আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার পরামর্শ
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তিতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে এ চুক্তি বাতিলের পরামর্শ দিয়েছেন সরকারের নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের আইনজীবী ফারহাজ খান। ওই চুক্তি নিয়ে সোমবার বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত চার মন্ত্রীর বৈঠকে তিনি ওই পরামর্শ দেন। ফারহাজ খান এজন্য সরকারকে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতেও বলেন। তার মতে, নির্বাহী আদেশ দিয়ে এ চুক্তি বাতিল সম্ভব নয়।বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পাঁচ দিনে আদানি নিয়ে দ্বিতীয় দফা বৈঠক করলেন সরকারের ওই চার মন্ত্রী। এর আগে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বৈঠক হয়েছিল। বিদ্যুৎমন্ত্রী সোমবারের ওই বৈঠকের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, আদানির ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আলাপ-আলোচনা হচ্ছে, দেখা যাক।এদিকে আদানির চুক্তি বাতিল হলে ওই ঘাটতি (১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ) পূরণে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি সরকারের কাছে ৬ মাস সময় চেয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার আদানির চুক্তি বিবেচনা ও করণীয় নির্ধারণে ব্রিটিশ ল’ ফার্ম থ্রি ভিপির দ্বারস্থ হয়েছিল। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার কিং কাউন্সিল ফারহাজ খান। এই প্রথম তিনি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন। বৈঠকে বিদ্যুৎ খাত নিয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোস্তাক হোসেন খান ও বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ তাদের মতামত দেন। সূত্রমতে, বৈঠকে সিঙ্গাপুরে কয়লার দাম নিয়ে আদানির করা সালিসি মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করার সিদ্ধান্ত হয়। বলা হয়, আদানি চুক্তির একটা সমাধান দরকার। হয়তো বাতিল নতুবা অন্যকিছু। এভাবে দিনের পর দিন বিষয়টি ঝুলে থাকতে পারে না।
মোস্তাক হোসেন খান রাতে বলেন, আদানি চুক্তিতে ভয়াবহ দুর্নীতির প্রমাণ সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এখন সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে জাতীয় কমিটি চাইছে, সিঙ্গাপুরের কয়লার দাম নিয়ে লড়াই না করে সরকার আদানির চুক্তি এবং দুর্নীতি নিয়ে আইনি লড়াই করলে দেশের জন্য ভালো হবে। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে এই বিতর্কিত চুক্তির ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। এটি ভালো লক্ষণ। তবে বিষয়টি সহজ নয়। আদানি চুক্তির মূল্য প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। ভালো তথ্য-উপাত্ত ছাড়া আদানির বিরুদ্ধে লড়াই করা ঠিক হবে না।বৈঠকে জানানো হয়, আদানির চুক্তির কয়েকদিন পর ভিন্ন একটি দেশে তৎকালীন বিদ্যুৎ সচিব এবং পরে মুখ্যসচিব আহমেদ কায়কাউসের বিদেশের অ্যাকাউন্টে কয়েক মিলিয়ন ডলার লেনদেন হয়েছে। আদানির এক কর্মকর্তার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তার ঘুস লেনদেনের পরোক্ষ প্রমাণ মিলেছে। আদানি কীভাবে পুরো চুক্তি নিজের মতো করে নিয়েছে তারও কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।
জাতীয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, আদানির সঙ্গে চুক্তিকালীন (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯) সাবেক বিদ্যুৎ সচিব এবং আদানি চুক্তির সমঝোতা কমিটির প্রধান আহমেদ কায়কাউসের সঙ্গে দেশে-বিদেশে আদানির কর্মকর্তারা একান্তে দেখা করেছেন। আদানির ব্যাপারে মূল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আহমেদ কায়কাউস ও পিডিবির কয়েকজন কর্মকর্তা। এর মধ্যে রয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ, পিজিসিবির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া এবং পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান। তারা আর্থিক লেনদেন করেছেন কিনা তা খতিয়ে দেখছে দুদক। এ নিয়ে আহমেদ কায়কাউস ছাড়া ১১ জন সরকারি কর্মকর্তাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
সোমবারের বৈঠকে বলা হয়, জাতীয় কমিটির কাছে দুর্নীতির প্রমাণ থাকলেও আইনগত ভিত্তি দরকার। এজন্য আন্তর্জাতিক একটি অনুসন্ধানী সংস্থাকে নিয়োগ দেওয়া দরকার। তারা বিস্তারিত অনুসন্ধান করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন দিলে তা আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। বৈঠকে বলা হয়, আদানির পিপিএ (বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি) ধরে কাজ করতে হবে। কয়লার দাম নিয়ে বিরোধের কারণে তারা এখন ৫০ কোটি ডলার বা সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার দাবি জানিয়ে সিঙ্গাপুর আদালতে মামলা করেছে। এত টাকা বকেয়া থাকা সত্ত্বেও তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাচ্ছে। এর মানে হচ্ছে, আদানি এই প্রকল্প থেকে অস্বাভাবিক টাকা লাভ করছে।
সূত্রমতে, বৈঠকে আইনজীবী ফারহাজ খান আদানি চুক্তির বিভিন্ন অনিয়ম এবং দুর্নীতির প্রমাণ তুলে ধরে বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতে গেলে এই চুক্তি বাতিল করা সম্ভব। অন্য কোনোভাবে এটি বাতিল করা ঠিক হবে না। ওই সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো মন্তব্য করেননি। তবে আইনমন্ত্রী অকাট্য তথ্য-প্রমাণ ছাড়া আদানির বিরুদ্ধে কোনো কিছু না করার ব্যাপারে মত দেন। বিদ্যুৎমন্ত্রী আদানির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দেন। তবে এর আগে রোববার যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকা ঠিকানাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেছেন, আদানির চুক্তি বাতিল না করে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করার পক্ষে তিনি।
ভারতের ঝাড়খণ্ডে কয়লাভিত্তিক ১৬০০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ এনে পিডিবিকে বিক্রি করে আদানি গ্রুপ। ভারতের কয়লাভিত্তিক অন্যান্য কেন্দ্র থেকে পিডিবি বিদ্যুৎ আমদানি করে প্রতি ইউনিট গড়ে ৮ দশমিক ৫০ টাকায়। সেখানে আদানি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বাংলাদেশে বিক্রি করছে ১৪ দশমিক ৮৭ টাকায়। আদানির চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিক্রির সবকিছু নিষ্পত্তি হবে আন্তর্জাতিক আদালতে। সেই অনুযায়ী ঝাড়খণ্ড বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার দাম নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে গত অক্টোবরে সিআইএসিতে সালিসি মামলা করে আদানি গ্রুপ। আদানির অভিযোগ, চুক্তি অনুযায়ী কয়লার দাম দিচ্ছে না পিডিবি। চুক্তি অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কয়লা বিক্রির ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশ ঝাড়খণ্ডে ব্যবহার হওয়া কয়লার দাম পরিশোধ করবে। পিডিবির অভিযোগ, এখানে আদানি কারসাজি করছে। তাই আদানির কয়লার বিলের পুরোটা পরিশোধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। এভাবে মাত্র তিন বছরে কয়লার দাম নিয়ে ৫০ কোটি ডলার বা ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বিরোধ দেখা দিয়েছে আদানি ও পিডিবির মধ্যে। এ নিয়ে আদানি সিঙ্গাপুরের আদালতের মাধ্যমে জন বিশপ নামে একজন বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দিয়েছে। ওই বিশেষজ্ঞ পিডিবির প্রতিনিধি পাঠাতে নিয়মিত চিঠি ও ইমেইল দিচ্ছে সরকারকে।