সন্দেহভাজন দুজন কারওয়ান বাজারের ভিড়ে মিশে যায়
নুর নবী জনী:ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বির (৪৪) খুনে সন্দেহভাজন দুইজনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পুলিশ বলছে, ঘটনার পর ওই দুই ব্যক্তি প্রধান সড়ক পার হয়ে কারওয়ান বাজারে ঢুকে পড়ে। মানুষের ভিড়ে মিশে যায়। তাদের গতিপথ শনাক্ত করতে আশপাশের বিভিন্ন সড়ক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি চার-পাঁচজন অংশ নিতে পারে।রহস্য উদ্ঘাটনে কিছু বিষয় সামনে রেখে মাঠে নেমেছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। তবে কারওয়ান বাজারে আধিপত্য ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ছিল কিনা– সেটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক বিষয়ও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা।এ ঘটনায় নিন্দা ও শোক জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হচ্ছে।
মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম গতকাল বৃহস্পতিবার তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেছেন। এতে অজ্ঞাতপরিচয় চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের নির্দেশদাতাও রয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। মুছাব্বির কিছুদিন ধরে প্রাণনাশের আতঙ্কে ছিলেন। তাঁর অনেক শত্রু রয়েছে বলে পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন।বুধবার রাত সোয়া ৮টার দিকে কারওয়ান বাজারের বিপরীতে স্টার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের পাশে আহ্ছানউল্লা টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের গলিতে দুর্বৃত্তরা মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা সুফিয়ান বেপারি ওরফে মাসুদ (৫০) গুলিবিদ্ধ হন। তিনি কারওয়ান বাজার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ঢামেক মর্গে মুছাব্বিরের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। মর্গ থেকে মরদেহ নেওয়া হয় নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে। দুপুরে প্রথম জানাজা হয়। সন্ধ্যায় আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, মুছাব্বিরের স্ত্রী বলেছেন, তাঁর স্বামীর অনেক শত্রু ছিল। বেশ কিছু দিন ধরে তাঁর স্বামী জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন। তবে কারা, কেন এই হুমকি দিয়েছে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। কাদের সঙ্গে কী কারণে মুছাব্বিরের শত্রুতা হয়েছিল, সেগুলো বের করার চেষ্টা চলছে।এ ছাড়া আরও একাধিক কারণ সামনে রেখে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। সন্দেহভাজন যে দুজনকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে পালাতে দেখা গেছে, তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
মুছাব্বিরের ছোট ভাই মাহবুবুর রহমান আজমান বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে তার ভাই গার্ডেন রোড এলাকায় পানি সরবরাহের ব্যবসা করছিলেন। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে স্থানীয়ভাবে ইন্টারনেট ব্যবসা শুরু করেন।
যে কোনো সময় আমাকে মেরে ফেলবে
মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের সঙ্গে ঢামেক মর্গ চত্বরে কথা হয়। তিনি সমকালকে বলেন, ‘মুছাব্বির প্রায় সময়ই আমাকে বলত, আমার অনেক শত্রু হয়ে গেছে। আমি বেশিদিন বাঁচব না। যে কোনো সময় আমাকে মেরে ফলবে। অনেক দিক থেকেই শত্রু হয়ে গেছে।’ কী নিয়ে শত্রুতা– এমন প্রশ্নে সুরাইয়া বলেন, ‘কী নিয়ে শত্রুতা, এসব কখনও বলেনি। শুধু বলত, কে কোনদিক থেকে মেরে ফেলবে, তোমরা বলতেও পারবা না। বাইরের কথা বাসায় সেভাবে আলোচনা করত না। সবসময় সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করত। খুব কমই একা চলাফেরা করত। বুধবার প্রথম হামলা হলো। এটাতেই সে শেষ হয়ে গেল।সুরাইয়া বেগম বলেন, কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সেটি নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না। সিসিটিভি ফুটেজ যেহেতু আছে, আশা করি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেগুলো দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।সুরাইয়া জানান, বুধবার বিকেল ৪টার দিকে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন মুছাব্বির। রাত ১১টার মধ্যে বাসায় চলে আসার কথা ছিল। প্রতিদিন এ সময় তিনি বাসায় ফিরতেন।
শতাধিক রাজনৈতিক মামলা
স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা উত্তরের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদকের নামে ১০০-এরও বেশি রাজনৈতিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার ও নেতাকর্মীরা। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেন। সর্বশেষ দেড় বছর কারাভোগ করে ২০২৪ সালের এপ্রিলে জামিনে মুক্তি পান।
মুছাব্বিরের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে। তবে পৈতৃক বাড়ি বসুন্ধরা সিটির পেছনে গার্ডেন রোডে। বাড়ি নম্বর ১৬/সি। তারা দুই ভাই ওই বাড়িতে পরিবার নিয়ে বাস করতেন। পুলিশের অভিযানে ২০২২ সালের দিকে তিনি পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে পরিবার নিয়ে কলাবাগানের কাঁঠালবাগান এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠেন। ২০২৩ সালের শুরুতে তিনি গ্রেপ্তার হন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে জামিনে মুক্তি পেয়ে পরিবারের কাছে যান। স্বজনরা জানিয়েছেন, ওই বাসার নিচতলায় স্থানীয় ছাত্রলীগের কার্যালয় থাকায় তিনি বাসাটি ছেড়ে দেন। দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠেন। মুছাব্বিরের দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে অনার্সের ছাত্রী ও ছোট মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ছেলে দশম শ্রেণির ছাত্র।
হত্যাকারীদের নির্দেশদাতা রয়েছে
তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈনু মারমা বলেন, সুরাইয়া বেগম বৃহস্পতিবার তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, কারওয়ান বাজারের বিপরীত পাশে স্টার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের দ্বিতীয় তলায় প্রায় প্রতিদিন দলীয় নেতাকর্মী এবং বন্ধুদের সঙ্গে বসে আড্ডা দেন মুছাব্বির। রাত ৮টা ১০ মিনিটে হোটেল থেকে বের হয়ে সুফিয়ান বেপারী ওরফে মাসুদকে সঙ্গে নিয়ে পাশের গলি দিয়ে যাচ্ছিলেন। আহ্ছানউল্লা ইনস্টিটিউটের সামনে পৌঁছামাত্র ওত পেতে থাকা চার-পাঁচজন মুছাব্বিরকে গুলি করে। পেটের ডান পাশ ও ডান হাতের কনুইয়ে গুলিবিদ্ধ হন মুছাব্বির। সঙ্গে থাকা মাসুদেরও পেটে গুলি লাগে। এই চার-পাঁচজন আসামি ও অজ্ঞাতনামা আসামিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশনায় মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা এবং মাসুদকে আহত করা হয়েছে।
লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পেটের ডান পাশে আধা ইঞ্চি পরিমাণ ছিদ্র। ডান হাতের কনুইয়ের পেছনে একটি ছিদ্র। বাঁ পায়ের হাঁটুতে ছিলা জখম।
ঘটনাস্থল ছিল অন্ধকার
কারওয়ান বাজারের বিপরীত পাশে স্টার হোটেলের পাশের (পশ্চিম তেজতুরী বাজার এলাকা) গলিতে আহ্ছানউল্লা ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন ট্রেনিং ভবনের সামনে কয়েকদিন ধরে অন্ধকার অবস্থা। সেখানেই মুছাব্বির ও মাসুদকে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। ওই গলি দিয়ে কিছুটা সামনে এগোলে তাঁর পৈতৃক বাড়ি।
ঘটনাস্থলের পাশের আহমেদ ম্যানশনের নিরাপত্তাকর্মী সাকিবুল ইসলাম বলেন,বুধবার রাতে আমি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ পরপর তিনটি শব্দ শুনি। এ সময় দেখি দুজন গলির ভেতর থেকে দৌড়ে কারওয়ান বাজারের দিকে পালাচ্ছে।
ঘটনাস্থলের পাশের চা দোকানি শাহ আলম বলেন, ঘটনার সময় আমার দোকানে অনেক মানুষ ছিল। শব্দ পাওয়ার পরই বেরিয়ে দেখি মুছাব্বির ও মাসুদ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এ ঘটনা: মির্জা ফখরুল
আজিজুর রহমান মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও শোক জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর মতে, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এসব দুষ্কৃতকারীকে কঠোর হস্তে দমনের বিকল্প নেই।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘দুষ্কৃতকারীরা আবার দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিসহ নৈরাজ্যের মাধ্যমে ফায়দা হাসিলে লিপ্ত। দুষ্কৃতকারীদের নির্মম ও পৈশাচিক হামলায় আজিজুর রহমান মুছাব্বির নিহতের ঘটনা সেই অপতৎপরতারই বহিঃপ্রকাশ। গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ দেশের মানুষের জানমাল রক্ষায় দল-মত নির্বিশেষে সব শ্রেণিপেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নইলে ওত পেতে থাকা আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের দোসররা মাথাচাড়া দিয়ে দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে মরিয়া হয়ে উঠবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, এ ধরনের সহিংসতা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়াচ্ছে। রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার যে কোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব নিহতের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
হুঁশিয়ারি স্বেচ্ছাসেবক দলের
মুছাব্বির হত্যায় জড়িতদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দল। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তাঁর জানাজার আগে স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইয়াসীন আলী ও সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন এ হুঁশিয়ারি দেন।
ফখরুল ইসলাম রবিন বলেন, মুছাব্বিরের হত্যাকারীদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করার দাবি জানাচ্ছি। এই দাবিতে শনিবার ঢাকা মহানগরসহ সারাদেশে মহানগর ও জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করছি। এর মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা না হলে স্বেচ্ছাসেবক দল কঠোর কর্মসূচি দেবে।
জানাজার আগে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, জড়িত যারাই হোক, অনতিবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।