ফেসবুকের কাঠগড়ায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা—অভিযোগের আগে প্রমাণ কোথায়?
নজরুল ইসলাম আলীম।। একটি ফেসবুক পোস্ট কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ।তারপর মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয়ে যায় শেয়ার, কমেন্ট, স্ট্যাটাস, ভিডিও, লাইভ এবং নানা ধরনের প্রতিক্রিয়ার বন্যা। কেউ অভিযোগের পক্ষে অবস্থান নেন, কেউ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মন্তব্য করেন, কেউ আবার কোনো কিছু যাচাই না করেই সেই পোস্ট নিজের টাইমলাইনে ছড়িয়ে দেন।একজন মানুষকে নিয়ে তৈরি হয়ে যায় জনসম্মুখের কাঠগড়া।কিন্তু এই প্রবল শব্দ, উত্তেজনা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ভিড়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি কোথায় যেন হারিয়ে যায়—
অভিযোগের প্রমাণ কোথায়?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তাঁর বক্তব্য কি যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছে?এবং তারও আগে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট কি কোনো মানুষকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যথেষ্ট?এই প্রশ্নগুলো কেবল একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে নয়। এটি আমাদের সময়ের সাংবাদিকতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত সুনাম, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের ধারণাকে ঘিরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন।এসপি এমএম মাহামুদ হাসানকে নিয়ে সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
একটি অভিযোগ কীভাবে ‘রায়ে’ পরিণত হয়?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রবণতাগুলোর একটি হলো—অভিযোগ এবং প্রমাণের মধ্যে পার্থক্যটি ক্রমশ মুছে যাওয়া।কেউ লিখলেন—অমুক ব্যক্তি দুর্নীতি করেছেন।আরেকজন সেটি শেয়ার করলেন। তৃতীয় ব্যক্তি লিখলেন—‘সবাই জানে’।চতুর্থ ব্যক্তি বললেন—‘অনেক দিন ধরেই এমন কথা শুনছি।’তারপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি অভিযোগ এমন একটি সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হলো, যেন বিষয়টি ইতোমধ্যে তদন্ত, বিচার ও রায়ের তিনটি ধাপই পেরিয়ে গেছে।কিন্তু বাস্তবতা হলো—শোনা কথা প্রমাণ নয়,ফেসবুক পোস্ট প্রমাণ নয়,ভাইরাল হওয়া প্রমাণ নয়।অনেক মানুষ বিশ্বাস করছে—এটিও প্রমাণ নয়।প্রমাণের নিজস্ব মানদণ্ড আছে।তদন্তের নিজস্ব পদ্ধতি আছে।আইনের নিজস্ব প্রক্রিয়া আছে।আর সাংবাদিকতারও নিজস্ব নৈতিকতা আছে।এই মৌলিক পার্থক্য ভুলে গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুব সহজেই জনমত গঠনের জায়গা থেকে জনসম্মুখে ‘বিচার’ করার জায়গায় পরিণত হয়।
এমএম মাহামুদ হাসানকে ঘিরে যে প্রশ্ন
এসপি এমএম মাহামুদ হাসানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ ও সমালোচনা প্রকাশের পর তাঁর পক্ষে পাল্টা বক্তব্যও সামনে এসেছে।তাঁর সমর্থক, পরিচিতজন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা তাঁর কর্মজীবনে ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।কারও ভাষ্যে তিনি অপরাধ দমনে কঠোর কর্মকর্তা।কারও বক্তব্যে তিনি সাধারণ মানুষের সমস্যায় এগিয়ে এসেছেন।কেউ তাঁর মাদকবিরোধী অভিযান ও অপরাধ দমনের ভূমিকার কথা বলেছেন।কেউ তাঁর মানবিক আচরণের উদাহরণ তুলে ধরেছেন।আবার কেউ তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের পুরস্কার ও স্বীকৃতির কথা সামনে এনেছেন।এসব বক্তব্যের সত্যতা অবশ্যই যাচাইযোগ্য।কিন্তু একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—যে ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তাঁর বক্তব্য যেমন যাচাই করতে হবে, তেমনি যাঁরা তাঁর পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছেন, তাঁদের দাবিও যাচাই করতে হবে।কারণ সাংবাদিকতার মূলনীতি হলো—কোনো পক্ষের বক্তব্যকে শুধু আবেগ বা জনপ্রিয়তার কারণে সত্য ধরে না নেওয়া।
ছাত্রজীবন থেকে কর্মজীবন—একটি দীর্ঘ পথ
এমএম মাহামুদ হাসানের সমর্থকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৮-৯৯ শিক্ষাবর্ষে তিনি পটুয়াখালী কৃষিকলেজের ২০তম ব্যাচের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন।তৎকালীন সময়ে তিনি ছাত্রদলের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও তাঁদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।ছাত্রজীবনে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং সেই বিরোধের জেরে কয়েক মাস পর তাঁকে ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়েছিল—এমন বক্তব্যও প্রচলিত রয়েছে।এই তথ্যগুলোও যদি জনসমক্ষে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে সেগুলোর স্বাধীন ও প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই প্রয়োজন।কারণ কারও রাজনৈতিক বা ছাত্রজীবনের পরিচয় দিয়ে বর্তমান চরিত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি সেই সময়কার ঘটনাকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বলে উড়িয়ে দেওয়াও সঠিক নয়।একজন মানুষের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি অধ্যায়কে তার নিজস্ব সময়, প্রেক্ষাপট ও প্রমাণের আলোকে দেখতে হবে।
মেধাতালিকায় দ্বিতীয়—দাবিটিরও যাচাই প্রয়োজন
তাঁর সমর্থকদের পক্ষ থেকে আরও বলা হচ্ছে, ২৮তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের মেধাতালিকায় তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন।এটি সত্য হলে তাঁর পেশাগত যোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।কিন্তু জাতীয় সংবাদমাধ্যমে কোনো তথ্য প্রকাশের আগে সেটি সরকারি নথি দিয়ে যাচাই করা উচিত।কারণ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিকে প্রশংসা করার উদ্দেশ্যেও যাচাইহীন তথ্য প্রকাশ করা সমীচীন নয়।সত্য তথ্যই একজন কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
পুরস্কার ও স্বীকৃতির দীর্ঘ তালিকা
এমএম মাহামুদ হাসানের কর্মজীবন সম্পর্কে তাঁর সমর্থকদের পক্ষ থেকে একাধিক পুরস্কার ও স্বীকৃতির কথা তুলে ধরা হচ্ছে।
তাঁদের দাবি অনুযায়ী—
তিনি দুইবার প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক পেয়েছেন;
একবার র্যাব মহাপরিচালকের পদক পেয়েছেন;
একবার আইজি ব্যাজ পেয়েছেন;
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঝালকাঠি জেলার শ্রেষ্ঠ সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তা হিসেবে বিশেষ সম্মাননা পেয়েছেন;
বরিশাল রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে টানা ১০ বার নির্বাচিত হয়েছেন।
এগুলো নিছক প্রশংসার বক্তব্য নয়; প্রতিটি দাবিরই প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড থাকার কথা।তাই এগুলো যাচাই করা কঠিন নয়।যদি তথ্যগুলো সত্য হয়, তাহলে তাঁর কর্মজীবনের মূল্যায়নে সেগুলো অবশ্যই বিবেচনায় আসা উচিত।আবার যদি কোনো দাবিতে ভুল থাকে, সেটিও সংশোধন করা উচিত।কারণ সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো নথি।
ঝালকাঠির মানুষের অভিজ্ঞতা কি মূল্যহীন?
তাঁর সমর্থকদের বক্তব্যে ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথাও উঠে এসেছে।তাঁদের দাবি, শত শত জমিজমা ও পারিবারিক বিরোধে তিনি উঠান বৈঠকের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।চুরি-ডাকাতি এবং মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডেও তাঁর ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান—এমন দাবিও করা হয়েছে।এখানেও একই কথা প্রযোজ্য।এসব দাবি যাচাই করা উচিত।কতগুলো উঠান বৈঠক হয়েছে?কোন ধরনের বিরোধ সেখানে আলোচিত হয়েছে?কতগুলো বিষয়ে সমাধান হয়েছে?সেসবের লিখিত রেকর্ড কী মাদকবিরোধী অভিযানের পরিসংখ্যান কী? অপরাধ দমনে তাঁর দায়িত্ব পালনের সরকারি তথ্য কী বলে?এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা সম্ভব।আর সেটিই হওয়া উচিত দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পথ।
দুই পক্ষের বক্তব্য নেওয়া কেন জরুরি?
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ করা হলে সাংবাদিকের প্রথম দায়িত্বগুলোর একটি হলো—অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া।কারণ একটি অভিযোগেরও দুটি দিক থাকে।অভিযোগকারীর বক্তব্য একটি দিক।অভিযুক্তের বক্তব্য অন্য দিক।এর বাইরে থাকে নথি, সাক্ষী, পরিস্থিতিগত তথ্য এবং স্বাধীন উৎস।এই সবকিছু যাচাই না করে একটি পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করলে সেটি সাংবাদিকতা নয়; সেটি হয়ে উঠতে পারে একতরফা বয়ান।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সমস্যা আরও তীব্র।কারণ সেখানে কোনো সম্পাদকীয় যাচাই প্রক্রিয়া নেই, কোনো তথ্য যাচাইয়ের বাধ্যতামূলক কাঠামো নেই এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার সংস্কৃতিও অনুপস্থিত।
অভিযোগের অধিকার আছে, জবাবের অধিকারও আছে
কেউ অন্যায়ের শিকার হলে অভিযোগ করার অধিকার রাখেন।এটি নাগরিক অধিকার।কেউ দুর্নীতির অভিযোগ তুললে তা তদন্তের দাবি রাখে।কেউ ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।কেউ পুলিশি হয়রানির অভিযোগ করলে সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত।কিন্তু একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও রয়েছে।একজনের অভিযোগ প্রকাশের অধিকার থাকলে অন্যজনের বক্তব্য প্রকাশের অধিকারও থাকতে হবে।এটাই ন্যায়বিচারের মৌলিক ভারসাম্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি একমুখী আদালত?
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি একটি অভিযোগ করলেন।অভিযোগটি কয়েক হাজার মানুষ শেয়ার করল।তারপর কিছু মানুষ মন্তব্য করলেন।অভিযুক্তের পক্ষে কেউ কথা বলতে গেলেন।কিন্তু সেই মন্তব্য সরিয়ে দেওয়া হলো।তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি একমুখী আদালত?
যেখানে অভিযোগকারীর বক্তব্য থাকবে, কিন্তু অভিযুক্তের বক্তব্য থাকবে না?যেখানে এক পক্ষের বক্তব্য ভাইরাল হবে, কিন্তু অন্য পক্ষের বক্তব্যকে সীমিত করা হবে?যেখানে অভিযোগ হবে মুক্ত, কিন্তু জবাব হবে নিয়ন্ত্রিত?যদি এমন সংস্কৃতি তৈরি হয়, তাহলে সেটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যও স্বাস্থ্যকর নয়।
প্রশংসাও প্রমাণ নয়, অভিযোগও প্রমাণ নয়
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত কথা বলা প্রয়োজন।কেউ একজনকে ‘সৎ’ বললেই তিনি সৎ প্রমাণিত হন না।আবার কেউ তাঁকে ‘দুর্নীতিবাজ’ বললেই তিনি দুর্নীতিবাজ হয়ে যান না।কেউ বললেন তিনি মানুষের জন্য কাজ করেছেন—এটি একটি বক্তব্য।কেউ বললেন তিনি অন্যায় করেছেন—এটিও একটি বক্তব্য।সত্য কোথায়?সত্যের কাছে পৌঁছাতে হলে দুটো বক্তব্যের বাইরেও যেতে হবে।দলিল দেখতে হবে।রেকর্ড দেখতে হবে।সাক্ষ্য নিতে হবে।ঘটনার ধারাবাহিকতা দেখতে হবে।স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে।সত্য কখনো কেবল একজনের মুখে থাকে না।
মিথ্যা তথ্যের পাশাপাশি অর্ধসত্যও বিপজ্জনক
আমরা প্রায়ই ভাবি, মিথ্যা তথ্যই সবচেয়ে বড় সমস্যা।আসলে অর্ধসত্য অনেক সময় আরও বিপজ্জনক।কারণ অর্ধসত্যের মধ্যে সত্যের কিছু অংশ থাকে।একটি পুরোনো ঘটনা তুলে এনে বর্তমান ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা যায়।একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামগ্রিক চরিত্রের প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায়।একটি বক্তব্যের অর্ধেক প্রকাশ করে অন্য অর্থ তৈরি করা যায়।একটি ছবিকে অন্য ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা যায়।তারপর পাঠক মনে করেন—সবকিছুই সত্য।এভাবেই একজন মানুষের বিরুদ্ধে সামাজিক ধারণা তৈরি হতে পারে।আর একবার কোনো ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে পরবর্তী সত্য তথ্যও অনেক সময় মানুষের কাছে গুরুত্ব হারায়।
সুনাম ধ্বংস করা সহজ, ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন
একজন মানুষের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ ছড়াতে কয়েক মিনিট লাগে।একটি পোস্ট ভাইরাল হতে কয়েক ঘণ্টা লাগে।কিন্তু সেই অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁর সুনাম ফিরিয়ে আনতে কত বছর লাগে?এই প্রশ্নটি আমরা খুব কমই করি।ধরা যাক, একটি অভিযোগ তদন্তে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলো।তখন কি আগের পোস্টগুলো একই গতিতে সংশোধন হবে?যারা শেয়ার করেছিলেন, তাঁরা কি সংশোধনী পোস্ট দেবেন?যারা তাঁকে প্রকাশ্যে অভিযুক্ত করেছিলেন, তাঁরা কি প্রকাশ্যে বলবেন যে অভিযোগটি প্রমাণিত হয়নি?বাস্তবে এমনটি খুব কমই দেখা যায়।অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত।সংশোধন হারিয়ে যায় নীরবে।এটাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় নৈতিক সংকট।
তবে জনপ্রিয়তা কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না
এখানে বিপরীত সত্যটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।কোনো কর্মকর্তা অনেক পুরস্কার পেয়েছেন।অনেক মানুষ তাঁকে ভালো বলেছেন।অনেকে তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।এগুলো কোনো অপরাধের অভিযোগকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে না।একজন জনপ্রিয় কর্মকর্তা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত হতে পারে।আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।অতএব, এমএম মাহামুদ হাসানের পক্ষের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ এই নয় যে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করা যাবে না।বরং উল্টোটা সত্য—তাঁর পক্ষে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁরাও চাইতে পারেন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।কারণ তদন্তেই সত্য পরিষ্কার হবে।
অভিযোগ মিথ্যা হলে কী হবে?
অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত না হলে সেটিও জনসমক্ষে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।কারণ একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ থাকলে তাঁর পেশাগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের উৎস, তথ্যের ভিত্তি এবং প্রকাশের পদ্ধতিও প্রশ্নের মুখে আসতে পারে।তবে এর প্রতিকারও হতে হবে আইনসম্মত পথে।হুমকি, পাল্টা অপপ্রচার কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ কোনোভাবেই সমাধান নয়।
সাংবাদিকতা বনাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনা
সাংবাদিকতা এবং ফেসবুক পোস্ট এক জিনিস নয়।একজন সাংবাদিকের কাছে সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, উৎস যাচাই, বক্তব্য নেওয়া এবং ন্যায্যতা রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে।একজন সাধারণ নাগরিক তাঁর অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন।কিন্তু একজন পেশাদার সাংবাদিক যখন সেই বক্তব্যকে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করেন, তখন তাঁর দায়িত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।কারণ সংবাদপত্রের একটি লেখা মানুষের ওপর সামাজিক প্রভাব তৈরি করতে পারে।একটি ভুল তথ্য একজন মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।তাই সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সঙ্গে সাংবাদিকতার দায়িত্বও অবিচ্ছেদ্য।
একটি অভিযোগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম কী থাকা উচিত?
কোনো গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে অন্তত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর থাকা উচিত—
১. অভিযোগের উৎস কে?
২. অভিযোগের পক্ষে কী নথি আছে?
৩. প্রত্যক্ষ সাক্ষী আছে কি?
৪. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি?
৫. অন্য কোনো স্বাধীন উৎস থেকে তথ্য যাচাই করা হয়েছে কি?
৬. অভিযোগটি বর্তমান, নাকি পুরোনো?
৭. পুরোনো হলে তার প্রেক্ষাপট কী?
৮. কোনো তদন্ত হয়েছে কি?
৯. তদন্ত হলে ফলাফল কী?
১০. অভিযোগটি প্রমাণিত, নাকি কেবল অভিযোগ হিসেবেই রয়েছে?
এই প্রশ্নগুলো না করে শুধু পোস্ট শেয়ার করলে সেটি সত্য অনুসন্ধান নয়।
একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন
এমএম মাহামুদ হাসানকে ঘিরে বিতর্ক শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না।কারণ এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলেছে—আমরা কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছি, নাকি রায়ের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করছি?আমরা কি কোনো পোস্ট দেখে বলি—‘অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত হোক’? নাকি বলি—‘অভিযোগ উঠেছে, নিশ্চয়ই সত্য’?এই দুই অবস্থানের মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে।প্রথমটি দায়িত্বশীল নাগরিকের অবস্থান।দ্বিতীয়টি বিচারপূর্ব সিদ্ধান্তের ঝুঁকি তৈরি করে।
প্রতিবাদ প্রয়োজন, কিন্তু প্রতিবাদও হতে হবে তথ্যভিত্তিক
এমএম মাহামুদ হাসানের পক্ষ থেকে যারা প্রতিবাদ করছেন, তাঁদের প্রতিবাদ গুরুত্বপূর্ণ।কিন্তু প্রতিবাদের সবচেয়ে কার্যকর ভাষা হওয়া উচিত তথ্য।‘তিনি ভালো মানুষ’—এটি আবেগ।‘তিনি অমুক সময়ে অমুক সেবা দিয়েছেন, এর সরকারি নথি রয়েছে’—এটি তথ্য।‘তিনি দুর্নীতি করেননি’—এটি একটি দাবি।‘তাঁর বিরুদ্ধে অমুক অভিযোগ তদন্ত হয়েছে এবং তদন্তে অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া যায়নি’—এটি যাচাইযোগ্য তথ্য।এই পার্থক্যটি বুঝতে হবে।কারণ শক্তিশালী প্রতিবাদ আবেগে নয়, প্রমাণে দাঁড়ায়।
অভিযোগকারীর প্রতিও একই প্রশ্ন
একই মানদণ্ড অভিযোগকারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।অভিযোগ যদি সত্য হয়—প্রমাণ দিন।অভিযোগের নথি থাকলে প্রকাশ করুন।ঘটনার তারিখ, স্থান ও প্রেক্ষাপট দিন।প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য থাকলে যাচাই করুন।প্রাসঙ্গিক নথি থাকলে সামনে আনুন।কারণ গুরুতর অভিযোগ মানেই গুরুতর দায়িত্ব।কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার আগে অভিযোগের ভিত্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
ন্যায়বিচার মানে দুই পক্ষকে শোনা
ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক নীতি হলো—দুই পক্ষকে শোনা।একজনের বক্তব্য শুনে অন্যজনকে নীরব করে দেওয়া ন্যায়বিচার নয়।একজনের অভিযোগকে প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়াও ন্যায়বিচার নয়।আবার অভিযুক্তের পক্ষে বহু মানুষ কথা বলছে বলে অভিযোগকে তদন্তের বাইরে রাখাও ন্যায়বিচার নয়।ন্যায়বিচারের পথ মাঝখানে।সেখানে আছে—অভিযোগ → তদন্ত → প্রমাণ → আত্মপক্ষ সমর্থন → যাচাই → সিদ্ধান্ত।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।
আজ মাহামুদ হাসান, কাল অন্য কেউ
আজ একজন পুলিশ কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায়।কাল হয়তো অন্য কোনো কর্মকর্তা।পরশু কোনো শিক্ষক।তারপর কোনো চিকিৎসক।কোনো ব্যবসায়ী।কোনো সাংবাদিক।কোনো রাজনৈতিক কর্মী।অথবা এমন একজন সাধারণ মানুষ, যার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার মতো কোনো প্ল্যাটফর্মই নেই।তাই বিষয়টি ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে গেছে।আজ আমরা যদি অভিযোগকে যাচাই ছাড়া সত্য হিসেবে গ্রহণ করি, আগামীকাল একই সংস্কৃতির শিকার হতে পারেন আমাদের পরিচিত কেউ।আর তখন হয়তো আমরা নিজেরাই বলব—‘আমার বক্তব্যটাও শুনুন।’তাহলে অন্যের ক্ষেত্রেও সেই সুযোগ দিতে হবে।
সত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু অযাচাইকৃত তথ্য
সত্যের বিপরীতে মিথ্যা দাঁড়ায়—এটি আমরা জানি।কিন্তু তার চেয়েও বিপজ্জনক হলো অযাচাইকৃত তথ্য।কারণ মিথ্যা একসময় ধরা পড়ে। অযাচাইকৃত তথ্য দীর্ঘদিন ধরে মানুষের বিশ্বাসের অংশ হয়ে থাকতে পারে।একটি ভুল তথ্য হাজার মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে।আর একবার সামাজিক ধারণা তৈরি হয়ে গেলে পরে সত্য প্রকাশ করলেও ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন।তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরও দায়িত্ব আছে। শেয়ার করার আগে যাচাই করা।অভিযোগ দেখলে উৎস খোঁজা।প্রমাণ চাইতে শেখা।অভিযুক্তের বক্তব্য দেখতে চাওয়া।এগুলো কোনো পক্ষ নেওয়া নয়।এগুলো দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার অংশ।
শেষ বিচারের জায়গা ফেসবুক নয়
এসপি এমএম মাহামুদ হাসানকে নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হোক।যদি কোনো অপরাধ হয়ে থাকে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হোক।যদি অভিযোগের ভিত্তি না থাকে, সেটিও পরিষ্কারভাবে জানানো হোক।যদি কোনো তথ্য মিথ্যা বা বিকৃতভাবে ছড়ানো হয়ে থাকে, তারও জবাবদিহি থাকুক।কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ফেসবুকের মন্তব্যের ঘরকে আদালত বানানো যাবে না।কারণ কমেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আইন নয়।শেয়ারের সংখ্যা প্রমাণ নয়।ভাইরাল ভিডিও রায় নয়। জনপ্রিয় মতামত তদন্তের বিকল্প নয়।বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে।
একটি সংবাদমাধ্যমের দায় আরও বেশি
জাতীয় দৈনিকের পাতায় কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে অভিযোগ প্রকাশ করা হলে দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।শিরোনাম হতে হবে সংযত।অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করতে হবে।অভিযুক্তের বক্তব্যের সুযোগ থাকতে হবে।নথি ও প্রমাণের ভিত্তি স্পষ্ট করতে হবে।তদন্তাধীন বিষয়কে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।এটাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ন্যূনতম শর্ত।কারণ সংবাদমাধ্যমের হাতে শুধু কলম নেই—আছে মানুষের সুনাম ও জনমতকে প্রভাবিত করার শক্তি।এই শক্তির ব্যবহার যত বড়, দায়িত্বও তত বড়।
শেষ প্রশ্নটি তাই খুব সরল
ফেসবুকে কেউ লিখেছে বলেই কি তা সত্য?
না।
কেউ ভাইরাল করেছে বলেই কি তা সত্য?
না।
হাজার মানুষ শেয়ার করেছে বলেই কি তা সত্য?
না।
আবার কেউ একজনকে ভালো বলেছে বলেই কি তিনি সব অভিযোগ থেকে মুক্ত?
তাও না।তাহলে পথ কী?তথ্য,প্রমাণ,নথি,সাক্ষ্য,তদন্ত,দুই পক্ষের বক্তব্য এবং স্বাধীন যাচাই।এটাই সত্যের পথ।এমএম মাহামুদ হাসানকে ঘিরে চলমান বিতর্কেও সেই পথই অনুসরণ করা উচিত।কেউ তাঁকে অন্যায়কারী মনে করলে অভিযোগের প্রমাণ সামনে আনুন।কেউ তাঁকে সৎ ও জনবান্ধব কর্মকর্তা মনে করলে তাঁর ভালো কাজের নথি সামনে আনুন।কেউ অভিযোগের প্রতিবাদ করলে তার ভিত্তি ব্যাখ্যা করুন।আর সাংবাদিকরা সব পক্ষের বক্তব্য শুনে তথ্য যাচাই করুন।কারণ কোনো মানুষের সুনাম রক্ষা করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রকৃত অপরাধ আড়াল না করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।কাউকে অপরাধী বানানোর অধিকার যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেই, তেমনি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখার অধিকারও কারও নেই।সত্যের জন্য কোনো পক্ষের প্রয়োজন নেই।সত্যের প্রয়োজন প্রমাণের। ন্যায়ের প্রয়োজন প্রক্রিয়ার।সাংবাদিকতার প্রয়োজন অনুসন্ধানের।আর গণতান্ত্রিক সমাজের প্রয়োজন—ভিন্নমত শোনার সাহস।আজ তাই এসপি এমএম মাহামুদ হাসানকে ঘিরে সবচেয়ে জরুরি দাবি হওয়া উচিত—অভিযোগের তদন্ত হোক,পাল্টা দাবিরও যাচাই হোক,নথি সামনে আসুক,দুই পক্ষের বক্তব্য প্রকাশিত হোক।সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ধারিত হোক প্রমাণের ভিত্তিতে।কারণ—ফেসবুকের কাঠগড়ায় কোনো মানুষের বিচার হওয়া উচিত নয়।বিচার হোক তথ্যের আদালতে, প্রমাণের ভিত্তিতে, আইনের আলোকে।আর সাংবাদিকতার দায়িত্ব হোক—কোনো পক্ষের মুখপাত্র হওয়া নয়; বরং পক্ষ-বিপক্ষের কোলাহল পেরিয়ে সত্যের কাছে পৌঁছানো।একজন মানুষকে এক মুহূর্তে হেয় করা যায়।একটি পোস্ট দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা যায়। কয়েকটি শব্দ দিয়ে তাঁর বহু বছরের কর্মজীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়।কিন্তু সত্যকে চিরদিন চাপা রাখা যায় না।তাই অভিযোগ থাকুক—তদন্ত হোক।প্রতিবাদ থাকুক—তারও যাচাই হোক।সমর্থন থাকুক—তারও প্রমাণ থাকুক।সমালোচনা থাকুক—তারও ভিত্তি থাকুক।কিন্তু রায় যেন না হয় তদন্তের আগে।কারণ একজন মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাঁকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি প্রকৃত অপরাধকে শুধু জনপ্রিয়তা বা পুরস্কারের আড়ালে লুকিয়ে রাখাও অন্যায়। ন্যায়বচার কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ন্যায়বিচার কোনো দলের নয়, ন্যায় বিচর কোনো পক্ষের নয়, ন্যায় বিচার সত্যের।আর সেই সত্যের কাছে পৌঁছানোর একমাত্র সম্মানজনক পথ—“ফেসবুকের কাঠগড়ায় নয়—প্রমাণের আদালতেই হোক শেষ বিচার।”