রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে বিদেশ থেকে ঋণ নিচ্ছে সরকার
এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া :রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে জ্বালানি তেল আমদানিতে বিদেশ থেকে ঋণ নিচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও তেল আমদানিকারক দেশগুলো থেকে ঋণ নেওয়ার ব্যাপারে যোগাযোগ শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বেড়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি তেল আমদানিতে ওই বাড়তি ঋণ ব্যবহার করা হবে।গত জুলাইয়ের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। করোনার সময় গত বছরের এপ্রিলে ব্যারেল প্রতি দাম ২০ ডলারে নেমে আসে। এমন কি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কিনলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে ঋণ দেওয়া হতো। করোনার প্রভাব কমায় জুনের পর থেকে দাম বাড়তে শুরু করে। এখন দাম ৯০ ডলারের উপরে উঠেছে। আরও বাড়তে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।করোনার সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত থাকায় জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল একেবারেই কম। যে কারণে ওই সময়ে তেল আমদানিও হয়েছে কম। ফলে আইডিবির ঋণ ব্যবহার করেনি সরকার। আইডিবি জ্বালানি তেল আমদানি করতে প্রতিবছর গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার ঋণ দেয়। তেল বিক্রির টাকায় ঋণ শোধ করা হয়। জ্বালানি তেলের দাম এবং চাহিদা বাড়ায় আমদানিতেও খরচ বাড়ছে।২০১৯-২০ অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪৫৩ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৪৩০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরে এ খাতে আরও বেশি ব্যয় হবে। এ কারণে সরকার আগে থেকেই অর্থায়নের ব্যবস্থা করছে। এখন পর্যন্ত আইডিবি থেকে ১৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে। তেলের দাম ও চাহিদা বাড়ায় অতিরিক্ত আরও অর্থ লাগবে। সেজন্য আইডিবি থেকে বাড়তি ঋণ নেওয়ার জন্য আলোচনা শুরু করেছে।
এর বাইরে আরও ঋণ লাগলে তেল আমদানিকারক দেশগুলোর সরকার বা কোনো ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে আমদানি করা হবে। দেশের কোনো সরকারি ব্যাংক বা সরকারিভাবে গ্যারান্টি দেওয়া হবে।বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এখনই ঋণের ব্যবস্থা না করলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে আমদানির অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তখন রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। এমনিতেই করোনার পর আমদানি বাড়ায় ডলারের দাম বেড়েছে গড়ে ৮৫ পয়সা। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১৪৫ কোটি ডলার রিজার্ভ থেকে বাজারে ছাড়া হয়েছে।
আমদানি ব্যয় এক মাসে বেড়েছে ৭৩ শতাংশ। সামনে এ খাতে ব্যয় আরও বাড়তে পারে। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুবই সতর্ক। এদিকে আইডিবি থেকে সরকার এখন পর্যন্ত ঋণ নিয়েছে ২২৩১ কোটি ডলার। এর মধ্যে জ্বালানি তেল আমদানিতে বাণিজ্যিক ঋণ নিয়েছে ২১০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বড় অংশই পরিশোধ হয়ে গেছে।আইডিবির ঋণের চড়া সুদের হার নিয়ে বাংলাদেশ বরাবরই আপত্তি করে আসছে। আইডিবি ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয় লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেটের (লাইবর) সঙ্গে ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং কমিটমেন্ট ফি বাবদ দশমিক ২৫ শতাংশ যোগ করে। বর্তমানে লাইবর রেট শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ। আগে এই হার ছিল দেড় থেকে ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ফলে এখন গড়ে সুদের হার পড়বে ২ শতাংশ। এ কারণে আইডিবি থেকে ঋণ নিতে চাচ্ছে সরকার। আগে সুদের হার ছিল সাড়ে ৩ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ১ কোটি টনের উপরে জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। ফলে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো এখন সক্রিয় হবে। এতে জ্বালানি তেলের চাহিদা আরও বাড়বে।বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি বাদ দিলে দেশে তেলের চাহিদা প্রায় ৫৫ লাখ টন। এরমধ্যে শুধু ডিজেলের চাহিদা ৪৩ লাখের মতো। এছাড়া পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা রয়েছে ৭ লাখ টন আর জেট ফুয়েল ৫ লাখ টন।বিপিসি সূত্রে জানা গেছে এপ্রিলের আগ পর্যন্ত দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমানোয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকায় জ্বালানি তেলে বিপুল মুনাফা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তখন বছরে সরকারের মোট মুনাফা করেছিল ৭ হাজার কোটি টাকার উপর।
কয়েক বছর ধরে অকটেন ও পেট্রোল আমদানি করতে হয় না। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া ‘কনডেনসেট’ সরকারি-বেসরকারি শোধনাগারে (রিফাইনারি) পরিশোধন ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে অকটেন ও পেট্রোল তৈরি করা হচ্ছে। দেশের জ্বালানি সম্পদ ব্যবহার করেই অকটেন ও পেট্রোল তৈরি করায় এ খাতে সরকারের মুনাফা হচ্ছে অনেক বেশি। সরকারি-বেসরকারি সূত্রগুলোর হিসাব থেকে দেখা যায়, বছরে ৭ লাখ টন অকটেন-পেট্রোল বিক্রি করে সরকার ট্যাক্স-ভ্যাট নেওয়া ছাড়া মুনাফা করছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। ফলে ঋণ নিলেও তা শোধ করতে তেমন বেগ পেতে হবে না।