ছোট ভুলে বড় ক্ষতি বিএনপির,ম্লান হচ্ছে ইতিবাচক উদ্যোগ - Alokitobarta
আজ : বুধবার, ২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
এনসিটিবির ৯ কর্মকর্তাকে বদলি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে ‘ক্রসফায়ার’ বিপজ্জনক বার্তা ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্যের জেরে আইজিপির অপসারণ দাবি এনসিপির আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদ জামায়াতের, ক্ষমা চাইতে বলল শিবির নামে পার্থক্য, চরিত্রে এক বিএনপি ও আওয়ামী লীগ বিদেশি ঋণ শোধে চাপ বাড়ছেই টিআইবিসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নিন্দা প্রত্যাহার দাবি,আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব... ৪৬ বছর পর ফিরছে গ্রাম সরকার স্থানীয় সরকারে অবিশ্বাস্য দুর্নীতি,আওয়ামী আমলের আমলনামা : তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন কর অঞ্চল-১২ এর সাবেক উপ কর কমিশনার হাফিজুলের বি'রু'দ্ধে নিয়োগ জা'লিয়া'তির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ

ছোট ভুলে বড় ক্ষতি বিএনপির,ম্লান হচ্ছে ইতিবাচক উদ্যোগ


জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:চাঁদাবাজি, দখল, আধিপত্য বিস্তার, সংঘাত কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনায় স্লান হচ্ছে সরকারের অর্জন।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বের বড় সাফল্যকে ঢেকে দিচ্ছে মাঠের ছোট ছোট ভুল। এতে শুধু বিএনপির সাংগঠনিক ভাবমূর্তিই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারও।সততা,সংযম ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি দিয়ে কাজ শুরু করেছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার।কারণ এতে দলের ক্ষতিটা হয়ে যাচ্ছে বড়।রাষ্ট্র পরিচালনায় নেওয়া হয়েছে একের পর এক ইতিবাচক উদ্যোগ।সরকারি ব্যয় কমানো থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সুবিধা বাড়ানো,প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাদাসিধে চলাফেরা ছাড়াও তার বিভিন্ন পদক্ষেপ জনগণের প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু দলের তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মীর ‘ছোট ভুল’ই বড় হয়ে উঠছে।

সর্বশেষ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা এর বড় উদাহরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবিরের এক নেতার সঙ্গে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরোধ তৈরি হয়। কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে ছাত্রদলের প্রতিক্রিয়া এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। জনমনে বার্তাটা এমনভাবে গেছে যে, ভুলটা যেন ছাত্রদলেরই। অথচ ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল শিবিরের এক নেতার মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিকভাবে এমন পরিস্থিতি সামলাতে আরও পরিণত ও কৌশলী হওয়া প্রয়োজন ছিল বিএনপির।একইভাবে এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মতো নেতার বক্তব্য ঘিরেও বিএনপির অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া প্রশ্ন তৈরি করছে। অনেকের মতে, তার ওপর হামলা যেই করুক, এখন দোষটা বিএনপির কাঁধেই চাপছে। তাই তার মতো ব্যক্তিকে নির্বিঘ্নে কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া বা তাকে এড়িয়ে যাওয়াই বিএনপির যথাযথ কৌশল হতো বলে অনেকে মনে করছেন। তাদের মতে, পালটা প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে পাটওয়ারীকে আরও আলোচনায় আনার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এতে উলটো বিএনপিকেই আক্রমণাত্মক হিসাবে দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে বিরোধীরা।

ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, অতীতে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনগুলোর মাধ্যমে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও সহিংস রাজনীতি দেখা যেত। নতুন বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করছেন, তাই এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। তিনি বলেন, মতভেদ বা সমস্যা থাকতেই পারে, কিন্তু লাঠিসোঁটা নিয়ে আক্রমণ করা বা আইন হাতে তুলে নেওয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শামিল; যা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো দল কিংবা সংগঠনের অভিযোগ থাকলে তা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা উচিত, যাতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব হয়। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় বিএনপি নেত্রী পদত্যাগী সংসদ-সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠজনদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে। ইসিবি চত্বরে নিউ গিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেডে হামলা ও দখলচেষ্টার ঘটনায়ও রাজনৈতিকভাবে বিএনপির জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এছাড়া মোহাম্মদপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন আরও কিছু ঘটনায়ও দলটির কিছু নেতাকর্মীর নাম জড়িয়েছে। এসব ঘটনায় ক্ষোভ আছে বিএনপির ভেতরেও।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, বিএনপি কোনো ভুলকেই ছোট করে দেখছে না। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়নি। দলের যেসব নেতাকর্মী দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ করছে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি আমাদের দলীয় সংরক্ষিত আসনের একজন এমপির পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অপরাধীর দলীয় পরিচয় দেখা হচ্ছে না।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহারের পাশাপাশি ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা বলে আসছেন। বক্তৃতা-বিবৃতিতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কথাও বারবার বলছেন তিনি। ১৭ বছর নির্বাসিত থাকার পর দেশে ফেরার সময়ও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। বড় ধরনের জনসভা বা সংবর্ধনার আয়োজন না করে রাজধানীর বাইরে ৩০০ ফিট এলাকায় সংক্ষিপ্ত ও সুশৃঙ্খল উপস্থিতির মাধ্যমে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের নতুন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। নেতাকর্মীদের তখন স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ হয়, এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা যাবে না।

সরকারি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় পরামর্শক ব্যয় কমানো, সংসদ-সদস্যদের জন্য শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ি না নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তসহ রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় কমানোর উদ্যোগ জনমনে প্রশংসা পেয়েছে। বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মহলের সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন,প্রধানমন্ত্রী একক নেতৃত্বে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুর তৈরি করেছেন। কিন্তু এসব অর্জনের মাঝেই নেতাকর্মীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। দলের একজন নেতার ভুল বক্তব্য কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের একটি সংঘাত মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। সরকারের বড় অর্জনগুলো এতে আড়ালে চলে যাচ্ছে।

ক্ষমতায় আসার গত সাড়ে সাত মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে দলের একটি অংশের বিরুদ্ধে। কোথাও স্থানীয় নেতাদের দ্বন্দ্ব, কোথাও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। কোথাও আবার দলের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের অভিযোগ উঠছে। এসব ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মাঠের বাস্তবতা নিয়ে জনমনে অস্বস্তি আছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যেখানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন রোধে জুলাই অভ্যুত্থানের শক্তির ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা ছিল, সেখানে তা না করে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত হচ্ছে। আর এই বিভাজনের সুযোগ নিচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর অনভিপ্রেত আচরণ ও ছোটখাটো ভুল ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের ব্যাপারে জনমনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। আবার এসব ঘটনাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় করে প্রচার করছে ওই প্রতিপক্ষ। অথচ সরকার ও বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন স্থিতিশীলতা এবং জন-আস্থা ধরে রাখা। কারণ বিএনপির চ্যালেঞ্জ শুধু সরকার পরিচালনা নয়; দলের নেতাকর্মীদের আচরণও নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ জনগণের কাছে সরকারের মূল্যায়ন শুধু প্রধানমন্ত্রী কী করছেন, তার ওপর নির্ভর করে না। স্থানীয় পর্যায়ে দলের একজন নেতার আচরণও সরকারের সামগ্রিক ভাবমূর্তির অংশ হয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড.সাব্বির আহমেদের মতে,সাম্প্রতিককালের কর্মকাণ্ডে বিএনপির কিছুটা হলেও ক্ষতি হবে এবং দলের জনপ্রিয়তার ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।তিনি বলেন, একা কোনো নেতার পক্ষে পুরো দল সামলানো সম্ভব নয়। পুরো দল যদি সাংগঠনিকভাবে নিজেদের শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে না আনে, তবে দলের এক ধরনের ক্ষতি হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পর বর্তমান প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সোচ্চার এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে।

কয়েকটি ঘটনা প্রসঙ্গে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, এসব ঘটনা ছোটখাটো উসকানি মাত্র। এসব উসকানিতে বিএনপি বা ছাত্রদল জড়িয়ে পড়লে তা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারণ নোংরা বা ময়লা ঘাঁটতে গেলে নিজের হাতও ময়লা হয়। তিনি বলেন, এসব বিষয়কে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদর্শিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। যেহেতু বিএনপি এখন সরকারে রয়েছে, তাই তাদের দায়দায়িত্ব অনেক বেশি। তাদের এখন ধৈর্য, সংযম এবং অনেক ক্ষেত্রে সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে। নানান অশ্লীল বা অপ্রীতিকর আচরণ শেষ বিচারে মানুষ গ্রহণ করে না। সরকারকে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন,শিক্ষাঙ্গনসহ সর্বত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক শাসনের ফলে যে দখলদারত্ব ও মারামারির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার কথা থাকলেও সম্প্রতি তা দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন মানুষের দায়িত্বহীন বক্তব্য এবং সরকারের অসহনশীলতার কারণে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। এমনকি অতিতুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, চলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবাইকে সচেতন হতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় দায় ও দায়িত্ব সরকারের। সরকার দায়িত্বশীল না হলে সব দোষ তাদের ওপরই চাপবে, যা গণতান্ত্রিক পথচলাকে ব্যাহত করবে। অতীতকে পর্যালোচনা করে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। ’৭১-এর পরাজিত শক্তির বিশ্ববিদ্যালয় দখল ও রগ কাটার মতো অসহনশীল রাজনীতি কিংবা অতীতের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে শিক্ষা নিতে হবে। নিজেদের ভুল সংশোধন করে সহনশীল না হলে এই অস্থিরতার সুযোগ নেবে দেশি-বিদেশি অপশক্তি।

Top