চালের বাজারে আগুন ! জনমনে ক্ষোভ জরিমানা করেও ঠেকাতে পারছেনা প্রশাসন
রেদওয়ান শাওন:বরিশালে করোনা ভাইরাস ঠেকাতে যখন বন্ধ করা হচ্ছে একের পর এক প্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থল, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হঠাৎ করেই বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে চাউলের পাইকারি ও খুচরা বাজারে। দুই-তিন দিনের ব্যবধানে বস্তা প্রতি সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে বরিশালের পূর্বাঞ্চলের বাজারগুলোতে। ব্যাবসায়ী সমিতির কর্তৃপক্ষের দাবি, করোনা ভাইরাসের জন্য চাউলের দাম বাড়েনি, ধানের সংকটে কল মালিকরাই চাউলের দাম বাড়িয়েছে। সরেজমিনে বরিশাল পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন বাজার ঘুরে চাউলের দাম বাড়ার সত্যতা মিলেছে। পাইকারি বাজারে চাউলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে সদর উপজেলার চরকাউয়া, দিনারের পুল, দুর্গাপুর, সাহেবেরহাট, বিশ্বাসের হাট, চরমোনাই, বুখাইনগর, লাহারহাট, মৌলভীরহাট, তালুকদারহাট, চন্দ্রমোহন, টুমচরসহ সব খুচরা বাজারে। খুচরা বাজারে বস্তা প্রতি ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত শনিবার (১৪ মার্চ) যে চিনিগুড়া চালের দাম ছিল ৪৪০০ টাকা এখন সেটা ৫০০ টাকা বেড়ে ৪৯০০ টাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। মঙ্গলবার মিনিকেট চাউলের বাজারদর ছিল ১৩০০ টাকা, এখন সেটি বেড়ে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাটারিভোগের দাম ছিল ২৭০০ টাকা, বর্তমানে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৫০ টাকায়। সিদ্ধ পাইজারের দাম ছিল ১৬০০ টাকা, এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯০০ টাকা। বেতি চাল দাম ১৭০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮৫০ টাকা। কাটারিসিদ্ধের দাম ২৫৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৬২০ টাকা। ক্রেতারা অভিযোগ করে বলেন, অতিরিক্ত মুনাফার জন্য বাজারে করোনার গুজব ছড়িয়ে চাউলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে ব্যবসায়ীরা। হঠাৎ চাউলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন, আমরাও আজব দেশে বাস করি। কোনো কিছু হলেই গুজব ছড়িয়ে নিত্যপণ্যে কৃত্রিম সংকট করে দেশের মানুষকে জিম্মি করা হয়। অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে চাউলের এত দাম বৃদ্ধি ভাবা যায়না। সামনের দিনে কেমন হবে সেটাই চিন্তার বিষয়। এদিকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়বে ভেবে আগে-ভাগে অনেকে কেনাকাটার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছেন। সাহেবেরহাট এলাকার মুদি দোকানদার মাহমুদ হাওলাদার বলেন, করোনা ভাইরাসের অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিয়ে পাবলিকের সাথে প্রতারনা করছে। বিশেষ করে চাউলের দাম এমনিতেই বাড়তে শুরু করেছে। এজন্য বেশি বেশি করে চাউল ক্রয় করে ঘরে জমা করে রাখছে সবাই। কাস্টোমার’রা অনেক দোকানে গিয়ে চাইছে আমি তো বারন করতে পারি না। বাধ্য হয়ে কাস্টোমারে’র চাহিদা পূরণ করতে চুপ থাকতে হচ্ছে। এমন মজুদ আর কৃত্রিম সংকট আরো কয়েকদিন চলতে থাকলে দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষগুলোর অবস্থা খুব করুণ হবে। দুর্গাপুর বাজারের এক চাউল বিক্রেতা নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়ে সময়ের বার্তা প্রতিবেদককে বলেন, করোনার জন্য স্কুল, কলেজ ও জনসমাগম বন্ধের পর থেকে অন্যান্য নিত্যপণ্যের চেয়ে চাউলের দাম তুলনামূলকভাবে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে এমনকি খুচরা চাউলের দাম কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। নতুন চাউল বাজারে না আসা পর্যন্ত প্রতিদিন বস্তা প্রতি ৫০-১০০ টাকা বৃদ্ধি পেতে পারে। একজন স্কুল মাষ্টার বলেন, মনে হচ্ছে হঠাৎ করে কল মালিকরা চাউলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকার কৃষক থেকে ধান কিনে গুদামজাত করার কারণে বাজারে ধানের সংকট দেখা দিয়েছে। যার জন্য চাউলের দামটা হয়তো বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতি বছর ইন্ডিয়া থেকে চাউল আমদানি করা হয়। কিন্তু এ বছর কৃষকদের সুবিধার জন্য ভারত থেকে চাউল আমদানি করা হয়নি। যার প্রভাব এখন বাজারে পড়ছে। করোনার জন্য চাউলের দাম বেড়েছে আমি মনে করি এটা সঠিক নয়। একজন আড়ৎদার বলেন, অযথাই সাহেবেরহাটসহ সব বাজারে চাউলের দাম বাড়িয়েছে ব্যাবসায়ী’রা। এমনকি কল মালিকরাও করোনা ভাইরাসকে হাতে রেখে হঠাৎ করে চাউলের দাম বাড়িয়েছে। সমাজের সচেতন ব্যক্তিরা বলেন, যেসব পাইকার বা দোকানদার অতিরিক্ত দামে চাউল বিক্রি করবে তাৎক্ষনিক তাদের রশিদ দেখতে চাইবেন না হলে থানা অথবা জেলা প্রশাসক মহাদ্বয়কে ফোন করে বলবেন। পূর্বাঞ্চলের ব্যাবসায়ী’রা আগের গুদামজাত করা চাউল হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়াই দাম বৃদ্ধি করেছে। সবার নীতি-নৈতিকতা খারাপ হয়ে গেছে যার জন্য এমন করছে। এদিকে সাধারন ক্রেতারা এসব সিন্ডিকেট বন্ধ করতে বরিশাল জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের বাজার মনিটরিং করার সহযোগীতা চান। অনেকে বলেন, এসব দুর্নীতিবাজদের প্রতিদিন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে জরিমানা করা প্রয়োজন তাহলেই জনমনে সস্তি ফিরে আসবে। এ বিষয়ে বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ মোশারফ হোসেন বলেন, কিছু অসাধু ব্যাবসায়ী নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের দাম বাড়িয়েছে যা আমাদের নজরে এসেছে। গত ২০ তারিখ শুক্রুবার সাহেবেরহাটে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করেছি। আমরা বরিশাল জেলা প্রশাসক মোঃ অজিউর রহমান স্যারের নেতৃত্বে আমাদের ভ্রাম্যমান আদালত (মোবাইল কোর্ট) অব্যাহত আছে এবং থাকবে। বাজার মূল্য সিথীলযোগ্য করতে বাজারগুলোতে প্রয়োজনে আবারও মোবাইল কোর্ট করা হবে। তাহলে হয়তো অসাধু ব্যাবসায়ীদের সিন্ডিকেট কিছুটা নিয়ন্ত্রনে আসবে।