আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানমুখী উদ্যোগ এবং অব্যাহত অভিযান সত্তে¡ও বরিশালে মাদক বিস্তার রোধে যেন পেরে উঠছে না।
রফিকুল ইসলাম:আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানমুখী উদ্যোগ এবং অব্যাহত অভিযান সত্তে¡ও বরিশালে মাদক বিস্তার রোধে যেন পেরে উঠছে না। প্রায় প্রতিদিনই র্যাব অথবা পুলিশের সাথে মাদকের চালানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হলেও তারা আরও অপ্রতিরোধ্য হয়েছে। কথা উঠেছে- মাদকের এই স্রোত কোথা থেকে উপত্তি এবং কাদের সহায়তায় বরিশালে পৌছাচ্ছে। এনিয়ে পুলিশ প্রশাসনও ভাবনায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এখন মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি শেল্টারদাতাদের চিহ্নিত করতে নতুন ছকে অগ্রসর হয়েছে তথ্য পাওয়া গেছে। দৃশ্যমান প্রেক্ষাপট বলছে- এলাকাভিত্তিক ক্ষমতাসী দলীয় শীর্ষ নেতারা মাদক বিক্রেতাকে সহায়তা দেওয়ায় পুলিশের অভিযানকে আমলে আনতে চাইছে না। অবশ্য গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তির বিষয়ে ক্ষমতাসীন মহল থেকে কোন সুপারিশ না থানায় পুলিশও বুঝে উঠতে পারছে না মাদক ব্যবসায়ীদের আগলে রাখার এই কৌশলের পেছনের রহস্য কী?
অনুসন্ধ্যানে নিশ্চিত হওয়া গেছে- সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়বাত সাদিক আব্দুল্লাহ মাদকের বিষয়ে কোন ছাড় নেই মন্তব্য করায় স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা মাদক নিয়ে পুলিশের কাছে সুপারিশ রাখতে চাইছে না।আবার সুপারিশ রাখলেও সতর্কতা বা গেপনীয়তা অবলম্বনে পুলিশের সাথ্যে সখ্যতার বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- এত মাদক বরিশালে হঠাৎ আসার কারণ বা উদ্দেশ কী? বর্তমানে দেশব্যাপি মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের জিহাদ চলমান থাকার মাঝে বরিশালের এই চিত্র মানুষকে স্তমিত করেছে। হচ্ছে বিস্মিত। গত এক সপ্তাহের চিত্রপট বলে দেয় এই নগরীতে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের নমুনা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী- ডিবি পুলিশ ও র্যাব এই সময়কালে দুটি বড় ধরনের চালান আটক করতে হয়েছে। ছোট ছোট চালান আটকতো রয়েছেই। ডিবি পুলিশও বিস্মিত হয়েছে গত তিনদিনের পৃথক অভিযানে অন্তত ১০ কেজি গাঁজা ও সহস্রধিক পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে। রাতের অভিযানের সফলতার শেষে ভোরের অভিযানে একই রুপ এই বিস্ময়ের কারণ। এর আগে র্যাবের একটি টিম গাঁজার একটি বড় ধরনের বাকেরগঞ্জ উপজেলা পল্লী থেকে উদ্ধার করে। সুতরাং শুধু শহর নয়, গোটা জেলাসমূহে মাদকে সয়লাব হয়ে গেছে। তথ্য বিশ্লেষণে বলা যায়- মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পূর্বের চিত্র এতটা ভয়াবহ দেখা যায়নি। ১৩ মার্চ বাকেরগঞ্জের মহেশপুরে র্যাব অভিযান চালিয়ে গাঁজার যে চালানটি খুঁজে পায় তার সাথে সংশ্লিষ্ট একজন বৃদ্ধ। বিষয়টি সেখানেই উদ্বেগের, কারণ মাদক বিক্রয় এখন যুবক শ্রেণি কিছুটা নিরব বা দূরত্ব বজায় রেখে কৌশলগত কারণে প্রবীণ ব্যক্তিদের ব্যবহার করছে। এক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যাই বেশি। একজন পুলিশ কর্মকর্তার অভিমত প্রতিদিনই ছোট-বড় মাদকের এত চালান আটক করা হচ্ছে যার পরিসংখ্যান একত্রিত করাও দুরুহ বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। অন্যান্য সামাজিক অপরাধ দমন বা মামলার তদন্তে মাঠের পুলিশ কর্মকর্তারা সময় দিতে পারছেন না মাদকের পিছনে ছুটতে গিয়ে। সংখ্যাগত দিক থেকে পুলিশ সাফল্যও পাচ্ছে বেশি। অবশ্য বরিশাল মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। এখানে তিনটি উদাহরণ উল্লেখ করলে তা অনুমান করা যায়। ১৩ মার্চ র্যাব যখন বাকেগঞ্জের সাফল্যের চিত্র মিডিয়ায় প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অবগত করে ঠিক তৎসময়ে ডিবি পুলিশ শহরের রুপাতলী এলাকার আদর্শ সড়ক ও লালাদিঘির পাড় থেকে ২ কেজি গাঁজাসহ সাত ব্যক্তিকে এর সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটক করে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই দিন রাতে বাবুগঞ্জ উপজেলায় ঘটে আরেক চমক। এবার শুকনো গাঁজা নয়, অন্তত ১২টি জীবন্ত গাঁজাগাছসহ দুই জনকে আটক করে স্থানীয় থানা পুলিশ। গাঁজার পালা শেষ না হতেই আসে ইয়াবা উদ্ধারের আরও একটি খবর। দুদিনের ব্যবধানে ১৫ মার্চ রুপাতলী হাউজিং এলাকার একটি বহুতল ভবনের কক্ষ থেকে ৫০৪ পিস ইয়াবার একটি চালানসহ দুইজনকে ডিবি পুলিশ আটক করে। আবার রাত পোহানোর পরদিন অর্থাৎ ১৬ মার্চ আসে আবার ইয়াবা উদ্ধারের আরও একটি খবর। নগরীর বটতলা এলাকার ম্যাজিক স্ট্যান্ড থেকে দুই যুবকের কাছ থেকে ৭০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে গাঁজার একটি চালান উদঘাটন করে। আটক সোহেল (২৭) ও মিরাজ ওরফে মিলন (২৬) নামের যুবকদ্বয়ের তথ্য অনুযায়ী অক্সফোর্ড মিশন রোডের একটি বাসা থেকে দুই কেজি গাঁজার প্যাকেট সাথে আরও ৫২ পিস ইয়াবা খুঁজে পায়।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সকালে ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা। পুলিশের দাবি- ডিবি পুলিশের এসআই মহিউদ্দিন মাহির সাথে মাদক বিক্রির চুত্তিতে আবদ্ধ হতে আলেকান্দার রফিক ও আরমান নামক দুই যুবক তার বাসায় উপস্থিত হয়। দূরদর্শী এই পুলিশ কর্মকর্তা তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদে কৌশলে বেড়িয়ে আসে গাঁজা রাখার আস্তানার খবর। পরে তাদের নিয়ে অভিযানে নামনে নির্দিষ্ট স্থান থেকে দুই কেজি গাঁজাসহ আরও ৫ মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করতে সক্ষম হন। তবে উল্লেখ্য যে মাদক উদ্ধারে ডিবি পুলিশের মধ্যে এসআই দেলোয়ার হোসেন ও মহিউদ্দিন ধারাবাহিক সাফল্য পাওয়ায় মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে উভয়ে মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছেন। যে কারণে তাদের ম্যানেজ করতে কৌশল বা বিভিন্ন মাধ্যমের দ্বারস্থ হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যায়। মহিউদ্দিনের বাসায় দুই মাদক ব্যবসায়ীর উপস্থিতি তারই প্রমাণ।
একাধিক সূত্র জানায়- মাদকের এই বিস্তারের পেছনে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা শুধু সহায়তা দেয় না, উপরন্ত কেউ কেউ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে এমন অভিযোগ রয়েছে। সেই অভিযোগের প্রমাণও পেয়েছে পুলিশ। অতিসম্প্রতি শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ শেবাচিম) হাসপাতালের পেছনের একটি দোকানঘর থেকে ৩২ পিস ইয়াবাসহ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা জগলুল মোর্দেশ প্রিন্সসহ তার দুই সহযোগী একত্রে আটক করে। পরে সংগঠন থেকে এই নেতাকে বহিস্কার করে মিডিয়ায় প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করে আ’লীগের দপ্তর সম্পাদক।পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়-মাদকের চালান আটকের পর সুপারিশ আসে বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু আ’লীগের দায়িত্বশীল কোন নেতা এক্ষেত্রে সরাসরি সুপারিশ থেকে দূরে থাকেন তা তারা অনুমান করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে- পুলিশের অভিযান জোরদার হওয়ায় মাদক ব্যবসায়ীরা স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে। এই বিষয়টি আ’লীগের শীর্ষমহল অবগত কী না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে নানা মহলের।
বর্তমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ মাদকের বিষয়ে না সূচক মঞ্চে অবস্থান নিলেও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে তার কাছে বহু অভিযোগ রয়েছে বলে ঘনিষ্ট একটি সূত্রের দাবি। কী কারণে তিনি এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছেন না আবার কেউ আটক হলে সুপারিশ না রাখায় এক ধরনের রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। কারও দাবি- তিনি কৌশলী পথে হাটছেন এভাবেই যে সাংগঠনিক ভাবে ব্যবস্থায় নিলে আলোচনা বা বিতর্ক সৃষ্টির বদলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে তিনি দমন প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। পুলিশ এই মাদকের বিরুদ্ধে দিনরাত অভিযানে এখন এতটাই সময় হচ্ছে যে হিমশিম খেতে হচ্ছে।ডিবি পুলিশের সহকারি কশিনার নরেশ চন্দ্রের মভিমত পরিস্থিতির আলোকে ধারণা করা হচ্ছে- এখন আগের চেয়ে এখন মাদকের বিস্তার বেশি। আসলে বিষয়টি তেমন নয়, অভিযান জোরদার হওয়ায় আটক এবং উদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাদক নিয়ে হৈ-চৈইয়ে এমনটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরুপ ধারণা তৈরি হয়েছে।এদিকে দায়িত্বশীল একজন পুলিশ কর্মকর্তার অভিমত তারা আটক করছেন বটে, কিন্তু আইনের আওতায় কারাগারে আটকে রাখতে পারছেন না। আইনের ফাঁক-ফোকড় দিয়ে জামিন পাওয়ায় আদালতের প্রতি পুলিশের ক্ষোভ দিনোত্তর বাড়ছে। এতে অভিযানের ত্যাজ হ্রাস বা অনিহা সৃষ্টির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। সুশীল সমাজের অভিমত এমনটি ঘটলে মাদকের ভয়ানক থাবায় নীল রঙ ধারণ করতে পারে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যময় জেলা শহর বরিশাল।