও গড়াই তিনটি ফ্লাইওভার আমরা কালকের (সোমবার) মধ্যে খুলে দিচ্ছি। আমি রোববার এটা সরেজমিন দেখার জন্য গিয়েছি, দেখেছি এটা খুলে দেওয়ার মতো। এ তিনটি ফ্লাইওভার খুলে দিলে সমস্যা অনেকটা দূর হবে।’ তিনি আরও বলেন, এলেঙ্গা মোড়ে ইন্টারসেকশনগুলো চওড়া করে দিচ্ছি। বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে যে গাড়ি আসবে সেগুলো তারাকান্দা, মধুপুর, ঘাটাইল দিয়ে জামালপুর ও ময়মনসিংহে যাওয়ার একটা রাস্তা আছে। হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে, ময়মনসিংহ-জামালপুরের গাড়িগুলো সেদিক দিয়ে ডাইভার্ট করার একটা অপশন আমরা রেখেছি।ঈদযাত্রায় ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চালানো যানজটের একটা কারণ। এ বিষয়ে পদক্ষেপ জানতে চাইলে তিনি বলেন, একসঙ্গে গার্মেন্টস ছুটির পর একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। তখন টঙ্গীর কোনো কোনো মোড় থেকে ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি ছাড়া হয়, মানুষ ট্রাকে করে যান। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ততটা কঠোর থাকতে পারে না, মানবিক একটা আপিলও থাকে। এটাই বাস্তবতা।তবে এখনই কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবহণসংশ্লিষ্টরা। সোহাগ পরিবহণের মালিক ফারুক তালুকদার সোহেল বলেন, বাসে যাত্রী সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের যাতায়াতের ফেরিঘাটের অবস্থা বেশি খারাপ। ফেরি পার হতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগছে। সেখানে একটি সিন্ডিকেট কাঁচা তরকারিবাহী গাড়ি পারাপারের নামে টাকার বিনিময়ে ট্রাক পার করছে। যাত্রীবাহী বাস আটক থাকছে। শ্যামলী এনআর পরিবহণের মালিক রাকেষ ঘোষ বলেন, উত্তরবঙ্গে যেতে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত, সিরাজগঞ্জের নলকা সেতু এবং বগুড়া পার হতে কিছু সমস্যা হচ্ছে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাটেও সমস্যা আছে। এ কারণে যাত্রীরা কিছুটা ভোগান্তিতে পড়ছেন। তবে এবার দীর্ঘ ছুটি থাকায় থেমে থেমে যাত্রীরা যাবেন। এ কারণে বড় ধরনের ভোগান্তি হবে না বলে মনে করছি।
পুলিশের প্রতিবেদনে ভোগান্তির শঙ্কা : হাইওয়ে পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরবঙ্গগামী সড়কের আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের বিভিন্ন স্থান থেকে ইপিজেড ও অন্যান্য গার্মেন্ট শ্রমিকরা বাসে উঠেন। বাস স্টপেজ না থাকায় যত্রতত্র বাস থামে। ফলে প্রতি ঈদে এসব স্থানে তীব্র যানজট হয়। সফিপুর বাসস্ট্যান্ডে যানজটের অন্যতম কারণ হলো নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার, ব্রিজ ও রাস্তার কাজ চলমান থাকা। মির্জাপুরের গোড়াই মোড়ে ফ্লাইওভার নির্মাণাধীন। তাই এখানে যানজটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। হিজলাতলীতে ব্রিজ নির্মাণাধীন থাকায় যানজট হবে। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহন ফোরলেন থেকে এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে এসে বিবি সড়কের সিঙ্গেল লেনে পড়েছে। তাই এখানে যানজটের সৃষ্টি হতে পারে। ভাঙা ও সরু রাস্তা, দুর্বল ব্রিজ (ফুড ভিলেজের সামনে) এবং ব্রিজ অসমাপ্ত কাজের কারণে নলকা ব্রিজ থেকে হাটিকুমরুল পর্যন্ত রাস্তায় ভোগান্তিতে পড়বেন যাত্রীরা। ঢাকা-উত্তরবঙ্গের ভূইয়াগাঁতী থেকে চান্দাইকোনা পর্যন্ত রাস্তা ভাঙা। এখানে পুরাতন রাস্তার একটি অংশে ঢালাই করা হয়েছে। পাশাপাশি ডাইভারশন দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে ঢাকা-উত্তরবঙ্গের যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়বেন।প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা টোলে ঈদের সময় গাড়ির চাপ বেশি থাকে। টোল আদায়ে ধীরগতির কারণে এখানে যানজট বেশি হয়। ঢাকা-দক্ষিণাঞ্চল যাতায়াতের অন্যতম পথ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের গোড়লা বাসস্ট্যান্ডে চার লেনের কাজ চলমান। বাসস্ট্যান্ডের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দুটো ব্রিজ আছে। এগুলো খুবই সংকীর্ণ। এ কারণে আসন্ন ঈদুল ফিতরে এখানে যানজটের আশঙ্কা আছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়কের বাইপাইল থেকে ধউর ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তা খানাখন্দে ভরপুর। এ রাস্তায় সংস্কার কাজ করা না হলে রাস্তাটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাস র্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) আওতায় গাজীপুর-এয়ারপোর্ট সড়কের সাড়ে ২০ কিলোমিটার এবং ঢাকা বাইপাস ইলেভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ২৬ কিলোমিটার প্রকল্প চলমান। মেঘা প্রকল্প দুটির অধীনে সড়কে সম্পূর্ণ লেন ব্যবহার উপযোগী হয়নি। বিআরটি প্রজেক্টের ২৫টি স্টেশনকেন্দ্রিক উভয়মুখী রাস্তার প্রশস্ততা হ্রাস পাওয়ায় সেখান দিয়ে এক লেনে গাড়ি চলাচল করতে পারে। টঙ্গী ব্রিজ থেকে জয়দেবপুুর চৌরাস্তা পর্যন্ত কোনো রোড ডিভাইডার না থাকায় যত্রতত্র গাড়ি ইউটার্ন নিচ্ছে। এসব কারণে এই এলাকায় অসহনীয় যানজট সৃষ্টি হতে পারে। সূত্র আরও জানায়, ঈদ মৌসুমে সড়ক-মহাসড়কে রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু সদস্য এবং প্রভাবশালী মহলের লাঠিয়াল বাহিনী সদস্যরা চাঁদা আদায় করে থাকে। এ কারণেও রাস্তায় যানজট তৈরি হয়। এতে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গের যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজি মল্লিক ফখরুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন চলাচল নিশ্চিত করতে এবং চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, রোববার দুপুর থেকে পুরোদমে মাঠে নেমেছেন হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা। মহাসড়কে নির্মাণাধীন অংশের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ঈদের কমপক্ষে ৫ দিন আগে ও পরে সড়ক-মহাসড়ক যান চলাচল উপযোগী রাখতে এবং খানাখন্দ সংস্কার করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি সমন্বয় মিটিং করা হয়েছে। বেপরোয়া যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে ৪১৬টি স্পিডগান, ১১০টি আরএফ আইডি, ১১২টি অ্যালকোহল ডিটেক্টর এবং ১৮০টি পস মেশিন বসানো হয়েছে।তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনায় পড়া যানবাহন মহাসড়ক থেকে অপসারণ করতে ২৪টি রেকার, ১২টি অ্যাম্বুলেন্স ও ৯১টি কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অজ্ঞানপার্টি, মলমপার্টি ও চুরি-ছিনতাই রোধে ইতোমধ্যে লিফলেট বিতরণ শুরু হয়েছে। মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মাইকিং করা হচ্ছে। মোতায়েন করা হয়েছে মোটরসাইকেল মোবাইল টিম। সাদা পোশাকে কাজ করছে গোয়েন্দা টিম।