দেশের সর্বত্রই বিরাজ করছে অস্থিরতা,ভেঙে পড়েছে পুলিশের চেইন অব কমান্ড
রিপোর্ট আলোকিত বার্তা:দেশের সর্বত্রই বিরাজ করছে অস্থিরতা। চরম অবনতি ঘটছে আইনশৃঙ্খলার। অস্বস্তিতে রয়েছে সাধারণ মানুষ। প্রতিদিনই খুনের ঘটনা ঘটছে কোথাও না কোথাও।খোদ রাজধানীতেই কয়েক দিন ধরে অব্যাহতভাবে বাসে আগুন আর ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে দলটির সমর্থকরা। চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা। মব সন্ত্রাস বন্ধ হচ্ছে না কিছুতেই। অথচ পুলিশসহ এতগুলো গোয়েন্দা সংস্থার কাছে নেই আগাম তথ্য।গত শনিবার কুমিল্লায় কিশোর শিক্ষার্থী অপ্রতিমের হৃদয়বিদারক হত্যাকা- সকলের বিবেক নাড়া দিয়েছে। খোদ রাজধানীতে একের পর এক ঝটিকা মিছিল করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন ও ঝটিকা মিছিলসহ অনলাইন-অফলাইন রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতায় পুলিশ বাহিনীর ঢিলেমি বা গাফিলতিতে বাহিনীটির কর্মকা-ের ওপর প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করছে সাধারণ মানুষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুলিশের মধ্যে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। আর এ জন্যই আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ বদলি বাণিজ্য। সম্প্রতি আইজিপির একজন বডিগার্ডের অডিও রেকর্ড ফাঁসের পর পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে চলতে থাকা গোপন ‘বদলি বাণিজ্য’ ও সিন্ডিকেটের চিত্র জনসমক্ষে চলে আসে। অডিওতে স্পষ্ট ভাষায় উঠে এসেছে যে, পুলিশ বাহিনীর কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদের সদস্যদের পছন্দমতো লাভজনক বা গুরুত্বপূর্ণ জেলায় বদলি করাতে গেলে একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা লেনদেন করতে হয়। এর আগে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার ওসি মো. আবুল হাশেমের বক্তব্যে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও রেকর্ডে তার বক্তব্য ছিলÑ ‘পুলিশের চাকরি ওয়ান কাইন্ড অব বিজনেস’। আমরা কেউ কাউকে ঠকাব না। সবাই মিলেমিশে থাকব। এর পর তাকে বদলি করা করা হয়।
একজন অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, ঘুষের বিনিময়ে পদ দখল করায় কর্মকর্তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিয়োগ করা টাকা তোলা। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা তাদের কাছে মুখ্য নয়। পুলিশের মতো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর অভ্যন্তরে এভাবে ক্ষোভ, অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং পদায়ন নিয়ে বিশৃঙ্খলা চলতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাক্সিক্ষত উন্নয়ন কখনো সম্ভব হবে না। শীর্ষ কর্মকর্তাদের অর্থলিপ্সা ও অদূরদর্শিতার কারণে মাঠপর্যায়ে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দিনশেষে কিন্তু সরকারকেই খেসারত দিতে হবে।
এদিকে পুলিশে বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরে নানা অসন্তোষ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিগত সরকারের আমলের রাজনৈতিক প্রভাব, পদায়ন ও পদোন্নতিতে বৈষম্য এবং পরবর্তী সময়েও তদবির বাণিজ্য ও বিতর্কিতদের পোস্টিংয়ের কারণে মাঠপর্যায়ে এই ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আবার আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেককে পদোন্নতিসহ ভালো এলাকায় বদলি করা হয় রহস্যজনক কারণে। পুলিশ ও র্যাবকে পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ না করে পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছে শুধু।২০২৬ সালের পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বর্তমান সরকার পুলিশ বাহিনীতে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবে না জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো সদস্য শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার।
এদিকে ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল হাসানের কথোপকথনের অডিও ক্লিপ প্রকাশের পর তাকে দাফতরিকভাবে ডিএমপির সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। তবে এরপরই তাকে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়। যদিও গত দুই দিন ধরে তার সম্পর্কে কোনো তথ্যই প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে একটি সূত্রের দাবি, রাকিবুল হাসানকে মিন্টু রোডের সিটিটিসি হেফাজতে রাখা হয়েছে। সেখানে রেখেই তদন্ত কমিটি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ওই সূত্রের দাবি, তদন্ত কমিটির কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে সাবেক ওসি রাকিবুল হাসান। এর আগে ইবি থানায় ওসি থাকাকালে রাকিবুলকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দলীয় অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাকে আতশবাজি ফোটানো ও কেক কাটতেও দেখা যায়। জিজ্ঞাসাবাদে রাকিবুল জানিয়েছে, পলাতক এডিশনাল আইজিপি মনিরুল ইসলাম, ডিবির হারুন ও ফ্যসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ অপর দুই পুলিশ কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার ও ডিআইজি হাবিবুর রহমানের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে তার যোগাযোগ হতো। রাকিবুলের তথ্যমতে, শুধু তিনিই নন, আরো দুই শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সাথে পলাতক ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে তাদের যোগাযোগ হতো। ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ ছিল দেশে নাশকতা ও বিএনপি সরকার উৎখাত করা। যে কারণে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ কৌশলে এড়িয়ে চলতেন। বিপরীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ঝটিকা মিছিল করার মতো সুযোগ পেত। রাকিবুল হাসানের অডিও প্রকাশের পর আওয়ামী লীগ শাসনামলে সুবিধা পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এছাড়া বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত ও পদায়ন পাওয়া পুলিশ সদস্যদের একটি অংশ নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। অনেকের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের কাছে অভিযানের আগাম তথ্য পাচার এবং তাদের সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ সদর দফতরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী যেকোনো বাহিনীর প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো চেইন অব কমান্ড বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ মান্য করা। আপাতদৃষ্টিতে সেই নির্দেশ বা নির্দেশনা খারাপ মনে হলেও সেটি পালন করা অধস্তনদের অবশ্য কর্তব্য। ঢাকায় পুলিশের অধস্তন পর্যায়ের সদস্যদের বড় অংশই শেখ হাসিনা সরকারের সময়ের। তাই তারা কথা শুনতে চায় না। অনেকে আবার ঢাকায় নতুন আসায় বিষয়গুলো বুঝে উঠতে পারে না। সব মিলিয়ে আমরা খুবই বিপাকে আছি।
বর্তমানে চাকরিতে কর্মরত শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সাথে পলাতক মনির-হারুন, বিপ্লব ও হাবিবদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। শুধু মনিরদের সঙ্গেই নয়, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের পলাতক নেতাদের সঙ্গেও তাদের নিয়মিত গোপন যোগাযোগ হয়। সাধারণ মানুষের মতে, পুলিশ বাহিনীর শৃঙ্খলা ফেরাতে বাহিনীটির ভেতরেই অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে। যদিও সূত্র দাবি করছে, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। এসব সন্দেহজনক কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করে তাদের গতিবিধি ও কর্মকা- পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জমা একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যরা ঘাপটি মেরে আছেন। বিশেষ করে পলাতক আওয়ামী লীগের নেতা এবং পুলিশ সদস্যদের কাছে তথ্য পাচার ও গোপন যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। বর্তমান সরকার ও পুলিশ বাহিনীকে দুর্বল করা ও বেকায়দায় ফেলতে তৎপর তারা। বাহিনীর অনেক কর্মকর্তার মতে, আওয়ামী ভূত এখনো যায়নি। ফ্যাসিস্ট হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে নিয়োগ পাওয়া আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠন-সহযোগী সংগঠনের সদস্যদের সংখ্যাই বেশি। মূলত তারাই পুলিশ বাহিনীকে শৃঙ্খল হতে দিচ্ছে না। আগামী ডিসেম্বরে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন, এমন বিশ্বাসও অনেকের মধ্যে রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতরের একাধিক সূত্র জানায়, বাহিনীতে যারা অপকর্মে জড়িত, তাদের তালিকা করে গোপন তদন্ত চলমান রয়েছে। ওসি থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি তালিকা করা হয়েছে, এতে কয়েকশ’ সদস্যের নাম রয়েছে, তালিকায় নতুন নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে।চব্বিশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পুলিশে আসে ব্যাপক রদবদল। আন্দোলনকালে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণের অভিযোগে সে সময় আইজিপিসহ বাহিনীটির অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সদস্য গ্রেফতার হয়েছেন। অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আবার কেউ দেশের ভেতরেই আছেন আত্মগোপনে। আবার শতাধিক কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসরে। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান সরকার ক্ষমতায় আসায় পুলিশের শীর্ষপদসহ ব্যাপক রদবদল হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ। যদি বাহিনীর সদস্যদের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায় এবং পুলিশ যদি সত্যিই স্বাধীনভাবে এবং একই সঙ্গে চেইন অব কমান্ড মেনে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে দেশ থেকে অপরাধ নির্মূল করা সময়ের ব্যাপার। আর পুলিশকে পুরোদমে সক্রিয় করা না গেলে সামনে আরো খারাপ পরিস্থিতি দেখতে হতে পারে।