ব্যাংকক বৈঠকে চাওয়া হবে ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ
বিশেষ প্রতিনিধি:অর্থনীতির টানাপোড়েন সামাল দিতে এবার আন্তর্জাতিক ঋণের বড় প্যাকেজের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ,দুর্বল রাজস্ব আদায়,ব্যাংকিং খাতের সংকট ও বাজেটের বাড়তি ব্যয়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে নতুন অর্থায়ন নিশ্চিত করতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে সরকার।ঋণের দরজা খুলতে এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। সামনে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম সমন্বয়, রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও ভর্তুকি কমানোর মতো সিদ্ধান্তও আলোচনায় আসতে পারে। ব্যাংককের বৈঠক শেষে ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করাই এখন সরকারের বড় লক্ষ্য। আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভাকে সামনে রেখে আইএমএফের কাছে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ চাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের কাছে চাওয়া হবে বাজেট সহায়তাসহ জ্বালানি, খাদ্য, ব্যাংকিং ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে অর্থায়ন।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারের লক্ষ্য ডিসেম্বরের মধ্যে আইএমএফের সঙ্গে নতুন চুক্তি চূড়ান্ত করা। এরপর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আগামী বছরের শুরুতে প্রথম কিস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে, ব্যাংককের বৈঠকের ফাঁকে আইএমএফের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, নতুন কর্মসূচির প্রস্তুতিতে অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগ কাজ করছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে ওই বৈঠকের জন্য বাংলাদেশের এজেন্ডা চূড়ান্ত করবে অর্থ বিভাগ। এতে রাজস্ব আদায়, বাজেট ঘাটতি, সরকারি ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ভর্তুকি ও ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য-উপাত্ত দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন,আলোচনার এজেন্ডা তৈরি করা হচ্ছে। আমরা প্রথম পর্যায়ে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ বিলিয়ন (৪৫০-৫০০) ডলার ঋণ সহায়তা চাইব। এরপর সফলভাবে চুক্তি সম্পন্ন হলে পরবর্তীতে ঋণ সহায়তা আরও বাড়ানোর অনুরোধ করা হবে।আইএমএফের নতুন কর্মসূচিতে মূলত গুরুত্ব পাবে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ভর্তুকি ব্যয় যৌক্তিকীকরণ। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যায়। পরে কর্মসূচির আকার আরও বাড়ে। বর্তমান সরকার সেই কর্মসূচি থেকে সরে এসে নতুন কর্মসূচির জন্য আবেদন করেছে।
বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও নতুন অর্থায়নের প্রস্তুতি রয়েছে। বাজেট সহায়তার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য ও সার আমদানি, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও জলবায়ু মোকাবিলায় অর্থ চাওয়া হতে পারে। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় অঙ্কের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, শুধু ঋণ পেলেই বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কাটবে না। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো জরুরি। তিনি বলেন, নতুন ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যবহার হবে এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কীভাবে বাড়ানো হবে-এ বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে।
জ্বালানি-ভর্তুকি কমানোর চাপ এবং পে স্কেল নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। নতুন ঋণ কর্মসূচির আগে সরকার ২১ সেপ্টেম্বর ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ায়। তাদের ব্যাখ্যা, আন্তর্জাতিক বাজার, পরিবহণ ও বিমা ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার অবশ্য বলেছে, এটি আইএমএফের সরাসরি কোনো শর্ত নয়। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন আইএমএফ কর্মসূচিতে ভর্তুকি কমানো এবং জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। ফলে ভবিষ্যতে গ্যাস ও বিদ্যুতের দামও সমন্বয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
এদিকে নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়েও আইএমএফের সঙ্গে সরকারের মতপার্থক্যের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে আইএমএফের পক্ষ থেকে পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কথা এলেও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেছেন, পে স্কেল নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় পে স্কেল-২০২৬ বাস্তবায়ন শুরু করেছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, বর্তমান রাজস্ব পরিস্থিতিতে একসঙ্গে বড় ধরনের সরকারি ব্যয় বাড়ানো চ্যালেঞ্জের। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আইএমএফের নতুন কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু ঋণ পাওয়ার জন্য নয়, দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই কর আহরণ, ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে।
জানা গেছে, নতুন কর্মসূচিতে সরকার শুধু বড় অঙ্কের ঋণ পাওয়ার দিকেই নজর দিচ্ছে না। বরং ঋণের পাশাপাশি অর্থনীতির সংস্কার কাঠামো নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। ব্যাংককের বৈঠকে মূলত ঋণের আকার, সংস্কারের রূপরেখা ও অর্থ ছাড়ের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে।