দেশে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে দুর্নীতি
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:দেশে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে দুর্নীতি।প্রথমত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। দ্বিতীয়ত, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলো দলবাজি, বেপরোয়া দখল, চাঁদাবাজি ও মামলাবাজিতে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। তারা জনগণের কাছে জবাবহিদিকে গুরুত্ব দেয়নি। এমনকি জনগণের কাছে জবাবহিদিসংক্রান্ত রাষ্ট্রের মৌলিক বিষয়ে সংস্কারে তারা নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) দিয়েছে। অর্থাৎ তারা জনগণের কাছে জবাবহিদি চায় না। এ সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখার পরামর্শ দেন তিনি।ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির সূচকে আরও এক ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। ১৮২টি দেশের মধ্যে ২০২৫ সালে অধঃক্রম অনুযায়ী (খারাপ থেকে ভালো) বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। আগের বছর ছিল ১৪তম। অর্থাৎ বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে। তবে যে স্কোর দিয়ে দুর্নীতি মূল্যায়ন করা হয়, সেক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ১০০ নম্বরের মধ্যে এবার স্কোর ২৪। আবার সূচকের উচ্চক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০। টিআইর ‘দুর্নীতির ধারণাসূচক-২০২৫ (করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স বা সিপিআই) মঙ্গলবার সারা বিশ্বে একযোগে প্রকাশ করা হয়। এদিন বাংলাদেশে টিআইর সহযোগী প্রতিষ্ঠান টিআইবি নিজস্ব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।তার মতে, দুই কারণে দুর্নীতি বেড়েছে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশের এই অবস্থান এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পঞ্চম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয়। এছাড়া বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়া এবং সবচেয়ে কম ডেনমার্ক। দুর্নীতি প্রতিরোধে বেশকিছু সুপারিশ করেছে টিআইবি। এগুলো হলো-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুদককে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং অবাধ গণমাধ্যম ও সক্রিয় নাগরিক সমাজ বিকাশে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন-টিআইবির উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
বাংলাদেশের অবস্থান : প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮২টি দেশের মধ্যে আলোচ্য বছরে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০তম। ২০২৪ সালে ছিল ১৫১তম। একই স্কোর নিয়ে তালিকার উচ্চক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ অবস্থানে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও প্যারাগুয়ে। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ পঞ্চম। এর আগে রয়েছে সিরিয়া, মিয়ানমার এবং উত্তর কোরিয়া। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের বর্তমান স্কোর ও অবস্থান প্রমাণ করে, গত দেড় বছরে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক ও অন্যান্যভাবে ক্ষমতাবান নানা শক্তির প্রভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো তৈরি করতে পারেনি। মামলার যথাযথ বিচার, স্বপ্রণোদিত তথ্যপ্রকাশকারী, অনুসন্ধানী সাংবাদিক বা তদন্তকারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতে পরিবেশ তৈরিতেও সরকার ব্যর্থ। অন্যদিকে দুর্নীতি দমনে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, সংস্কার প্রস্তাব অবহেলা করেছে। সিপিআই অনুযায়ী, দুর্নীতির ধারণার মাত্রাকে ০ (শূন্য) থেকে ১০০ (একশ) এর স্কেলে নির্ধারণ করা হয়। এই পদ্ধতি অনুসারে স্কেলের ০ (শূন্য) স্কোরকে সর্বোচ্চ এবং ১০০ স্কোরকে সর্বনিম্ন দুর্নীতি বলে ধারণা করা হয়। ২০২৫ সালে ১০০ স্কোরের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৪, আগের বছর ছিল ২৩। সিপিআই অনুসারে, ১০০ স্কোরের মধ্যে বৈশ্বিক গড় স্কোর ৪২। অর্থাৎ বৈশ্বিক গড় স্কোরের তুলনায় বাংলাদেশ ১৮ নম্বর কম পেয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের গত ১২ বছরের গড় স্কোর ২৫.৫। অর্থাৎ ১২ বছরের গড় স্কোরের চেয়ে এবার দেড় নম্বর কম।
দুর্নীতিতে সর্বনিম্ন : ১০০-এর মধ্যে ৮৯ স্কোর পেয়ে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ডেনমার্ক। অর্থাৎ ১৮২টি দেশের মধ্যে ডেনমার্কে দুর্নীতি সবচেয়ে কম হয়েছে। তারপর সবচেয়ে কম দুর্নীতি থাকা দেশগুলোর মধ্যে ৮৮ স্কোর নিয়ে ফিনল্যান্ড দ্বিতীয়। ৮৪ স্কোর নিয়ে সিঙ্গাপুর তৃতীয়, ৮৩ স্কোর নিয়ে নিউজিল্যান্ড ও নরওয়ে চতুর্থ এবং ৮০ স্কোর নিয়ে যৌথভাবে সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড ষষ্ঠ। ৭৮ স্কোর নিয়ে যৌথভাবে অষ্টম অবস্থানে লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডস। এছাড়াও ৭৭ স্কোর নিয়ে যৌথভাবে দশম অবস্থানে রয়েছে জার্মানি ও আইসল্যান্ড।
সর্বোচ্চ দুর্নীতি : সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় উঠে এসেছে দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়ার নাম। এবার দেশ দুটির স্কোর মাত্র ৯। এই তালিকায় আরও রয়েছে ভেনিজুয়েলা, লিবিয়া, ইয়ামেন, আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়া, নিকারাগুয়া, সুদান, উত্তর কোরিয়া, ইক্যুইটোরিয়াল গেনিয়া এবং সিরিয়া।
দক্ষিণ এশিয়া : দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম দুর্নীতি হয় ভুটানে। ৭১ স্কোর নিয়ে উপরের দিক থেকে তাদের অবস্থান ১৮তম। দেশটিতে ২০২৪ সালের তুলনায়ও দুর্নীতি বেড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তান ১৬ পয়েন্ট নিয়ে সর্বনিম্ন অবস্থানে আছে। এই অঞ্চলে আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
দুর্নীতির ধরন : রিপোর্টে দুর্নীতির বেশ কিছু ধরনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো-ঘুস ও সরকারি তহবিল তছরুপ, ব্যক্তিগত লাভের জন্য কর্মকর্তাদের সরকারি অফিসের অবাধ ব্যবহার, সরকারি কাজে অতিরিক্ত লাল ফিতার দৌরাত্ম্য-যা দুর্নীতির সুযোগ বৃদ্ধি করে, সরকারি নিয়োগে স্বজনপ্রীতি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দখলদারত্ব।
অর্থ পাচার : অর্থ পাচার বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা। তবে বাংলাদেশ থেকে যেসব দেশে বেশি অর্থ পাচার হচ্ছে, ওই সব দেশগুলোতে তুলনামূলকভাবে দুর্নীতি কম। এর মধ্যে রয়েছে-সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, কানাডা, হংকং, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া এবং ভারত। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এসব দেশে দুর্নীতি কম হলেও তারা অর্থ পাচারে সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশ থেকে যে অর্থ পাচার হচ্ছে, তার অন্যতম গন্তব্য ভারত। নানা ভাবে সেখানে টাকা যাচ্ছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চোরতন্ত্র ব্যাকফুটে রয়ে গেছে। এটির পতন করা সম্ভব হয়নি। সরকারের যে দায়িত্ব ছিল, সেটি পালনে তারা অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। যে সংস্কারগুলোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে অনেক ক্ষেত্রে ধীরগতি দেখা গেছে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে শ্রীলংকা ৩ পয়েন্ট উন্নতি করতে সক্ষম হলেও ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের ১ পয়েন্ট উন্নতি দুর্নীতি কমার কারণে নয়, বরং জুলাই আন্দোলনের ফল। কেননা, আন্দোলনটি চোরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিল। তিনি বলেন, আমরা চোরতন্ত্রের জন্য দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক দলগুলো বেপরোয়া হয়ে গেছে। তারা দলবাজি-দখলদারি, চাঁদাবাজি ও মামলাবাজিতে ব্যস্ত। গণ-অভ্যুত্থান হলেও আচরণে পরিবর্তন হয়নি। দুর্নীতি দমন হয়নি, হাতবদল হয়েছে মাত্র। তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখা উচিত। এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জান বলেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে জবাবদিহি চায় না। কারণ রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। যে প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছে জবাবদিহি করে, সে সব মৌলিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারে তারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। এটি কাম্য ছিল না। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান দুটি দায়িত্ব ছিল-রাষ্ট্র সংস্কার ও দুর্নীতি প্রতিহত করা। দুটি ক্ষেত্রেই তারা ব্যর্থ। তারা নিজেদের পছন্দে জোর দিয়েছেন, অন্য কারও মতামতের মূল্যায়ন করেনি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, রাজনৈতিক ও আমলাতন্ত্রের অপশক্তির কারণে কাক্সিক্ষত সংস্কার বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বচ্ছতার চর্চা করতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে দুর্নীতিমুক্ত হওয়া সম্ভব কি না, সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো আগামী নির্বাচনে যে ইশতেহার ঘোষণা করেছে, তাদের সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলেই দুর্নীতি প্রতিহত করা সম্ভব। নিজের স্বার্থের আগে রাষ্ট্রের স্বার্থে গুরুত্ব দিতে হবে। ক্ষমতায় আসুক বা না আসুক, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্নীতি দমনে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ সিপিআই স্কোরে ১০০ পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থান করছে, সেসব দেশগুলোতে দুর্নীতি করলে শাস্তি নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। আমাদের দেশেও এটি নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে দুর্নীতিগ্রস্তরা যেন দায়মুক্তি না পায়, সেজন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। দুদকের পাশাপাশি সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি দমনে কাজ করতে হবে। সংস্থার এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এজন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাড়াতে হবে। যে দেশগুলোতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যত বেশি, সেই দেশগুলোতে তত দ্রুত দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। তিনি আরও বলেন-গণ-অভ্যুত্থানের পর সংস্কার প্রক্রিয়ার দুর্বলতা, মাঠপর্যায়ে দুর্নীতিসহ অন্য কারণে সার্বিকভাবে এক ধাপ অবনতি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারেনি। আমরা একটা বড় সুযোগ হারালাম।’ তার মতে, বাংলাদেশের দুর্নীতির অবস্থা ক্রমশই খারাপ হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বিশ্বের ১৩টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের জরিপের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই রিপোর্ট তৈরি করে টিআই। এক্ষেত্রে যেসব দেশ এখানে স্থান পাবে, তাদের কমপক্ষে ৩টি আর্ন্তজাতিক জরিপ থাকতে হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তথ্যসূত্র হিসাবে ৮টি জরিপ ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো হলো- বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল অ্যাসেসমেন্ট, ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম এক্সিকিউটিভ ওপিনিয়ন সার্ভে, গ্লোবাল ইনসাইট কান্ট্রি রিস্ক রেটিংস, বার্টেলসম্যান ফাউন্ডেশন ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স, ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট রুল অব ল, পলিটিক্যাল রিস্ক সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল কান্ট্রি রিস্ক গাইড, ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কান্ট্রি রিস্ক রেটিংস এবং ভ্যারাইটিস অব ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট ডাটাসেট রিপোর্ট। সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয় যে, সিপিআই নির্ণয়ে টিআইবির কোনো ভূমিকা নেই। এমনকি টিআইবির গবেষণা থেকে প্রাপ্ত কোনো তথ্যও এখানে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতোই টিআইবি ধারণা সূচক দেশীয় পর্যায়ে প্রকাশ করে। এক্ষেত্রে এবারের সূচকের জন্য ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘কে বলেছে আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হচ্ছে’। আওয়ামী লীগের ভোটারদের মধ্যে যারা জেলে আছেন, তারা ইতোমধ্যে ভোট দিয়ে ফেলেছেন। মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একদল নির্বাচন ঠেকাতে সহিংসতায় ব্যস্ত। অর্থাৎ নির্বাচনে তারা ভূমিকা পালন করছেন। দ্বিতীয়ত, নেতাকর্মীদের অনেকে বিভিন্ন দলে যোগ দিচ্ছেন। তারা ওইসব দলের পক্ষে ভোটে প্রচারও করছেন। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ভোটে সক্রিয়। তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
মঙ্গলবার টিআইবির নিজস্ব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনসংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তার মতে, আওয়ামী লীগের কেউ এখন পর্যন্ত তাদের অপরাধের জন্য অনুশোচনা করেনি। আজকের পরিস্থিতির জন্য আওয়ামী লীগই দায়ী।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখার বলেন, ‘আপনারা কি মনে করছেন আওয়ামী লীগ নির্বাচন করছে না? তারা কি ইতোমধ্যে বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট দেয়নি? তিনি বলেন, ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন বলতে কী বোঝায়। এই নির্বাচনকে যারা অন্তর্ভুক্তিমূলক বলছি না, আগের ১৬ বছর আমরা কী করেছি। ওইসব নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হয়নি, তা কয়টি প্রতিষ্ঠান এবং কতজন ব্যক্তি বলেছেন। শুধু টিআইবির এই ঘর থেকে ওই সময়ে বলা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, দল হিসাবে আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে তারা নির্বাচনবিরোধী। তারা তো নিজেরাই নির্বাচন বর্জন করেছে। এ সময়ে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘পেছনের অপরাধের জন্য আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত কোনো অনুশোচনা করেছে? পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ আছে, যে বিশ্বাস করে তার কোনো অপরাধ নেই? আওয়ামী লীগকে আবার মাঠে ফিরতে হলে অবশ্যই তাকে বলতে হবে, স্যরি (দুঃখিত), আমি ভুল করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এরকম কথা কেউ কি বলেছে? আমরা তো শুনিনি।’
ড. ইফতেখার বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নির্বাচন প্রতিহতের ঘোষণা দিয়ে নিঃসন্দেহে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ইন্ধন জোগাচ্ছে। দেশের ভেতরে ও বাইরে তাদের নেতাকর্মীদের দিয়ে সহিংসতা করাচ্ছে। তাদের এই কার্যক্রম ইতোমধ্যে সবাই জানে। অর্থাৎ নির্বাচনে এখনো আওয়ামী লীগ ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে সারা দেশে মাঠ পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নির্বাচনকে সহিংস ও সংঘাতময় করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে তাদের আশ্রয়দাতা দেশের ইন্ধন থাকতে পারে।’ তার মতে, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে হলে ওই ভূমিকা তাদের নিজেদেরই পালন করতে হবে। অন্য কেউ এটি করতে পারবে না। দলটির আজকের পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অপরাধের দায় স্বীকার করে রাজনীতিতে ফিরতে চাইলে আমি মনে করি, এ দেশের মানুষ ঠিকই তাদের মেনে নেবে। কিন্তু সেটি তারা করবে কি না, তা তাদের ওপর নির্ভর করছে।