ধীরে চলছে উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আনার কার্যক্রম
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:ধীরে চলছে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আনার কার্যক্রম।গত দুই অর্থবছরে বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা (৪৫ হাজার ৯৬৬ কোটি)।এসব প্রতিষ্ঠানের তহবিলে মোট অলস টাকার পরিমাণ ২ লাখ ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ফলে এখনো বিপুল অঙ্কের অর্থ এসব প্রতিষ্ঠানের তহবিলে অলস পড়ে আছে। অভিযোগ আছে এই টাকা ব্যাংকে রেখে বড় অঙ্কের সুদ নেওয়া হচ্ছে।এ ধরনের সুদ আয় হিসাবে দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতা দেওয়ার মতো ঘটনা ইতঃপূর্বে ঘটেছে। সম্পূর্ণ অর্থ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা অনেকটা নিশ্চিত হবে বলে মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে।জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনতে পারলে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করা যাবে। তবে এরই মধ্যে অনেক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চলছে। উদ্বৃত্ত অর্থ উদ্ধার না করা হলে এক সময় এসব অর্থ অনুদান ও ভর্তুকি হিসাবে চলে যাবে। তিনি আরও বলেন, এ টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে পড়ে আছে। এটি পুরোপুরি উদ্ধার হলে ব্যাংকের আর্থিক খাতে কোনো চাপ সৃষ্টি হবে না। কারণ ব্যাংকগুলোতে ঋণের চাহিদা কম।সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ শনিবার বলেন,রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে উদ্বৃত্ত অর্থ দীর্ঘদিন ধরে পড়েছিল।অনেক টাকা স্বাধীনতার আগে থেকে জমা পড়ে আছে।এসব অর্থ ব্যয় করা হতো না সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।এ টাকা দিয়ে নতুন কোনো প্রকল্পও নেওয়া হতো না।এখন আইন করে টাকা উদ্ধার করা হচ্ছে। এ টাকায় ঘাটতি বাজেট পূরণে সহায়তা করবে। এমনিতে চলতি বাজেটে ঘাটতি আছে।
স্বায়ত্তশাসিতসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কাজে লাগাতে একটি আইন করছে সরকার। এটি হচ্ছে ‘স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান আইন। এটি ২০২০ সালে বিল আকারে জাতীয় সংসদে পাশ হয়। এই আইনের আওতায় সংস্থাগুলো তাদের নিজস্ব পরিচালনা, স্বঅর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বছরে যে অর্থ লাগে, তা তাদের তহবিলে জমা রাখতে পারবে। এছাড়া আপৎকালীন ব্যয় নির্বাহের জন্য পরিচালন ব্যয়ের আরও ২৫ শতাংশ অর্থ সংস্থাগুলো সংরক্ষণ করতে পারবে। ওই সংস্থার কর্মীদের পেনশন বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থও তারা সংরক্ষণ করবে। এরপর যে টাকা থাকবে, তা সরকারের কোষাগারে জমা দেবে। পরিচালন ব্যয় হিসাবে কোন সংস্থা কত টাকা রাখবে, তা তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে। আইনটি পাশ হওয়ার পর ৬১টি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করার নির্দেশ দেওয়া হয় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে।অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশন, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা থেকে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরে উদ্ধার করা হয় ৩০ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। এরমধ্যে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো থেকে পাওয়া গেছে ১৬ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। বাকি অর্থ পাওয়া গেছে যথাক্রমে-বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তহবিল থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা, পেট্রোবাংলা থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি থেকে পাওয়া গেছে ১৮৭০ কোটি ৭১ লাখ টাকা, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) থেকে ২ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) থেকে উদ্ধার হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের তহবিল থেকে পাওয়া গেছে ৬০০ কোটি টাকা। অর্থ উদ্ধারের তালিকায় আছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। সেতু কর্তৃপক্ষ থেকে প্রাপ্য অর্থের পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকা এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন থেকে ৫০ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়।অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, অনেক প্রতিষ্ঠানের টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসাবে আছে। এ টাকাগুলো ভালো কোনো কাজে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এজন্য সরকারের পলিসি হলো, নতুন আইনের মাধ্যমে কিছু প্রভিশন রেখে বাকি টাকাটা সরকারি কোষাগারে নিয়ে আসা। সরকারের অনেক প্রকল্প আছে, জনকল্যাণমূলক কাজ, যেগুলো আর্থিক সংকটের কারণে করা যাচ্ছে না। সেখানে এ অর্থ ব্যয় করা হবে।