চলছে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি - Alokitobarta
আজ : বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চলছে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি


মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:এখন চলছে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি। কারণ বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ কাল।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রচার শেষ হয়েছে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটায়। তাই নির্বাচন কমিশন (ইসি), রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা তাদের শেষ মুহূর্তের নির্বাচনি কাজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছেন। নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ সক্রিয় দলগুলো তাদের মাঠের কৌশল নির্ধারণ করছে। ভোটগ্রহণ সামনে রেখে সারা দেশে যেমন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে, তেমনি রয়েছে সহিংসতার আশঙ্কাও। ভোটের নিরাপত্তায় ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছেন সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয় লাখ ১৯ হাজারের বেশি সদস্য। এর সঙ্গে আছেন দুই হাজার ১০০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। এসব ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্বাচনি অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশনা দিয়েছে ইসি।

এছাড়া আজ কেন্দ্রে কেন্দ্রে যাবে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনি সামগ্রী। ওইসব নির্বাচন সামগ্রী দিয়েই আগামীকাল বৃহস্পতিবার গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘদিন পর মানুষ মুক্ত পরিবেশে উৎসবের ভোটে অংশ নিতে মুখিয়ে আছেন। ভোট দিতে ইতোমধ্যে ঢাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামের উদ্দেশে চলে গেছেন। ইসি আশা করছে, এ নির্বাচনে ৬০-৬৫ শতাংশ ভোট পড়বে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ভিন্ন এক পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেশে এই প্রথম একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ ও গণভোট। দুটি ভোটগ্রহণ একই দিনে হওয়ায় ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। আগামীকাল সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে চলবে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। দেশে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি দল এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দুই হাজার ২৮ জন প্রার্থী। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকায় এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা দলটির শীর্ষ নেতারা এ নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছে। তাদের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে সারা দেশ থেকে খবর আসছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নিরাপত্তার আশ্বাসে দলটির তৃণমূলের একটি অংশ ভোট দিতে যাবে।

বিগত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। ওই তিন নির্বাচনের মধ্যে ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলগুলোর অংশগ্রহণ ছিল না। ওই তিন নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ একচেটিয়া জয় পায়। অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। দলটি এখন নির্বাচনবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। এ নির্বাচনে মূল লড়াই হচ্ছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে। নির্বাচনি প্রচারে কিছু ঘটনা ছাড়া দুই পক্ষের মধ্যে খুব বড় ধরনের সংঘর্ষ দেখা যায়নি। তবে ভোটগ্রহণের দিন কিছু কিছু এলাকায় সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবার নির্বাচনের পরিবেশ ভালো বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি ও পরিবেশ নিয়ে মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনে ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। নির্বাচন কমিশনার বলেন, এ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা যে পরিস্থিতিতে আছে, তাতে ইসি সন্তুষ্ট। যে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো ঘটেছে, এগুলো না ঘটলে আরও ভালো হতো বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, অতীতে যে কোনো সময়ের চেয়ে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার বলেন, সৌহার্দপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে আমাদের অনেক প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠান আমরা সম্পন্ন করব। এই সুন্দর পরিবেশ বজায় রেখে ও যেসব জায়গায় কিছুটা হলেও এখনো পর্যন্ত টেনশন বিরাজমান সেগুলো যেন আর কন্টিনিউ না করে, সেই প্রত্যাশা করেন তিনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে বেশ কয়েকটি দলের নেতারা প্রার্থী হয়েছেন। এ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে দলটির প্রার্থী রয়েছেন ২৯১ জন। অপরদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১টি দল জোট গঠন করেছে। দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে জামায়াতের প্রার্থী রয়েছেন ২২৮ জন। জোটের শরিকদের মধ্যে এনসিপির ৩২ জন, এবি পার্টির ৩০ জন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন ও জাতীয় পার্টির ২০০ জন প্রার্থী নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন।

হেভিওয়েট প্রার্থীরা ঢাকায় : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতা ঢাকায় নির্বাচন করছেন। ঢাকা-১৭ আসনে লড়ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী স. ম. খালিদুজ্জামান। প্রায় এক ডজন প্রার্থী রয়েছে এই আসনে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঢাকা-১৫ আসনে। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হচ্ছেন মো. শফিকুল ইসলাম খান। ঢাকা-১৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৮ জন প্রার্থী। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মো. মামুনুল হক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঢাকা-১৩ আসনে। তার সঙ্গে ভোট করছেন বিএনপির ববি হাজ্জাজসহ নয়জন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, হেভিওয়েট বিবেচনায় ঢাকার আসনগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ঢাকায় হঠাৎ করে সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কা মাথায় রেখে বস্তি, শিক্ষার্থীদের ম্যাচ ও মাদ্রাসাগুলোর ওপর বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে।

ইসির ব্রিফিং : নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার ব্রিফ করেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি জানান, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। তবে নির্বাচনকে ঘিরে দুষ্টচক্র থেমে নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন এই ইসি। তিনি বলেন, এই পর্যন্ত যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আছে তাতে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। যেসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে, এগুলো না ঘটলে আরও ভালো হতো। অতীতে যে কোনো সময়ের চেয়ে আমরা ভালো অবস্থায় আছি।

গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৮৫০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে জানিয়ে ইসি আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, এই অস্ত্রের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আমাদের ধারণা নির্বাচনে অপব্যবহার করার জন্য আনা হয়েছিল। কুমিল্লার একটা জায়গা থেকে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনে অপব্যবহার করার। কদিন আগে ঢাকা শহরের একাধিক জায়গা থেকে পাওয়া গেল, যশোর, ফরিদপুর থেকেও অস্ত্র পাওয়া গেল। সুতরাং দুষ্টচক্র যারা নির্বাচনি সহিংসতা ঘটাতে চায়, তারা তো থেমে নেই। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন এসব ব্যাপারে সচেতন আছে বলেই সহিংসতা সেই পর্যায়ে ছড়াতে পারেনি।

নির্বাচনকে ঘিরে ৫০ শতাংশ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, এসব কেন্দ্রের জন্য নির্বাচন কমিশন কী ধরনের ব্যবস্থা নেবে-সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইসি আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল আছে। এই সেলগুলো সংবেদনশীলতা বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করে থাকে। ন্যূনতম একটা ভোটকেন্দ্রে ১৫ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য থাকবেন। এই সংবেদনশীলতার নিরিখে কোনো কোনো জায়গায় সংখ্যাটা বাড়বে, আবার কোনো কোনো জায়গায় ভাগ ভাগ আরেকটা ফোর্সকে মোতায়েন করা থাকবে।

রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, ভোটার, সমর্থক-সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, সবার প্রতি আহ্বান যে, আমরা যেন এই সুন্দর পরিবেশ বজায় রেখে সৌহার্দপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অতি প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পারি।

ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা হলে ভোটগ্রহণ অব্যাহত রাখা হবে নাকি করা হবে জানতে চাইলে ইসি আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, বিনা কারণে অনেক সময় গণ্ডগোল লেগে থাকে। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে অনেক সময় দুজন মিলে ঝগড়াঝাটি লাগতে পারে। সেখান থেকে আরও চারজন এটার সঙ্গে উৎসাহী মানুষ যোগ দিল। আমাদের বাস্তবতা তো এরকম। এরকম পরিস্থিতিতে হয়তো কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করা হবে। আবার আরেকটু বড় আকারের হলে অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনে আবার ভোট শুরু হবে। আর যেখানে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না তখন পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা আশা করছি এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না।

এ নির্বাচন কমিশনার জানান, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে রয়েছেন ৪৫ হাজার ৩৩০ জন দেশীয় পর্যবেক্ষক এবং প্রায় ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক। এছাড়া প্রায় ৯ হাজার ৭০০ জন সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন, যার মধ্যে বিদেশি সাংবাদিক রয়েছেন ১৫৬ জন। তিনি আরও জানান, এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচনে ড্রোন, বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও ব্যাপকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুটি ব্যালট একই সঙ্গে গণনা করা হবে বলেও জানান আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি জানান, কেন্দ্র পর্যায়ে প্রাথমিক ফল প্রকাশের পর তা রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। বেশির ভাগ আসনের ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে আশা করছে কমিশন।

Top