সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ অধিবেশন বসবে জ্যেষ্ঠ সদস্যের সভাপতিত্বে
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে ১২ মার্চ। অধিবেশনের প্রথম দিনেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এছাড়াও উত্থাপন করা হবে বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো। এর আগে পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মনোনয়ন এবং শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে সংবিধানে।সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে এদিন ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। নিয়ম অনুযায়ী তার এ ভাষণটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হবে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের পরপরই মুলতবি করা হবে অধিবেশন। পরে মুলতবি অধিবেশন শুরু হলে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নেবেন সরকার ও বিরোধী দলসহ স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্যরা। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন হওয়ায় সাধারণত এটি দীর্ঘ হয়ে থাকে।এই অধিবেশনে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপন করা হতে পারে, যা পরে আইন আকারে পাশ হবে সংসদে।এই অধিবেশনে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ছাড়াও সংসদ উপনেতা এবং চিফ হুইপ নির্বাচন করা হবে। এসব পদে কে বসবেন-বিএনপি এখনো ঠিক করেনি। অধিবেশন শুরু হলে তা জানা যাবে। এছাড়াও সংবিধান অনুযায়ী বিদায়ি সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন সংসদের প্রথম শুরু এবং নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের কথা। কিন্তু এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। অধিবেশনের শুরুতে কে সভাপতিত্ব করবেন, কার সভাপতিত্বে নির্বাচিত হবেন নতুন স্পিকার-তা এখনো স্পষ্ট নয়। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পারবেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনের পর সরকারি দল এবং বিরোধী দলের আলোচনার ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠ একজন সদস্যকে সভাপতিত্বের দায়িত্ব দেওয়ার নজির রয়েছে। এবারও সেই রীতি অনুসরণ করা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন, এমন একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ-সদস্যের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু এবং স্পিকার নির্বাচন হতে পারে। এই অধিবেশনে বর্তমার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাগ্যও নির্ধারিত হতে পারে। দেখা যেতে পারে ৫০টি সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ-সদস্যদেরও।
সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ বসবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। রোববার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি একথা বলেন। মন্ত্রী এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, অধিবেশনসংক্রান্ত সারসংক্ষেপ জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে। রাষ্ট্রপতি সে মতে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করবেন। সেটিই নির্ধারণ হয়েছে ১২ মার্চ। তিনি জানান, এই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এছাড়াও প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অধ্যাদেশগুলো উপস্থাপন করা হবে এবং শোকপ্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। অধিবেশন কার সভাপতিত্বে শুরু হবে-এ বিষয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা এখনো বলতে পারছি না। স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার অনুপস্থিত। তারা অনুপস্থিত থাকলে সে ক্ষেত্রে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি, সংবিধান ও রেওয়াজ অনুসরণ করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।এ প্রসঙ্গে জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির ও নবনির্বাচিত বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের জানিয়েছেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে প্রথম দিনে একজন সিনিয়র সদস্য সভাপতিত্ব করার নজির রয়েছে। এবারের অধিবেশনেও এমনটিই হবে। তবে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবে সরকারি দল। সরকারি দল উদ্যোগ নিলে বিরোধী দল হিসাবে তারা পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করবেন।
এদিকে সংসদ সচিবালয়ও এ বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ইতোমধ্যে তারা রাষ্ট্রপতির দপ্তরে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়েছে। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, সংবিধানের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে আজকালের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন। জানা গেছে, প্রথম বৈঠকে স্পিকার নির্বাচনের পর অধিবেশন ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি দিয়ে নতুন স্পিকারের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি। এরপর তার (স্পিকার) সভাপতিত্বে মুলতবি বৈঠক বসবে। এ সময় ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনয়ন এবং শোক প্রস্তাব উত্থাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। এরপর রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। এ ছাড়া বিগত সংসদের পর থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, তার সব উপস্থাপন করা হবে। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী অধ্যাদেশগুলো উপস্থাপন করবেন। দ্বিতীয় বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। চিফ হুইপ এটি উত্থাপন করার পর ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর সংসদ-সদস্যরা দীর্ঘ আলোচনায় অংশ নেবেন।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের একদিন পরেই বিজয়ী প্রার্থীদের গেজেট প্রকাশ করা হয়। সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করে থাকেন। এক্ষেত্রে তিনি প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ নেন। এই হিসাবে ১৪ মার্চের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অন্যদিকে গেজেট প্রকাশের ৪ দিনের মাথায় ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা শপথ নেন। বিদায়ি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করায় ও ডেপুটি স্পিকার কারাগারে থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতে সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন সংসদ-সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। শপথের পর ওই দিনই সংসদীয় দলের সভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদ নেতা নির্বাচিত হন। সেদিন বিকালে তাকে প্রধানমন্ত্রী করে বিএনপি জোটের নতুন সরকার যাত্রা শুরু করে। একই দিন ৬৮ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামী দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসাবে নির্বাচিত করেন। এছাড়া বিরোধীদলীয় উপনেতা নির্বাচিত হন জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত হন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের অধিবেশন প্রাণবন্ত করতে সরকার ও বিরোধী দল-দুপক্ষই প্রস্তুতি নিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের একপেশে সংসদের ইতি ঘটবে এবার। জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ নানা ইস্যুতে উত্তাপ ছড়াবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। একই সঙ্গে সংসদই হয়ে উঠবে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু।
এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একটি কার্যকর এবং গঠনমূলক বিরোধী দল হিসাবে দুনিয়ার সভ্য দেশগুলো যেভাবে দায়িত্ব পালন করে, আমরা সেই সংস্কৃতিটা সংসদে দেখতে চাই। সংসদের একটি সরকারি দল ও আরেকটি বিরোধী দল থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। বিরোধী দল যেন তার ন্যায্য কথা বলার অধিকার পায়, সেটা আমরা আশা করব।সংসদকে প্রাণবন্ত করতে বিরোধী দলের ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা করে পানিসম্পদমন্ত্রী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন,রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতে পারে। সব ইস্যুতে বিরোধিতা না করে দেশ গড়ার স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফল এখনো ঘোষণা হয়নি। একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখা হয়েছে। বাকি ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯ এবং তাদের মিত্ররা তিনটি আসনে জয়ী হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয় পেয়েছে। তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২ এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসনে জয়লাভ করেছে। এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছেন।