আ.লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা,নাশকতার ‘কন্ট্রোল’ দেশের বাইরে,বাসের পর এবার ট্রেনে আগুন
নুর নবী জনী: দেশজুড়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের নেপথ্য গডফাদাররা দেশের বাইরে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশের ভেতরেও রয়েছে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। তাদের মাধ্যমেই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের ইন্ধনদাতারা দেশের বাইরে থেকে উসকানি দিচ্ছে, অন্যদিকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য অর্থও ব্যয় করছে। তাদেরই একটি অংশ দেশের ভেতরে সক্রিয় রয়েছে।চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাওনকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।রোববার রাতে রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এর আগে গত কয়েক দিনে বাসে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।বাহিনীর সূত্র বলছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু উচ্ছৃঙ্খল কর্মী সড়কে ঝটিকা মিছিল বের করে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়।
এদিকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সর্বশেষ রিপোর্র্টে দেশকে অস্থিতিশীল করার কাজে জড়িত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের শতাধিক নেতার নাম উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। তাদের কয়েকজনকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য বিভিন্ন অঞ্চল ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, গুলিস্তান, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, লালবাগ, তেজগাঁও, রমনা ও বাড্ডায় জোনভিত্তিক নাশকতামূলক কাজের জন্য টর্গেট করা হয়েছে। এসব জোনের সমন্বয়ের দায়িত্বে আছেন যুবলীগের মাইনুল হাসান খান নিখিল এবং মিরপুরের সাবেক সংসদ-সদস্য ইলিয়াস মোল্লা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের ভেতর সহিংসতা উসকে দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসাবে চিত্রায়িত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে চক্রটি। দেশের ভেতর ও বাইরে অবস্থানরত ষড়যন্ত্রকারীরা যৌথভাবে নাশকতা পরিচালনা ও অর্থায়নে জড়িত। গোয়েন্দারা এ সংক্রান্ত বেশকিছু অডিও রেকর্ড, ডিজিটাল প্রমাণ ও গোপন বৈঠকের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার সাংবাদিকদের বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নাশকতামূলক অপতৎপরতা চালাচ্ছে। ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় মোটরসাইকেলসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হাইকোর্টের ফটক ও যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় জড়িতদের ইতোমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অন্যান্য ঘটনায় জড়িতদেরও শনাক্ত করার কাজ চলছে। মন্ত্রী বলেন, জনগণ ও সরকার এসব অপতৎপরতায় মোটেও শঙ্কিত নয়। দেশবাসী ইতোমধ্যে তাদের বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও গোয়েন্দাদের মতে, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করতে চাচ্ছে। তারা জনমনে এমন একটি বার্তা দেওয়ারও চেষ্টা করছে যে, রাজপথে সহিংসতা বা ঝটিকা মিছিল করে আগুন দেওয়ার কাজ তাদের নয়। সুসংগঠিত দল হিসাবে বিশাল জনসমর্থন রয়েছে তাদের এবং তারা আন্দোলনের মাধ্যমে রাজপথ দখল করতে পারে-এমনটিই জনমনে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। কিন্তু বাস্তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের চক্রান্তকারীরাই দেশব্যাপী চরম অস্থিতিশীলতা ও নাশকতা উসকে দিচ্ছে।
সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাসে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল নিক্ষেপের জন্য মাঠপর্যায়ে অর্থ ও বিস্ফোরক সরবরাহকারীদের তালিকা এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। মাঠপর্যায়ে যারা আগুন দিচ্ছে বা ককটেল ফাটাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, যারা অল্পকিছু টাকার বিনিময়ে এসব করছে। আসল চক্রান্তকারী ও পরিকল্পনাকারীরা রয়েছেন পর্দার আড়ালে। নেপথ্যের নির্দেশদাতা ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে বিভিন্ন বাহিনী। ষড়যন্ত্রকারীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মাঠ পর্যায়ে বিশেষ বার্তাও দেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বাসে আগুন বা ককটেল হামলার মতো নাশকতা রোধে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে পর্যাপ্ত গোয়েন্দা মোতায়েন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় তারা সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকবেন।
এদিকে রাজধানীতে গত তিন দিনে অন্তত আটটি যানবাহনে আগুন এবং দুই ডজনের বেশি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।