দেশ লোডশেডিংয়ে
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন :দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্য লোডশেডিং হয়েছে। সন্ধ্যার পিক আওয়ারে (রাত ৯টা) দেশের ৯টি জোনে মোট লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৭ মেগাওয়াট। এ সময়ে এসব জোনে মোট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ১০৮ মেগাওয়াট।বুধবার (১২ আগস্ট) রাতে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।জোনভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাহিদার তুলনায় সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছে ময়মনসিংহ জোনে।এ জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৬০৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে লোডশেডিং করা হয়েছে ৪৯০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ময়মনসিংহের মোট চাহিদার প্রায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহের বাইরে ছিল।
দেশের গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের পর এবার রাজধানী ঢাকাতেও এর প্রভাব পড়েছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করেছেন। বিশেষ করে রাতের দিকে একাধিক এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর পাওয়া গেছে।
সামগ্রিকভাবে সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। সেই হিসাবে রাতেও ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ লোডশেডিং দিতে হয়েছে।এতদিন গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি থাকলেও এবার রাজধানীতেও এর বিস্তৃতি নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তীব্র গরমের মধ্যে ঢাকায়ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে দুর্ভোগ বেড়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) দিবাগত রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজ কয়েকবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছে।কোথাও একটানা এক ঘণ্টা, আবার কোনো কোনো এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে তীব্র গরমের মধ্যে চরম ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী।বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে ফ্যান ও এসি বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে মধ্যরাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঘুমাতে পারেননি অনেকেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ জানিয়েছেন।
নুরুল আলম নয়ন নামের একজন লিখেছেন, ‘রাত ৩টা বাজে, সারাদিনের ক্লান্ত শরীরগুলো ঘুমাচ্ছে, বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিসে। গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে পাঙ্খা দিয়া বাতাস করতাছি আর ভাবতাছি এ কোন পাপের ফল? এ কোন সোনার বাংলায় জন্ম নিলাম যেখানে নাগরিক ঘুমাইয়াও শান্তি পায় না।রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা হাসিবুর ইসলাম বলেন, ‘রাত দেড়টার দিকে বিদ্যুৎ চলে গেছে। ১ ঘণ্টার বেশি সময় পর এসেছে। গরমে রুমে থাকা কষ্টকর হয়ে গেছে।
এদিকে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, ১২ আগস্ট রাত ৯টায় (সন্ধ্যা পিক) বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৬ হাজার ৯৩ মেগাওয়াট। আর দুপুর ১২টায় (ডে পিক) বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৬৩৫ মেগাওয়াট।তবে ডে পিকে আদানি থেকে ৯৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এলেও সন্ধ্যা পিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৩০ মেগাওয়াটে।
চাহিদার তুলনায় লোডশেডিংয়ের হারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল জোন। ৫৭৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সেখানে লোডশেডিং হয়েছে ১৫২ মেগাওয়াট, যা মোট চাহিদার প্রায় ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ। রংপুরে ১ হাজার ২৭২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৯৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ। সিলেটে ৮২৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১৯১ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে, যা প্রায় ২৩ দশমিক ২ শতাংশ।
এছাড়া কুমিল্লা জোনে ১ হাজার ৭৪৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩৬৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। চাহিদার হিসাবে এটি প্রায় ২১ দশমিক ১ শতাংশ। রাজশাহীতে ১ হাজার ৮৮৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩৬১ মেগাওয়াট, অর্থাৎ প্রায় ১৯ দশমিক ১ শতাংশ লোডশেডিং হয়েছে। খুলনায় ২ হাজার ৯৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং হয়েছে ৩৫৬ মেগাওয়াট, যা প্রায় ১৭ শতাংশ।
চট্টগ্রাম জোনে চাহিদা ছিল ১ হাজার ৬৭০ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং ২০৮ মেগাওয়াট- চাহিদার প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে কম অনুপাতে লোডশেডিং হয়েছে ঢাকা জোনে। সেখানে ৬ হাজার ৪৩২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং হয়েছে ৫৮৫ মেগাওয়াট, অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৯ দশমিক ১ শতাংশ।
তবে মোট লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বিবেচনায় চিত্রটি ভিন্ন। ৫৮৫ মেগাওয়াট নিয়ে ঢাকা জোনেই সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে। এরপর ময়মনসিংহে ৪৯০ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ৩৬৮ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ৩৬১ মেগাওয়াট, খুলনায় ৩৫৬ মেগাওয়াট এবং রংপুরে ২৯৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।
অর্থাৎ, বিদ্যুতের মোট ঘাটতির পরিমাণে ঢাকা এগিয়ে থাকলেও নিজ নিজ জোনের চাহিদার তুলনায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহে। সামগ্রিকভাবে ১৮ হাজার ১০৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩ হাজার ৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে, যা মোট চাহিদার প্রায় ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ।