অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বোমা আতঙ্ক,কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া : রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক বোমা, বিস্ফোরক ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ ভেতরে-ভেতরে অপতৎপরতা চালাচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ । মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে, সাভার ও ডেমরায় আইইডি বোমা এবং বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধারের পর আবারও আলোচনায় উঠেছে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা উগ্রপন্থি সংগঠনগুলো কি আবারও সংগঠিত হচ্ছে?আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক তদন্তে নব্য জেএমবির একটি সক্রিয় চক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা বলা হলেও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কাও দেখছেন।ভারতে অবস্থানরত দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তার এ ঘোষণা কেন্দ্র করে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার ছক কষছেন। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছেন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা।তাদের মতে, বিস্ফোরণ না ঘটিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল স্থানে বোমা রেখে আতঙ্ক সৃষ্টি করা রাষ্ট্র ও সরকারের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির একটি কৌশল হতে পারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা লক্ষ করলে পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। ১৬ আগস্ট ঢাকার ডেমরার পশ্চিম বক্সনগর নিঝুমবাগ এলাকা থেকে দুটি পাইপ বোমা উদ্ধার করে সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। এ সময় জুয়েল মিয়া ওরফে ওস্তাদ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে ১১ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকা থেকে বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন সাভারের একটি খোলা মাঠ থেকে ‘প্রেশার কুকার’ বোমা উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে একটি ছাতার ভেতর থেকে আইইডি এবং ৩১ জুলাই সাভারের চারাবাগ এলাকায় একটি প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধার করা হয়।
সিটিটিসির তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, দুই মাসে ঢাকা, সাভার ও আশপাশের এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া বেশ কয়েকটি আইইডি বোমার সঙ্গে নিষিদ্ধ উগ্রপন্থি সংগঠন নব্য জেএমবির একটি সুসংগঠিত চক্রের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। গোয়েন্দারা নাজমুল হাসান ওরফে ‘বোমারু মামুন’কে চক্রটির প্রধান বোমা তৈরিকারক বা প্রশিক্ষক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বর্তমানে পলাতক। তার সহযোগী হিসাবে সাভারের হেমায়েতপুর থেকে মোহাম্মদ আরিফ এবং ডেমরা থেকে জুয়েল মিয়া ওরফে ‘ওস্তাদ’কে পাইপ বোমাসহ গ্রেফতার করা হয়েছে।
অস্তিত্ব জানান দেওয়ার কৌশল : সিটিটিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কয়েক বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর রাজধানী এবং আশপাশের এলাকায় শক্তিশালী আইইডি উদ্ধারের ঘটনা ঘটিয়ে নিজেদের পুনরুত্থান ও সক্ষমতার জানান দিতে চাইছে নব্য জেএমবি। নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি মেট্রোরেল স্টেশন, মসজিদ-মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ ও জনাকীর্ণ এলাকায় বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তু রেখে জনমনে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিটি ঘটনায় বিস্ফোরণ ঘটানোই যে মূল লক্ষ্য, এমন নয়; বরং একটি বোমা উদ্ধারের খবরই যেন আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠছে।
ডেমরা থেকে গ্রেফতার জুয়েল মিয়া ওরফে ‘ওস্তাদ’কে ঘিরে তদন্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি আগে নিষিদ্ধ উগ্রপন্থি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং ২০২৩ সালে গ্রেফতার হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের সুযোগে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। পরে নব্য জেএমবির সামরিক শাখায় যোগ দিয়ে ‘ওস্তাদ’ নামে পরিচিত হন এবং বোমা তৈরির কারিগর নাজমুল হাসান মামুনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসাবে কাজ করছিলেন।
অন্যদিকে ১১ আগস্ট সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গ্রেফতার মোহাম্মদ আরিফের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১১টি পাইপ বোমা এবং আইইডি তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সিটিটিসিতদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, আরিফ ২০২৩ সালে উগ্রবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নব্য জেএমবিতে যোগ দেন। বর্তমানে পলাতক ‘বোমারু মামুন’ ও তার সহযোগীদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
উগ্রবাদ নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য : বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলোয় নব্য জেএমবির সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে এলেও এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্য বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে অকার্যকর করার লক্ষ্যে সরকারের বাইরে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিও আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করছে। জনগণের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি, রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করা এবং সরকার পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখানোর অংশ হিসাবে এসব বিস্ফোরক ব্যবহারের চেষ্টা করা হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ধর্মীয় উগ্রবাদী রাজনৈতিক সংগঠনের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তার মত।তার মতে, সরকারের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে রাষ্ট্র পরিচালনাকে ব্যাহত করাই এসব তৎপরতার অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে। যারা এসব করছে, তারা সরকারকে জানান দিতে চাইছে যে তারা সক্রিয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদেরও একটি ফ্যাক্টর হিসাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। অর্থাৎ সরাসরি বড় ধরনের হামলা না করেও ধারাবাহিক আতঙ্ক সৃষ্টি করে সরকার ও প্রশাসনের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ : বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার রদবদল কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সাময়িক দুর্বলতা তৈরি হলে উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলো নিজেদের শক্তি জানান দেওয়ার সুযোগ খোঁজে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক পালাবদলের পর সৃষ্ট নানা সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা হতে পারে।
এর সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনারও একটি যোগসূত্র দেখছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বিভিন্ন দলের মাঠপর্যায়ের তৎপরতাকে কেন্দ্র করে যদি উত্তেজনা বাড়ে, তাহলে উগ্রপন্থিরা সেই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক পক্ষ যদি আতঙ্কের ঘটনাগুলোকে নিজেদের প্রচারণার অংশ হিসাবে ব্যবহার করে, তাহলে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, আওয়ামী লীগের সরাসরি সম্পৃক্ততা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো পক্ষের পরোক্ষ ইন্ধন থাকতে পারে-এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার বলেন,বিশেষ উদ্দেশ্যে কোনো মহল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে কি না, সে বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
আতঙ্ক তৈরিই বড় অস্ত্র :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ইমেরিটাস অধ্যাপক ড.আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, বোমা আতঙ্ক দিয়ে হোক বা অন্য কোনোভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার একটি চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। একটি সরকার এসেছে, গণতান্ত্রিক অবস্থা কায়েম হয়েছে, মাত্র ছয় মাস হয়েছে। সরকারকে আরও সময় দেওয়া প্রয়োজন। এখনই অস্থিরতা তৈরি করা হলে দেশের অগ্রগতি ব্যাহত হবে। তার মতে, পরাজিত শক্তিও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনে যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। পরাজিত শক্তি নানা কৌশলে ফিরে আসার চেষ্টা করবে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করতে আরও বড় কিছু ঘটাতে পারে। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হবে। তা না হলে জাতির জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
তদন্তে সব দিকই বিবেচনা : ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) নিয়াজ মেহেদী বলেন, বোমা আতঙ্কের পেছনে কোনো সংগঠন নাকি ব্যক্তি জড়িত, তা তদন্তাধীন। এসব ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বোমা তৈরির সঙ্গে জড়িতদের অনেকের নামও তদন্তে আসছে। তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। তিনি বলেন,সব ধরনের বিষয় সামনে রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে। সিটিটিসি, এটিইউসহ বিভিন্ন সংস্থা এ বিষয়ে কাজ করছে। কোনো সংগঠন, দল, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকুক না কেন, তদন্ত শেষে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।