শ্রমশিশুরা ব্যবহৃত হচ্ছে ক্রীতদাসের মতো - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শ্রমশিশুরা ব্যবহৃত হচ্ছে ক্রীতদাসের মতো


নুর নবী জনী : উৎপাদনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই দিন-রাত শিশুশ্রমিকদের ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অসামাজিক কাজে সুকৌশলে ব্যবহৃত হচ্ছে সহজসরল শিশুমন।এক্ষেত্রে কন্যাশিশুদের অবস্থা আরও শোচনীয়। সীমান্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে চোরাকারবারি বা নেশাজাতীয় দ্রব্য পাচারকারীরা পথশিশু বা শ্রমজীবী শিশুদের পণ্যের মতো ব্যবহার করছে।
গৃহকাজে ‘কাজের মেয়ে’ নামে পরিচিত শিশুদের ওপর চলে নানা নির্যাতনসহ শারীরিক সহিংসতা। ঘরে বা বাইরে, ন্যূনতম মজুরিতে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয় এই শিশুদের। তাদের কাটাতে হয় ক্রীতদাসের জীবন। প্রায়ই শ্রমশিশুদের ওপর চলে নৃশংস অত্যাচার। রক্ষককে দেখা যায় ভক্ষকের ভূমিকায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুশ্রম প্রতিরোধে আইন থাকলেও কার্যকর নয়। এজন্য দ্রুত শিক্ষার প্রসার আর সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।তথ্য বলছে, দেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিশুশ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। শিশুশ্রম প্রতিরোধে শিশুদের কাজে নিয়োগ করা ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারায় সমাজে শিশুশ্রম বন্ধ হচ্ছে না।

১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শিশুশ্রম বন্ধে কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং ২০০২ সালের ১২ জুন থেকে প্রতিবছর বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়ে আসছে। এবার দিবসের প্রতিপাদ্য-‘শিশুশ্রমকে লাল কার্ড : শিশুদের জন্য ন্যায্য পরিবেশ, বড়দের জন্য শোভন কাজ’।

শ্রম আইন-২০০৬ অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সিদের দিয়ে কাজ করানো হলে তা শিশুশ্রম হিসাবে গণ্য হবে। কেউ যদি শিশুশ্রমিক নিয়োগ দেন, আইনে তাকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

সরকার আইএলও কনভেনশন ১৩৮ ও ১৮২ অনুসমর্থন করেছে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণসহ সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসনে অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে ২০২৫ সাল পেড়িয়ে গেলেও শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যে পৌঁছানোর সঠিক গতিতে নেই বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের ১২ জুন প্রকাশিত আইএলও ও ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক প্রচেষ্টার ফলে শিশুশ্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশুশ্রমে যুক্ত ছিল, যার মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশুই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। এ কারণে তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ইউনিসেফের মতে, শ্রমে যুক্ত অধিকাংশ শিশু কাজ করছে অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে তারা দীর্ঘ সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে হলে বাংলাদেশে জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উদ্যোগ হাতে নেওয়া দরকার।

রাজধানীর পুরান ঢাকার বিভিন্ন ছোট-বড় কলকারখানা-গ্যারেজে থাকা শিশুরা জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। শুধু রাজধানীতে নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে শিশু। বারুদের কারখানায় আতশবাজি তৈরি থেকে শুরু করে ইটভাটা, পাথরখাদান, কারুশিল্প, রাসায়নিক কারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁয় বয়ের কাজে শিশুদের নিয়োগ করতে দেখা যায়। ভিক্ষাবৃত্তির কাজেও তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। শ্রম আইনে বলা হয়েছে, শিশুদের ১৮টি নির্দিষ্ট পেশায় এবং ৬৫ ধরনের কাজে নিয়োগ করা যাবে না। কিন্তু এমন আইন কেউই মানছেন না।

রাজধানীতে বস্তিবাসীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে শিশু অপরাধীর সংখ্যাও বাড়ছে। লালসায় মত্ত কিছু মানুষ দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে সহায়সম্বলহীন শিশুদের দুর্বিষহ জীবনের পথে ঠেলে দিচ্ছে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় শতাধিক পথশিশু তথা ভবঘুরে শিশু রয়েছে।

পুলিশের তথ্য বলছে, এসব শিশুর অধিকাংশই নানা অপরাধে জড়িত। কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করলেও রাতে এসে স্টেশন এলাকায় জড়ো হয়। সুমন, জাকির, স্বপ্নাসহ ১২-১৫টি শিশু জানায়, তাদের অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন গ্যারেজ, হোটেল রেস্তোরাঁয় কাজ করে। রাতে রেলওয়ে স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও নৌঘাট এলাকায় থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক জানান, সরকার আসে, সরকার যায়-শিশুশ্রম বন্ধ হয় না। বরং প্রতিটি রাজনৈতিক দল শিশুদের রাজনৈতিক সভা-মিছিলে ব্যবহার করে। শুধু কারখানা নয়, আবাসন ও বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোয়ও শিশুদের দ্বারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হচ্ছে। তিনি বলেন, কেবল শিশু নিয়োগকারীকে শাস্তি দেওয়ার নীতিই যথেষ্ট নয়। প্রথমত, নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা দুর্বল। দ্বিতীয়ত, অপরাধ প্রমাণ এবং শাস্তি প্রদানের পদ্ধতি দীর্ঘ, কঠিন এবং অনিশ্চিত। তৃতীয়ত, শাস্তিদানের খবর কখনো কখনো প্রকাশ পায় ঠিকই; কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ে কতটুকু? শিশুশ্রমকে সমাজ অপরাধ হিসাবে মেনেই নিচ্ছে না।

Top