হেফাজতের উদ্যোগে সাত কওমি দলের জোট,হেফাজতের শর্ত, জামায়াত জোট ছেড়ে আসতে হবে - Alokitobarta
আজ : শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হেফাজতের উদ্যোগে সাত কওমি দলের জোট,হেফাজতের শর্ত, জামায়াত জোট ছেড়ে আসতে হবে


জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:স্থানীয় নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নিতে হেফাজতে ইসলামীর উদ্যোগের কওমি ধারার সাত দল এক সঙ্গে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘সমামনা ইসলামী দল’ ব্যানারে কর্মসূচি পালন করবে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম (ঢাকা) মাদ্রাসায় সাত দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়।কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দেওবন্দ ধারার এই সাত দল হল— চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।এর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত এবং নেজামে ইসলাম রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে। জমিয়ত রয়েছে বিএনপির জোটে। হেফাজতের শর্ত ছিল, জামায়াত জোট ছেড়ে আসতে হবে বাংলাদেশ খেলাফত এবং নেজামে ইসলামকে। এই শর্ত পূরণ হলে জমিয়তও বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে।

বৃহস্পতিবারের সভা সূত্র জানিয়েছে, আপাতত এইসব শর্ত পূরণ হচ্ছে না। আগামী ৫ ডিসেম্বর লিয়াজোঁ কমিটির পরবর্তী বৈঠকে এই বিষয়ে আলোচনা হবে। সেই পর্যন্ত সাত দল নিজেদের দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে প্রয়োজনে কর্মসূচি দিতে পারবে। জোটের কাঠামো ঠিক করবে।জামায়াতের বিরুদ্ধে দেওবন্দ ধারার ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর জোট গঠনের চেষ্টা গত নির্বাচনের আগে থেকেই করছে হেফাজত। এই সংগঠনটি জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদির মতবাদের ঘোর বিরোধী। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে হেফাজত আমির এবং মহাসচিব ফতোয়া দিয়েছিলেন, জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম।চরমোনাই আর ইসলামী আন্দোলন বাদে দেওবন্দের মতবাদ অনুসরণ করা বাকি ছয়টি দলের নেতারা হেফাজতের নেতৃত্বেও রয়েছেন।ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর হেফাজত শর্ত দেয়, সংগঠনটিতে থাকতে চাইলে জামায়াত ছাড়তে হবে। খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত আন্দোলন ইতিমধ্যে জামায়াত জোট ছেড়েছে। তবে খেলাফতের একাংশ রয়ে গেছে।

গত জুলাই এবং সেপ্টেম্বরে দুই দফা হেফাজত কার্যালয়ে বৈঠক হয় সাত দলের। এই সব বৈঠকে বাংলাদেশ খেলাফত এবং নেজামে ইসলাম জানায়, তারাও কওমি ঘরনার দলগুলোর ঐক্য চায়। তবে জামায়াত জোট ছাড়ার শর্ত চাপানো যাবে না। কিন্তু জামায়াত এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। সংসদের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও জোট চাওয়া এই দলগুলোর অবস্থান হল, ভোটে জোট না হলে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নেই। এই পরিস্থিতিতে কওমি ধারা দলগুলোর লিয়াজোঁ কমিটির প্রথম বৈঠকে আলোচনা হয় স্থানীয় নির্বাচনে সাত দল একসঙ্গে অংশ নেবে। অন্যান্য দলগুলোকেও এই জোটে শরিক করার সুযোগ রাখা যেতে পারে।বৈঠকে অংশ নেওয়া ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান সমকালকে বলেছেন, সাত দলের সবাই দেওবন্দের আদর্শের অনুসারী এবং সমমনা। তাই প্রথম লক্ষ্য হল, জোটবদ্ধভাবে স্থানীয় নির্বাচনের জন্য নিজেদের মধ্যে জোট করা। বিএনপি একটি এবং জামায়াত আরেকটি জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। সাত দলের জোটের নেতৃত্বে কে থাকবেন প্রশ্নে আতাউর রহমান বলেছেন, কোনো একক দল বা নেতার নেতৃত্বে জোট হবে না। সিদ্ধান্ত হয়েছে, সাত দলের শীর্ষ নেতারা হবেন জোটের নেতা।

হেফাজতের ভূমিকা কী হবে প্রশ্নে আতাউর রহমান বলেন, হেফাজত শুধু ‘ঘটকের’ ভূমিকায় রয়েছে। সাত দলকে মিলিয়ে দিচ্ছে। তারা অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেই অরাজনৈতিক ভূমিকায় থাকবে। তাদের চাওয়া ইসলামপন্থিরা একসঙ্গে থাকুক।গত নির্বাচনের জামায়াতে জোটে ছিল ইসলামী আন্দোলনও। আসন বন্টন নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় দলটি জোট ছেড়ে দেয় গত জানুয়ারিতে। তাদের চাওয়া ছিল অন্তত ৮০টি আসন ছাড়তে হবে। তবে জামায়াত ৪৫টির বেশি আসন দিতে রাজি হয়। যদিও ইসলামী আন্দোলনের নেতারা দাবি করছেন, আসন নয় ইসলামের আদর্শ থেকে জামায়াত সরে যাওয়ায়, তারা জোট ভেঙেছেন।বৃহস্পতিবারের লিয়াজোঁ কমিটির সভায় সাত দলের তিনজন করে নেতা এবং হেফাজতের তিন নেতা অংশ নেন। সভাপতিত্ব করেন হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা জানান, জামায়াত এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায়, কওমি ধারার দলগুলোর এক হওয়া প্রয়োজন। জামায়াতের সঙ্গে থাকা দেওবন্দের অনুসারী দলগুলোও এই জোটের শরিক হয়ে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে।

বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন সমকালকে বলেছেন, একাধিক জোটে থাকায় সমস্যা নেই। বাংলাদেশ খেলাফত ১১ দলীয় ঐক্যে থাকবে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের রায় কার্যকরের আন্দোলনের অংশ হিসেবে। স্থানীয় নির্বাচনের জন্য ইসলামী দলগুলোর নিজস্ব জোটে থাকবে। সাত দল স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নিতে পারে কি না, সে বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।বৈঠক অংশ নেওয়া নেতারা জানান, ‘সমমনা ইসলামী দল’ ব্যানারে সাত দল জোট করলে, অন্য রাজনৈতিক জোট ছাড়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি। জমিয়ত আগের মতই শর্ত দিয়েছে, যদি বাংলাদেশ খেলাফত এবং নেজামে ইসলাম ১১ দল ছাড়ে, তবেই তারা বিএনপি জোট ছাড়বে। এর আগে নয়। হেফাজত নেতারা জমিয়তকে বিএনপি ছাড়তে চাপ না দিলেও, অন্য দলগুলোকে জামায়াত ছাড়ার শর্ত দেন আবারও।

এ প্রসঙ্গে আতাউর রহমান সমকালকে বলেছে, একটি দল তো একই সময়ে দুটি জোটে থাকতে পারে না। যদি সাত দলের ঐক্য চূড়ান্ত হয়, তবে সবাই অন্য জোট ছেড়ে আসবে। সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে বৈঠকে অংশ নেওয়া দুই নেতা সমকালকে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত নিতে তারা সময় নিতে চান। আগামী ২৭ জানুয়ারি ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম ধাপ অনুষ্ঠিত হবে। যদি জামায়াত এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে, তবে তারা সাত দলের জোটেই থাকবেন। এনসিপিসহ অন্যদেরও এই জোটে আনার চেষ্টা করা হবে স্থানীয় নির্বাচনের জন্য।

নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার বলেছেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ১১–দলীয় ঐক্যের আন্দোলনেও শরিক থাকবেন। শুক্রবারে বৈঠকে যাবেন। ৩১ অক্টোবরের লংমার্চেও অংশ নেবেন।

জামায়াতে সঙ্গে জোট করায় কওমি ধারার দলগুলোর নেতা এবং আলেমরা বাংলাদেশ খেলাফত এবং নেজামে ইসলামের খোলাখুলি সমালোচনা করছেন। শুধু সামাজিকমাধ্যম নয় বক্তৃতার মঞ্চ থেকে বাংলাদেশ খেলাফতের আমির মামুনুল হককে নাম ধরে গালাগালির মত ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, দেওবন্দের মতবাদ অনুসরণ করা দলগুলোর নেতাকর্মীরা পরস্পরকে ব্যক্তি আক্রমণ, সমালোচনা করবে না। জুলাই সনদের বিরুদ্ধেও অনেকে অবস্থান নিয়েছেন।

গাজী আতাউর রহমান সমকালকে বলেছেন, সাত দল বিচ্ছিন্নভাবে থাকায় কিছু ভুল বুঝাবুঝি হচ্ছে। তা যাতে না হয়, সে জন্যই জোট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এক হয়ে গেলে এইসব সমালোচনা আক্রমণ আর থাকবে না। ইসলামী আন্দোলনসহ যারা জুলাই সনদের পক্ষে, তারা এর বাস্তবায়নের দাবিতে নিজস্ব অবস্থান বজায় রাখবে।

Top