৩৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে - Alokitobarta
আজ : বৃহস্পতিবার, ৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
বিটিএমএ’র কমিটি গঠন : সভাপতি হুমায়ুন, সম্পাদক শাহিন হাসিনাকে নিয়ে বেকায়দায় ভারত সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়ায় হঠাৎ প্রধানমন্ত্রী হেবা দলিলে কর নেই ,এনবিআরের স্পষ্টীকরণ ৩৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে দুদকের নেতৃত্ব দুই দশক ধরে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির কাছে কুক্ষিগত ছয় বিভাগে সতর্কবার্তা, ১২ জেলায় বন্যার আভাস,বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত পার্বত্য অঞ্চল জ্ঞাত আয়বহির্ভূত শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেন বিরুদ... সাংবাদিক নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ ককটেল বিস্ফোরণের দায় প্রশাসন ও স্থানীয় এমপি এড়াতে পারবেন না

৩৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে


নুর নবী জনী:বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘রাতের ভোট’ বহুল আলোচিত ও কলঙ্কিত একটি অধ্যায়।২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকালে ভোট শুরু হওয়ার আগের রাতে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা হয়।সকালে সাধারণ ভোটাররা কেন্দ্রে গেলে তাদের বলা হয়,আপনাদের ভোট দেওয়া হয়ে গেছে, চলে যান।নানা জল্পনার পর অবশেষে একাদশ জাতীয় সংসদের ভোট ডাকাতির কুশীলব হিসাবে পরিচিত ৩৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।ভোটের নির্ধারিত সময়ের আগে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স বোঝাই করে রাখার ভিডিও চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

একতরফাভাবে দশম জাতীয় নির্বাাচনের পাঁচ বছর পর শেখ হাসিনাকে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে রাতের ভোট কর্মসূচি বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠেন বিভিন্ন জেলার এই পুলিশ সুপার (এসপি) ও মেট্রোপলিটনের উপপুলিশ কমিশনাররা (ডিসি)। পাতানো নির্বাচন উপহার দেওয়ায় পুরস্কার হিসাবে পদোন্নতি থেকে শুরু করে নানা সুবিধা পান তারা। কেউ কেউ টানা পাঁচ বছর জেলার এসপির দায়িত্বও পালন করেন।

সূত্র বলছে, বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ২১ ও ২২ ব্যাচের ৩৫ কর্মকর্তাও সংযুক্ত আছেন। তাদের চাকরির মেয়াদ ২০২৮ সালে ২৫ বছর পূর্ণ হলে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হতে পারে।

জানা গেছে, অবসরে পাঠানো এসব কর্মকর্তার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আগের আমলে। তবে তারা চাকরিতে যোগ দেন বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর (২০০১ সালের ৩১ মে)। অত্যন্ত প্রভাবশালী এসব কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০১৮ সালে সংসদ নির্বাচনের সময় বিভিন্ন জেলায় এসপি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অবসরে পাঠানো একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারে না। আমরা দায়িত্ব পালনকালে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ পালন করেছি মাত্র। এটি একটি চেইন অব কমান্ডের মতো। অবসরের বিষয়ে সরকার যেটা ভালো মনে করেছে সেটাই করেছে।জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘অবসরের বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের সিদ্ধান্তে হয়েছে।

বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ২০তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের এই ৩৩ কর্মকর্তার অনেকে ছাত্রজীবনে ছিলেন ছাত্রলীগের ক্যাডার। চাকরিও পান আওয়ামী লীগ আমলে। ক্ষমতার দম্ভে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ারও অভিযোগ রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। দোর্দণ্ড প্রতাপেই চলছিল তাদের চাকরি জীবন। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেকায়দায় পড়েন তারা। এদের মধ্যে দুজন কর্মকর্তা (ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম ও ডিআইজি মো. সাইফুল ইসলাম) গ্রেফতার হয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের কঠোর বলপ্রয়োগে জোরালো ভূমিকা রাখার অভিযোগও ওঠে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে। অবশেষে চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় পুলিশের সেই ৩৩ কর্মকর্তাকে।

অবসরে পাঠানোদের মধ্যে ২০১৮ সালে নির্বাচনের সময় সাইফুল ইসলাম-বরিশাল, মিরাজ উদ্দিন-নরসিংদী, শাহ মিজান শাফিউর-ঢাকা জেলা, মোস্তাক আহমেদ খান-রাজধানীর গুলশান বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি), জিহাদুল কবির-চাঁদপুর, মঈনুল হক-যশোর, ইলয়াছ শরীফ-নোয়াখালী, জাকির হোসেন-ফরিদপুর, শাহ আবিদ হোসেন-ময়মনসিংহ, মনিরুজ্জামান-সিলেট, বরকত উল্লাহ খান-সুনামগঞ্জ, আনোয়ার হোসেন-ব্রাহ্মনবাড়িয়া, সঞ্জয় কুমার-টাঙ্গাইল, সাইদুর রহমান খান-গোপালগঞ্জ, শামসুন্নাহার-গাজীপুর, খান মুহাম্মদ রেজোয়ান-মাগুরা, মাশরুকুর রহমান খালেদ-কিশোরগঞ্জের এসপি ছিলেন। এছাড়া মোল্যা নজরুল ইসলাম সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার ছিলেন।

এদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ডিআইজি এবং গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) সাবেক কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম। তিনি ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন। ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ পদেও। আওয়ামী লীগ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট এই কর্মকর্তা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলার এসপি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তিনি ২০২২ সালে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার পদে পোস্টিং পেতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তার সিন্ডিকেট সিনিয়র কর্মকর্তাদের ৫ কোটি টাকা ঘুস দিয়েছিলেন। এই ঘুসের টাকা কিস্তিতে ও চেকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফার্মগেটের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ২০১৩ সালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ডিসি থাকাকালীন এক ব্যবসায়ীকে আটক রেখে জোরপূর্বক ব্যাংক হিসাব থেকে ১ কোটি টাকা ঘুস নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অবসরে পাঠানো অতিরিক্ত ডিআইজি মো.আনোয়ার হোসেন খান কর্মজীবনে বিভিন্ন অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের কারণে বারবার আলোচনায় এসেছেন। অভিযোগ রয়েছে-২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার এসপি থাকাকালে পুরো জেলায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন, গণ-গ্রেফতার এবং ভয়ভীতি দেখানোর পেছনে তার সরাসরি ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তিনি মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের আন্দোলনকারীদের ওপর কঠোর বলপ্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।বিভিন্ন কর্মস্থলে (বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনে থাকাকালে) থানাগুলোর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদায়ন, ফাঁড়ির ইনচার্জ এবং এসআই-এএসআই বদলি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো পুলিশ কর্মকর্তা শ্যামল কুমার নাথ কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে তার অধীন পুলিশ সদস্যদের ইয়াবা চোরাচালানে জড়িয়ে পড়া এবং তদারকির গাফিলতি নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। এ ঘটনা পুলিশের ইতিহাসে কক্সবাজারের ইয়াবাকাণ্ড বা ইয়াবা বিতর্ক হিসাবে পরিচিত।

Top