পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বিচারের আওতায় আনা হবে জড়িতদের
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া :বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুনরায় কমিশন বা কমিটি গঠন করা হবে। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বিচারের আওতায় আনা হবে জড়িতদের। এটা আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারেও আছে। সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব কথা বলেন। সভায় পুলিশের শীর্ষ পদগুলোতে সম্ভাব্য রদবদলের বিষয়েও আলোচনা হয়। আপাতত শীর্ষ চারটি পদ-আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার, র্যাব মহাপরিচালক ও এসবি প্রধানের পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে। আইজিপি পদে ১৫তম ব্যাচ থেকে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়। সভা শেষে চারজন অতিরিক্ত আইজিপিকে মন্ত্রণালয়ে ডেকে নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তারা হলেন-আলী হোসেন ফকির, একেএম আওলাদ হোসেন, সরদার নুরুল আমিন ও মোসলেহ উদ্দিন। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন মন্ত্রী। তারা প্রত্যেকেই আইজি পদে যোগ্য উল্লেখ করে তাদের কাছে পৃথকভাবে জানতে চাওয়া হয়, ‘আপনি ছাড়া আর কাকে এই পদে যোগ্য মনে করেন।সে অনুযায়ী তারা জবাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। তবে মন্ত্রণালয়ে না ডাকলেও এদিন একজন ডিআইজি দেখা করেন মন্ত্রীর সঙ্গে। তিনি মন্ত্রীকে বলেন, ‘আমি বঞ্চিত। আমার ব্যাচমেটরা অনেক আগেই অতিরিক্ত আইজিপি হয়েছেন। আমি এখনো ডিআইজি রয়ে গেছি।’ তিনি তার পদোন্নতির ব্যবস্থা করার জন্য মন্ত্রীকে অনুরোধ জানান। মন্ত্রী তাকে অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। সভা শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের একটি মেসেজ ক্লিয়ার-চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে হবে। নির্বাচনের আগে দেশে লটারিতে ওসি-এসপি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে যার যেখানে যাওয়ার কথা না সেখানে দেওয়া হয়েছে। যারা যে জেলা সামলাতে পারবেন না তাকে সেখানে দেওয়া হয়েছে। এগুলো সার্ভিস রেকর্ড দেখে দেওয়া উচিত ছিল। আমরা মনে করি, এই লটারির প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ হয়নি। আমরা এগুলো নিয়ে কাজ করব। এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বেশকিছু মামলায় অনেক সুবিধাবাদী গ্রুপ ভোগান্তিতে ফেলতে সাধারণ অনেককে মামলায় জড়িয়েছে। এগুলোর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে। এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রিপোর্ট দেওয়া হবে। এ কাজগুলো পুলিশ করবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের কাজে অবৈধভাবে কেউ বাধা দিতে পারবে না। তবে পুলিশের জবাবদিহিতা অবশ্যই নিশ্চিত করা হবে। যাতে তাদের দ্বারা মানুষ হয়রানির শিকার না হয়। রাজনৈতিক কারণে বিধির বাইরে পুলিশ সুপাররা যেন কাউকে প্রটোকল না দেন, সে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে- জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পরিচালনা করা। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুলিশের ২ হাজার ৭০১টি কনস্টেবলের শূন্য পদে নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় যেসব আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, সেগুলো আমরা আবার ভেরিফাই করব।সেগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়েছে কিনা আমরা সেটা খতিয়ে দেখব। লাইসেন্স যারা পেয়েছে তারা এটা পাওয়ার উপযুক্ত কিনা সেটা যাচাই করা হবে। যেগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে লাইসেন্স পেয়েছে সেগুলো বাতিল করা হবে। এসব লাইসেন্সের অধীনে অস্ত্র থাকলে সেগুলোও বাতিল হবে। তিনি বলেন,দশ হাজারের বেশি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। সেগুলো এখন অবৈধ। এগুলো নিয়ে মামলা হতে পারে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় এগুলো উদ্ধার করা হবে। নীতিমালা উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার লাইসেন্স নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, পাসপোর্টসেবা নিয়ে জনগণের অনেক অভিযোগ আছে। আমাদের অনেকেই অনলাইনে ইলেকট্রনিকভাবে পাসপোর্ট আবেদনে অভ্যস্ত নয়। সেজন্য পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে কিছু লোকজনের সহযোগিতা নেয়, যারা অনলাইনে কাজ করার মাধ্যমে আয়-রোজগার করে। তাদের মাধ্যমে এবং পাসপোর্ট অফিসের কিছু লোকজনের যোগসাজশে জনগণ অনেক সময় ভোগান্তিতে পড়ে। সেটা নিরসনে রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখকদের ন্যায় তাদের নাম তালিকাভুক্ত করা হলে সেবা সহজীকরণ হবে এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে। তাদের কাজের জন্য তারা যাতে সার্ভিস চার্জ পায়-সেটাও নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, জনগণের হয়রানি ও ভোগান্তি নিরসনে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে এটি পরীক্ষামূলকভাবে আমরা চালুর চিন্তাভাবনা করছি। যদি ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ পদ্ধতিতে এটা টিকে যায়, পরবর্তীতে এটি সারা দেশে চালু করা হবে। এ বিষয়ে শিগগিরই মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি নীতিমালা তৈরি করা হবে।
২০০৬ সালে নিয়োগবঞ্চিত এসআই-পুলিশ সার্জেন্টদেরদের নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হবে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অবশ্যই তারা নিয়োগ পাবেন। বঞ্চিত এসআই-সার্জেন্টদের ফাইলটি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সারসংক্ষেপ আকারে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে গিয়েছিল। তখন কী কারণে ফাইলটি অনুমোদন হয়নি- জানি না। তিনি বলেন, তদন্ত করে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে। তারা ন্যায়বিচার পাবেন। তিনি বলেন, পুলিশের কাজে অবৈধভাবে বাধা বা হস্তক্ষেপ করা যাবে না। রাজনৈতিক হোক কিংবা সামাজিক হোক, কেউ পুলিশের বৈধ কাজে বাধা দিতে পারবে না। তবে এখানে পুলিশের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা হবে। পুলিশের কার্যক্রমও দেখা হবে, যেন জনগণ কোনো হয়রানির শিকার না হয়। তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদী সময়ে শুধু পুলিশ নয়, এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই যা ক্ষতিপ্রস্ত হয়নি। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে ঘুরে দাঁড়াতে হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জনগণের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করতে হবে। সেই মোটিভেশনাল ওয়ার্কটা আমরা করছি। আমি বিভিন্ন বিভাগে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলব, তাদের সাহস জোগাব এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য দিকনির্দেশনা দেব। পেছনের দিকে না তাকিয়ে সামনের দিকে লক্ষ্য রেখেই এগিয়ে যেতে হবে।
পুলিশ আইনের বাইরে কোনো প্রটোকল দিতে পারবে না জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দেশে ‘মব কালচার’ বরদাশত করা হবে না। মহাসড়ক অবরোধ বা সহিংসতার মাধ্যমে দাবি আদায়ের দিন শেষ। বৈধ উপায়ে দাবি উপস্থাপন করতে হবে। বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পুলিশ বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ ছাড়া সমাজ টিকে থাকতে পারে না। তাই সংস্কারের মাধ্যমে বাহিনীর মনোবল বাড়াতে হবে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে। তবে আইন ভঙ্গ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মব কালচারকে কঠোরভাবে দেখা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মব সংস্কৃতি শেষ।