আশাহত আওয়ামী লীগ ,নিষিদ্ধই থাকছে কার্যক্রম
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশটি শেষ পর্যন্ত সংসদে বিল আকারে পাশ হওয়ায় বেশ আশাহত হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।তবে ৮ এপ্রিল এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল,২০২৬’হিসাবে জাতীয় সংসদে পাশ করে বিএনপি সরকার। এখন পাশ হওয়া বিলটিতে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর করার পর গেজেটের মাধ্যমে তা আইনে পরিণত হবে। এর ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থাকছে।কারণ, ক্ষমতায় গেলে বিএনপি তাদের ব্যাপারে কিছুটা হলেও নমনীয় হবে এমন আলোচনা ছিল দেশের রাজনীতিতে। বিশেষ করে, দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় আওয়ামী লীগের দলীয় অফিস খুলতে পারায় এ আশাবাদ কিছুটা বেড়ে ছিল।শুধু তাই নয় নির্বাচনের আগে এমন আলোচনাও ছড়িয়েছে যে,জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকানোর জন্য নৌকা সমর্থকদের ভোট এবার ধানের শীষেই যাবে। আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতে পারবে এমন একটি ধারণাও জনগণের একাংশের মধ্যে তৈরি হয়েছিল।২০২৫ সালের ১১ মে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে ওই অধ্যাদেশ জারি করে পরদিনই এর ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ‘কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ও তাদের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ’র সুযোগ রেখে ওই অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। আইন পাশ হওয়ায় এখন আরও পাকাপোক্তভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে দলটিকে।
এর আগেই অবশ্য চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পতনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতি থেকে কার্যত ছিটকে পড়েছিল আওয়ামী লীগ। তিনটি ‘বিতর্কিত ও একতরফা’ নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘদিন টানা ক্ষমতায় থাকা দলটির শীর্ষ নেতাদের বেশির ভাগই দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন। অন্যদিকে, যারা দেশে ছিলেন তাদের অনেকে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন; আবার কেউ বা এখনো রয়েছেন আত্মগোপনে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে জারি করা হয় অধ্যাদেশ। নির্বাচন কমিশনও স্থগিত করে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন। ফলে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে আর মাঠের রাজনীতিতে দাঁড়াতেই পারেনি দলটি। এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডি-৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় হওয়ার পরেও রাজপথে তেমন কোনো প্রতিবাদ দেখাতে পারেনি আওয়ামী লীগ। এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও নির্বাচনের ওই সময়ে অনেকটা নীরবই ছিল দেশের পুরোনো এই রাজনৈতিক দলটি।
তবে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হওয়ার ছক কষছিল আওয়ামী লীগ। বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয় খোলার চেষ্টাও করেছিলেন তারা। দলের হাইকমান্ড থেকেও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের দেশে ফিরতে বলা হয়েছিল। বিভিন্ন পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠন থেকে শুরু করে আগামীতে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের নির্দেশনাও দেওয়া হয় দলটিকে। দলটির নেতাকর্মীদের ধারণা ছিল, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে তাদের রাজনীতিতে ফেরার পথ তুলনামূলক মসৃণ হবে। বিশেষ করে নানা সমীকরণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা সেই প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে তোলে। তারা আশা করেছিলেন এবার হয়তো রাজনীতির মাঠে ফিরতে পারবেন। তবে এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধসংক্রান্ত অধ্যাদেশটি সংসদে বিল আকারে পাশ করে সরকার। ফলে আওয়ামী লীগের মিছিল, মিটিং, সমাবেশ ও প্রচারণাসহ যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা অনেকটাই স্থায়ী রূপ নিল। এতে অনেকটাই হতাশ হয়েছে আওয়ামী লীগ।
দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, সংসদে এই বিল পাশের পর তাদের ধারণা আপাতত বদলে গেছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বিএনপির বিভিন্ন নেতাদের যে অবস্থান ও বক্তব্য ছিল, কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিল পাশ করার পর সেই হিসাব মেলাতে পারছেন না তারা। এতে নতুন করে আবারও বেকায়দায় পড়তে হয়েছে তাদের। মাঠের রাজনীতিতে ফেরার ‘পুরোনো পরিকল্পনা’ বদলে এখন আবার নতুন করে ছক কষতে হচ্ছে দলটির নেতাকর্মীদের। বিল পাশের পর এ নিয়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের একাধিক বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে কিভাবে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে নতুন করে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলেও দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য দাবি করেন-ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল ‘অসাংবিধানিক সরকার’।তিনি বলেন, তাদের কাছে আমাদের কোনো প্রত্যাশা ছিল না। তারা সব সময় আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে এবং দেশে বিরাজনীতিকরণের অপচেষ্টা করেছে। তিনি আরও বলেন, আমরা ভেবেছিলাম দলীয় সরকার ক্ষমতায় এলে অন্তত সেই পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে। তবে আওয়ামী লীগ কারও দয়ার ওপরে নির্ভর করে কখনো রাজনীতি করেনি। ভবিষ্যতেও করবে না। জনগণের সমর্থন নিয়ে এবং তাদের সঙ্গে নিয়েই আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হবে বলেও দাবি করেন ওই নেতা।
কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিল সংসদের পাশের পর আওয়ামী লীগের আগামী দিনের দলীয় রাজনীতির পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় ভারতে অবস্থান করা দলের দুজন সাংগঠনিক সম্পাদকের কাছে। অনেকটা অভিন্ন সুরে তারা দাবি করেন, কেন্দ্রীয় নেতারা দেশে বা প্রকাশ্যে না থাকলেও দলের সর্বস্তরে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ তারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। এখন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা নিয়মিত অনলাইনে মিটিং করছেন এমনটা জানিয়ে ওই নেতারা বলেন, তিনিই সার্বিক বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। তারা জানান, খুব শিগগিরই দেশের রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগ সক্রিয় হবে। কিন্তু কিভাবে হবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো বক্তব্য দিতে পারেননি ওই দুই নেতা।কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, দলীয় নির্দেশনা মেনে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এবং নির্বাচনের পরপরই অনেক কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতা দেশে ফিরেছেন। আবার অনেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিলেও আইন পাশের পর এখন কিছুটা সময় নিচ্ছেন। মূলত ভেঙে পড়া সাংগঠনিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে দলটি। পাশাপাশি তারা সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ; এই চার স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কীভাবে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেই কৌশল খুঁজছে। সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগের লক্ষ্য দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নির্বাচনি রাজনীতিতে ফিরে আসা। তবে যেমনটা বিবেচনায় ছিল, সেই পথ যে ততটা সহজ হবে না তা ইতোমধ্যেই বুঝতে পেরেছেন দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল নেতাকর্মীরা।