চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দ্রুতই অভিযান - Alokitobarta
আজ : বৃহস্পতিবার, ৫ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দ্রুতই অভিযান


মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:রাজনৈতিক তদবিরকে গুরুত্ব না দিতে পুলিশের প্রতি নির্দেশনা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।তালিকা ধরে দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করুন। আমার সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়েও অন্যায় আবদার জানানো হতে পারে। আপনারা এক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন। ন্যায়নিষ্ঠ এবং পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি বলেছেন, চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কোনো কার্পণ্য করবেন না। বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব নির্দেশনা দেন।সভা শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রস্তুত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অভিযান চালানো হবে। শিগ্গিরই রাজধানী ঢাকা থেকে এ অভিযান শুরু হবে। তিনি বলেন, সভায় দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, চাঁদাবাজদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এবং দাগি আসামিদের একটি নিরপেক্ষ ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। যারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে পুলিশকে ‘নির্মোহ’ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মব কন্ট্রোলে ফায়ার হবে, কিন্তু গুলি বের হবে না-সভায় পুলিশকে এমন প্রযুক্তি দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন মন্ত্রী। সভায় পুলিশের কর্মঘণ্টা কমানো এবং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) শক্তি বাড়ানো এবং পুরো ঢাকাকে সিসিটিভির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। সভাসূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সভায় আইজিপি আলী হোসেন ফকির, ডিএমপি কমিশনার (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. সারওয়ারসহ ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কমিশনার ও অতিরিক্ত কমিশনার ছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন যুগ্মকমিশনার (ডিবি) নাসিরুল ইসলাম, রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম ও তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈনু মারমা।

মন্ত্রীর বক্তব্যের বরাত দিয়ে সভাসূত্র জানায়, কোনো ধরনের চাঁদাবাজি চলবে না। কোনো পুলিশ সদস্য বা দলীয় নেতাকর্মী চাঁদাবাজিতে জড়ালে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কাওরান বাজার, সায়েদাবাদ, গাবতলী এলাকায় শিগ্গিরই বড় অভিযান চালানো হবে। মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীদের ধরতেও বিশেষ অভিযানের বিকল্প নেই বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন। মব কন্ট্রোলে হতাহত কমাতে নতুন কৌশল অবলম্বনের পরামর্শ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শুরুতেই অ্যাকশনে না গিয়ে আরও স্মার্টলি কাজ করতে হবে বলে জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈনু মারমা বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক লোকজন ব্যক্তিস্বার্থে পুলিশের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই স্বাধীনভাবে কাজ করতে হলে এক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সমর্থন প্রয়োজন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তি নানা তদবিরের জন্য পুলিশের কাছে আসতে পারেন। কোনো রাজনৈতিক তদবির না শুনে গুরুত্ব অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, আমি রাজনৈতিক ব্যক্তি। অনেকেই আমার সঙ্গে ছবি তোলেন। আমার সঙ্গে থাকা ছবি দেখিয়ে কেউ কেউ বাড়তি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চালাতে পারে। এ ব্যাপারে পুলিশকে সতর্ক থাকতে হবে। অত্যন্ত পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বাহিনীর কাজ বাহিনীকেই করতে হবে। দলবাজিতে না জড়িয়ে পুলিশকে তার সঠিক কাজটা করতে হবে।

পুলিশের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার দাবি জানানো হয়। বলা হয়, আমরা ঠিকমতো ছুটি কাটাতে পারি না। অনেককেই ১৬-১৮ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়। ভালো সেবা দিতে হলে পুলিশের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি রায়ট কন্ট্রোলে পুলিশ বিভাগে উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহের দাবি জানানো হয়। ডেমোক্রেসির জন্য ডেমোস্ট্রেশন করা যাবে। কিন্তু মব করা যাবে না। মব নিয়ন্ত্রণে ‘ফায়ার হবে, কিন্তু গুলি বের হবে না-এ ধরনের সরঞ্জাম প্রয়োজন। পুলিশে এমন প্রযুক্তি আনা হলে ক্যাজুয়ালটি (হতাহত) ছাড়াই মব কন্ট্রোল করা সম্ভব হবে।

দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চাঁদাবাজ-অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী যেই হোক না কেন, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করতে হবে। পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়-এমন কোনো কাজ করা যাবে না।

পুলিশের জনবল বাড়ানোসহ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সরকারের সহযোগিতা কামনা করা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। এ প্রেক্ষাপটে মন্ত্রী পুলিশের অর্গানোগ্রাম চাইলে তা সরবরাহ করা হয়। এরপর মন্ত্রী বলেন, সামনের দিনে সাইবার অপরাধ বেশি হতে পারে। এক্ষেত্রে পুলিশকে সাইবার পারদর্শিতা বাড়াতে হবে। জনবলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও সাইবার ইউনিটকে আরও তৎপর হতে হবে। এ সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি উল্লেখ করে বলেন, জনমনে পুলিশ সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা আছে, তা দূর করতে হবে। পুলিশি কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে মনোবল চাঙা হয়। এজন্য প্রো-অ্যাকটিভ পুলিশিংয়ে জোর দিতে হবে।

মন্ত্রী বলেন,ট্রাফিক জ্যামের কারণে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। কীভাবে ঢাকার যানজট নিরসন করা যায়,সে বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরি করুন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মানুষের কর্মঘণ্টার সঠিক ব্যবহার করা গেলে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তদন্তে প্রযুক্তিগত বিষয়টিকে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী। এ সময় পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, তথ্যপ্রযুক্তিগত সাপোর্ট নিশ্চিত করতে যে কমন প্ল্যাটফর্ম আছে, সেটির ব্যাপ্তি আরও বাড়াতে হবে। ওই কমন প্ল্যাটফর্মটি হলো ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)। সব আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা এবং তদন্ত সংস্থা হলো এনটিএমসির স্টেকহোল্ডার। তাই এনটিএমসি যত শক্তিশালী হবে, তদন্তের গুণগত মান তত বাড়বে। পাশাপাশি পুলিশের প্রো-অ্যাকটিভ কাজ সহজ হবে। কীভাবে এনটিএমসিকে শক্তিশালী করা যায়, এ বিষয়ে ডিএমপির কাছে একটি লিখিত প্রস্তাবনা চান মন্ত্রী। শিগ্গিরই এ সংক্রান্ত একটি লিখিত প্রস্তাবনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হবে বলে জানা গেছে।রাজধানীর অপরাধ তৎপরতা কমাতে পুরো ঢাকা শহরকে গুণগত মানসম্পন্ন সিসিটিভির আওতায় আনার দাবি জানানো হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে। জবাবে মন্ত্রী বলেন, এটা আমাদের সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে আছে।

সভা শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে পুলিশের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো পুলিশ বিভাগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের কারণে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিনির্ভর না করে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত করতে চাই। পুলিশ আইনানুগভাবে চলবে এবং কোনো ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারী নির্দেশ পালন করবে না।

মানুষকে আশ্বস্ত করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে যাতে দেশে আইনশৃঙ্খলা বজায় থাকে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জনগণ স্বস্তিতে বসবাস করতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিশ্ব স্বীকৃত নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছে। আগের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করা ঠিক হবে না। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মন্ত্রণালয়ে ‘চেইন অব কমান্ড’ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কোনো নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা যেন ঊর্ধ্বতনকে ডিঙিয়ে সরাসরি মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ না করেন, এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনে মন্ত্রী, পুলিশ কমিশনার বা আইজিপি যে কোনো স্তরে যোগাযোগ করতে পারবেন। নিচ থেকে ওপরের যোগাযোগে চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে হবে।

ঢাকার যানজট প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি একটি বড় সমস্যা। এ বিষয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনারকে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে এক সপ্তাহের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে গেছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, যেখানে নন-মোটরচালিত যান চলাচল নিষিদ্ধ, সেসব ভিআইপি ও প্রধান সড়কেও এসব যান চলছে। পরীক্ষামূলকভাবে উত্তরা থেকে এয়ারপোর্ট সড়ক হয়ে সচিবালয়মুখী ভিআইপি সড়কে এসব যান চলাচল সীমিত করা হবে। পরে পর্যায়ক্রমে অন্য সড়কেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মন্ত্রী বলেন, যানজটের পেছনে নাগরিকদের অসচেতন আচরণও দায়ী। অনেকেই ট্রাফিক সিগন্যাল মানেন না, বাম লেন খালি রাখার নিয়ম অনুসরণ করেন না। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সবার সহযোগিতা পেলে যানজট সমস্যার অনেকাংশে সমাধান সম্ভব। তিনি বলেন, আমরা নিজেরাই ট্রাফিক সিগন্যাল মানি না। বামের লেনটা উন্মুক্ত থাকার কথা থাকলেও গাড়ি দিয়ে বন্ধ করে রাখি। আমরা নাগরিক হিসাবেও যানজটের জন্য অনেকটা দায়ী।

Top