‘সহানুভূতির সুযোগ’ নিয়ে মাঠে ফেরার চেষ্টা!
মোহাম্মাদ আমিনুল ইসলাম:কেউবা স্থানীয় রাজনীতির সমীকরণে অন্য কোনো দল, জোট বা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে বেছে নিচ্ছেন। ফলে ভোটের আগের এই সহানুভূতি রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে ভোটের আগেই নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটির স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীরা মাঠে ফেরার অবাধ সুযোগ পাচ্ছেন।দলীয়ভাবে অংশ নিতে না পারলেও এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের ভোটের সমীকরণে গুরুত্ব পাচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। দলটির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ভোট পক্ষে নিতে নীরবে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। আসনভিত্তিক নানা কৌশলে আওয়ামী লীগের ভোট টানার চেষ্টা করছে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো। হামলা-মামলা থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বিভিন্নভাবে তাদের প্রতি সহানুভূতিও দেখানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে এবং দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারাও এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না। বিশেষ করে সরকার পতনের পর পালিয়ে বেড়ানো থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এই সুযোগে প্রকাশ্য হওয়ার চেষ্টা করছেন। সুবিধামতো যিনি যে প্রার্থীকে নিজের জন্য প্রয়োজন কিংবা নিরাপদ মনে করছেন, তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে কেউ বিএনপি,কেউ আবার জামায়তের পক্ষেও কাজ করছেন।
এদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে ভোট বজর্নের আহ্বান জানানো হয়েছে। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা এবং তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় একাধিক ভিডিও ও অডিও বার্তায় দলের নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দলের পক্ষ থেকে ‘নো বোট-নো ভোট’ প্রচার চালিয়ে বলা হচ্ছে-‘যে নির্বাচনে নৌকা নেই, সে নির্বাচনে ভোট নয়…।সোমবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটির পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও নেতাকর্মী, সমর্থকসহ দেশবাসীকে ভোট বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকদের বিএনপি, জামায়াতসহ অন্য দলের প্রার্থীদের পক্ষে ভোটের প্রচারণায় সক্রিয় হওয়া বা কৌশলে মাঠে থাকতে দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতা এবং সাবেক এমপি-মন্ত্রীরাও কর্মী-সমর্থকদের ভোটের ডামাডোলে সমাজের মূল ধারায় মিশে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন।
৩ ফেব্রুয়ারি শিবচর পৌরসভার খান বাড়িতে মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তারের উঠান বৈঠকে উপস্থিত হন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ২০ নেতাকর্মী। বিএনপির প্রার্থীকে বিজয়ী করতে তারা এই উঠান বৈঠকে হাজির হয়ে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে ধানের শীষে ভোট চান। আওয়ামী লীগের এসব নেতার দাবি, তারা সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটনের নির্দেশে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে সমর্থন জানাচ্ছেন। এছাড়া পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, ভোলার বোরহানউদ্দিনসহ বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে অন্য দলের প্রার্থীদের জন্য ভোট চাইতে দেখা গেছে। এসব ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়। নির্বাচন সামনে রেখে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশনার বিষয়ে কথা হয় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্যের সঙ্গে। দেশের বাইরে অবস্থান করা এই নেতা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, অন্যায়ভাবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে এই নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে দলগতভাবে আমাদের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। আমাদের দলের সভাপতি শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে এই নির্বাচন বর্জন করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভোটের প্রচারে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন একটা কঠিন সময় যাচ্ছে। আমরা তো জোর করে কোনো বিষয় চাপিয়ে দিয়ে তাদের বিপদে ফেলতে পারি না। তাছাড়া স্থানীয়ভাবে তাদের টিকে থাকার একটা বিষয় তো আছেই।
নির্বাচন সামনে রেখে মনোভাব বুঝতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের থানা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাদের কাছ থেকেও আসে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের বক্তব্য। কেউবা দলের নির্দেশনাকে প্রাধান্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জনের পক্ষে অনড় থাকছেন। কেউ আবার টিকে থাকার কৌশলের অংশ হিসাবে আপাতত দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন। যদিও মাঠপর্যায়ে প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ ভোটার ভোট দিতে যাবেন না। কেউ আবার যেতে বাধ্য হলেও না ভোট দিতে যাবেন। এমনকি অনেকে আবার এমপি প্রার্থীদের ব্যালট পেপারে কোনো সিল না দিয়ে চলে আসবেন। তবে মাঠের প্রকৃত বাস্তবতা হলো-আওয়ামী ভোটারদের ভোট নিশ্চিতভাবে কোনো একটি দলের পক্ষে পড়বে না। অঞ্চল ভেদে কর্মী-সমর্থকদের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগের ভোট কোন দিকে যাবে, তা কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে-প্রার্থীর আদর্শিক অবস্থান আওয়ামী লীগের কাছাকাছি কিনা, নির্দিষ্ট প্রার্থীর সঙ্গে ভোটারের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সামাজিক সম্পর্ক এবং সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে-গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোন দলের নেতাকর্মীরা কী ধরনের আচরণ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের একজন নেতা বলেন-৫ আগস্টের পর আমরা যখন বিপদে ছিলাম, তখন একটি দলের লোকজন আমাদের বিরুদ্ধে হামলা-মামলাসহ নানাভাবে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু ওই সময় আরেক একটি দলের নেতাকর্মীরা গোপনে আমাদের আশ্রয় দেওয়াসহ টাকা-পয়সা দিয়েও পাশে ছিল। আওয়ামী পরিবারগুলো ভোটের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ও বিবেচনায় রাখছে।
২৮ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে প্রচারণায় গিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,এবার তো নৌকা নেই।নৌকা পালিয়েছে। মাঝখানে তাদের যেসব সমর্থক আছেন,তাদের বিপদে ফেলে গেছে।আমরা সেই বিপদে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। একই দিন বিএনপির নেতা আ ন ম এহছানুল হক মিলন চাঁদপুরের কচুয়ায় বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সমর্থকরা আমাকে ভোট দিন, আমি আপনাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেব।’
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঘোষণা দিয়েছেন,আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হবে না।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর তার নির্বাচনি এলাকায় বলেছেন,আওয়ামী লীগের দায়িত্ব আমি নিলাম।আপনাদের একজনেরও বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না।
স্বাধীনতার পর ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ এই চারটি নির্বাচনকে বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যথাক্রমে ৩০ দশমিক ০৮, ৩৭ দশমিক ৪৪, ৪০ দশমিক ১৩ ও ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনগুলো পরিচিতি পায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, রাতের ভোটের নির্বাচন এবং আমি-ডামির নির্বাচন হিসাবে।
এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের পতন ঘটে। বর্তমানে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সভাপতি শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতারা পলাতক বা কারাগারে। মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। এছাড়া পতনের পর থেকে এ পর্যন্ত দলীয় কিছু ঝটিকা মিছিল ছাড়া প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি দলটি। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা, দলের সভাপতিকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া এবং তাদের বাইরে রেখেই নির্বাচনের দিকে গেলেও বড় ধরনের কোনো প্রতিবাদ দেখাতে পারেনি আওয়ামী লীগ। এসব কারণে আওয়ামী লীগের প্রকৃত ভোটব্যাংক এখন কতটা তা নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারছেন না। তবে এ কথা সত্য যে-আওয়ামী অধ্যুষিত দেশের বেশকিছু আসনে জয়ের জন্য বড় ফ্যাক্টর হবে আওয়ামী লীগের ভোট।