শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করতে হবে - Alokitobarta
আজ : বুধবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করতে হবে


মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:দেশের শিক্ষা খাত সংস্কারে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়।সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা করতে হবে।ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শিক্ষা খাতে সামাজিক পরিবর্তন টেকসই করতে হলে একটি সমন্বিত সামাজিক ও শিক্ষাগত পরিকল্পনা দরকার।একটি পদক্ষেপ নিলেই হবে না।সেই পদক্ষেপ কার্যকর করতে আনুষঙ্গিক আরও অনেক উদ্যোগ নিতে হবে। তাই যারা শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেন,তাদের অংশগ্রহণে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, কৌশল প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করা জরুরি।ইতোমধ্যে শিক্ষার মানোন্নয়ন, বাজেট বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত সংস্কারে ১২ দফা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছেন মন্ত্রী।তবে বিগত সরকারের আমলে শিক্ষায় অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা কারণে খাদের কিনারে রেখে যাওয়া এ খাতকে পুনরুদ্ধারে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন,শিক্ষা খাতে উন্নয়নের জন্য শুধু কয়েকটি টার্গেট ঘোষণা করলেই হবে না। এতে স্থায়ী ও কার্যকর সামাজিক পরিবর্তন আনতে হবে।

এই শিক্ষাবিদ মনে করেন, একটি যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার জন্য পঞ্চবার্ষিক সামগ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার। এছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মধ্যে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা নির্ধারণ, কারিকুলাম নতুন করে লেখার পাশাপাশি তার কার্যকর বাস্তবায়নের দিকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রতি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করাসহ স্কুল, উপজেলা, জেলা ও অধিদপ্তর পর্যায়ে এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব কাজ করতে হলে গতানুগতিক প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। কারণ, অতীতে বিদ্যমান কাঠামো দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। একটি দক্ষ ও স্বাধীন টাস্কফোর্স জরুরি বিষয়গুলো চিহ্নিত করে সরকারের কাছে বাস্তবসম্মত সুপারিশ দিতে পারে।তিনি আরও বলেন,শিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাস্তবায়ন। পরিকল্পনা ও ঘোষণা অনেক সময় হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের সময় নানা বাধায় তা আটকে যায়। কোথায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে এবং কীভাবে তা দূর করা যায়-সেই বিশ্লেষণ প্রয়োজন। ইতোমধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য কিছু গবেষণা ও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত।বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন,বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নেওয়া হয়েছিল। সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজাতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক ইশতেহারের বিষয়গুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি করা উচিত। এতে বাস্তবমুখী ও দীর্ঘস্থায়ী একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণনয়ন সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের পরিচালক প্রফেসর ড.এম জসিম উদ্দিন বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে ১২ দফা এজেন্ডা উপস্থাপন করেছে, আমি তা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। এটি নিঃসন্দেহে শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতির জন্য একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার ওপর আরও বেশি জোর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সবার জন্য অনার্স, মাস্টার্স বা পিএইচডি বাধ্যতামূলক নয়। যারা উচ্চশিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহী এবং সত্যিকার অর্থে মেধা ও সক্ষমতা রাখে, তারাই উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাবে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা অধিক কার্যকর হতে পারে। এই জায়গায় কারিগরি শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি), ইঞ্জিনিয়ারিং, টেকনিক্যাল ট্রেড ও আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়ে আমরা ভোকেশনাল স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারি। এর মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হবে। এই মানবসম্পদ একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নে (ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও কাজ করার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশেও আমরা যদি বৃহৎ পরিসরে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী প্রস্তুত করতে পারি, বিশেষ করে আইটি ও প্রযুক্তি খাত, তাহলে আমরা দক্ষ শ্রমশক্তি (স্কিলড লেবার) বিদেশে রপ্তানি করতে পারব। এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনি অঙ্গীকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ভিশন’ বাস্তবায়নে ১২ দফা এজেন্ডা তুলে ধরেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এ সময় দেশের শিক্ষা খাতকে আর কেবল ‘খরচের খাত’ হিসাবে নয়, বরং মানবসম্পদের মূল কারখানা এবং জাতি গঠনের ‘প্রধান প্রকল্প’ হিসাবে দেখবে বলে মন্তব্য করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা।

এজেন্ডাগুলোর মধ্যে রয়েছে-বাজেটের ‘এনভেলপ’ বৃদ্ধি, উন্নয়ন বাজেটের গুণগত বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ব্যয়কে অগ্রাধিকার : মিড-ডে মিল, আধুনিক ল্যাব এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা, ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব : শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল পাঠ-পরিকল্পনা ও লার্নিং অ্যাভিডেন্স ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু। এছাড়া বহুভাষিক বাংলাদেশ : বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী তৃতীয় ভাষা (আরবি, চীনা, জাপানি বা ফরাসি) শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, ইনোভেশন স্পেস : প্রতিটি উপজেলায় স্কুলে ‘রোবোটিক্স ও মেকার কর্নার’ স্থাপন, খেলাধুলা বাধ্যতামূলক : মানসিক ও শারীরিক বিকাশে মাধ্যমিক স্তরের টাইমটেবিলে স্পোর্টস পিরিয়ড অন্তর্ভুক্ত করা, পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার : মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে আইটেম ব্যাংক ও লার্নিং ট্রাজেক্টরির মাধ্যমে দক্ষতা পরিমাপ, শিক্ষায় মানদণ্ড নির্ধারণ : সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার বৈচিত্র্য বজায় রেখে ‘ন্যূনতম শিখন মান’ এক করা, ব্রিজ কোর্স : এক শিক্ষা ধারা থেকে অন্য ধারায় যাওয়ার পথ (স্কিল ক্রেডিট) সুগম করার কথা বলা হয় তাতে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা : বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘জ্ঞান প্রতিষ্ঠানে’ রূপান্তরের লক্ষ্যে স্টুডেন্ট লোন ও ইনোভেশন গ্র্যান্ট প্রদান এবং পাবলিক ড্যাশবোর্ড : মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মাসিক ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি ও ক্লাসঘণ্টার জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

Top