আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে আর যেন কোনোদিন জনগণকে রাস্তায় নামতে না হয় - Alokitobarta
আজ : বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে আর যেন কোনোদিন জনগণকে রাস্তায় নামতে না হয়


মোহাম্মাদ মহাব্বাতুল্লাহ মাহাদ:ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও তখন এক হয়েছিল।আমরা জুলাই আর চাই না; আমরা চাই এমন বাংলাদেশ, যেখানে আর যেন কোনোদিন জনগণকে রাস্তায় নামতে না হয়। জুলাই হয়েছিল একটা বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য; একটা কালো রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তনের জন্য; যুগের পর যুগ কুক্ষিগত ক্ষমতা, পরিবারতন্ত্র ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাত থেকে মুক্তির জন্য। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান উন্নত, আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের নির্বাচিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। সবাইকে নিয়ে ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেন জামায়াত আমির। সোমবার সন্ধ্যায় তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে এ কথা বলেন।জুলাইয়ের শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে জামায়াত আমির বলেন, জুলাইয়ে রাস্তায় নেমেছিল আমার তরুণ বন্ধুরা।তিনি বলেন,দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। অর্থনৈতিক মুক্তি চায়। কিন্তু একটি মহল পরিবর্তনের বিরোধী। কারণ, পরিবর্তন হলেই তাদের অপকর্মের সব পথ বন্ধ হবে। মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এই সংস্কৃতি বদলানোর সাহস সবার থাকে না। ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর হিম্মত সবার থাকে না। এই দেশ আমাদের সাহসী সন্তানদের হাতেই তুলে দিতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এই তরুণরা রচনা করবে। এই তরুণরা পরিশ্রমী, সাহসী, মেধাবী। তরুণরা পরিবর্তনকে ভালোবাসেন। তারা নতুনকে আলিঙ্গন করেন, সত্য বলতে দ্বিধা করেন না। তারা প্রযুক্তি বোঝেন এবং সামনে এগোতে জানেন। তারাই পারবেন নতুন বাংলাদেশ গড়তে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলুন : ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ চায় নিরাপত্তা, সুশাসন ও ইনসাফ। তাই আগামীর বাংলাদেশকে এসব অঙ্গীকার ও মূল্যবোধের আলোকে সাজাতে চাই। রাষ্ট্রের মৌলিক কিছু সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু এসব পরিকল্পনার সব যেমন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, তেমনই অনেকগুলো একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। এ সংস্কার প্রক্রিয়াকে জারি রাখতে এবং সংস্কার নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। এ গণভোট জনগণের সাধারণ ইচ্ছা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই।

নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা : বাংলাদেশে আমরাই প্রথম জনগণের সামনে পলিসি সামিটের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি-কৌশল তুলে ধরেছি। আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে এর প্রতিফলন রয়েছে। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় জনগণের ভালবাসায় আমরা সরকার গঠন করলে প্রথম দিনে ফজর নামাজ পড়েই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করব ইনশাআল্লাহ।

জামায়াত আমির ভাষণে আরও বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতিকে একটি নতুন স্বপ্নের দিকে নিয়ে যাওয়ার মহাসুযোগ হিসাবে এসেছে। যেসব সমস্যা আমরা বিগত দিনে সমাধান করতে পারিনি, যে লুটেরা গোষ্ঠীকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি; সেসব সমস্যার সমাধান এবং লুটেরা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হচ্ছে আগামী নির্বাচন। আমাদের প্রশ্ন করতে হবে-আমরা কি সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে চাই, আমরা কি নিয়মনীতি-শান্তির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, আমরা কি উন্নত দেশ হতে চাই, আমরা কি শোষণ-জুলুম-দুর্নীতি-চাঁদাবাজমুক্ত রাষ্ট্র চাই?

নির্বাচনি ইশতেহারে আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ তৈরির জন্য ৫টি বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ এবং ৫টি বিষয়ে ‘না’ বলতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে আমরা ‘হ্যাঁ’ বলতে বলেছি। কারণ, এসব মৌলিক শর্ত ছাড়া বৈষম্যহীন, উন্নত, নৈতিক মানসম্পন্ন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। পাশাপাশি দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব, চাঁদাবাজিকে স্পষ্ট করে ‘না’ বলতে হবে।

বিপুল জনগোষ্ঠী সম্পদ : জামায়ত আমির বলেন, বাংলাদেশ আয়তনে ছোট; কিন্তু জনসংখ্যায় বড় একটি দেশ। এ জনসংখ্যাকে অনেকে সমস্যা হিসাবে বিবেচনা করলেও আমরা মনে করি, এটি আল্লাহর নেয়ামত এবং এক বড় সম্পদ। এ জনসংখ্যাকে জনশক্তি হিসাবে রূপান্তর করতে হলে নীতি ও নৈতিকতাভিত্তিক রাজনীতির বিকল্প নেই।

নারীর মর্যাদা রক্ষা : নারীদের মর্যাদার কথা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে নারীরা সগৌরবে সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে থাকবেন। করপোরেট জগৎ থেকে রাজনীতি-কোনো বৈষম্য ছাড়াই সবখানে তাদের মেধার মূল্যায়ন হবে। আমরা এমন এক দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যেখানে কোনো মা-বোনকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না। আপনাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গী হোন। একটি উন্নত ও আধুনিক দেশ গড়ার কারিগর হিসাবে আমাদের নির্বাচিত করুন।

সবার মানবাধিকার থাকবে সুরক্ষিত : জামায়ত আমির বলেন, আমরা মনে করি, সমাজে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবাইকে মর্যাদা দিতে হবে। সবার মানবাধিকার সুরক্ষা দিতে হবে। আমরা এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি যে, একটি মানবিক-উন্নত দেশ গড়ার সুযোগ পেলে দলমতনির্বিশেষে সবার মান-ইজ্জত-অধিকারের সুরক্ষা দেব। এই বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার। কেউ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বাস করবে না। যদি কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে আঘাত করার চেষ্টা করে, আমরা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তা প্রতিরোধ করব।

বেকারত্ব দূর করা : প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়তে হলে তিনটি জায়গায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরে জামায়ত আমির বলেন, শিক্ষা হতে হবে নৈতিকতাভিত্তিক এবং সেটা হতে হবে টেক বেইজড। এখন সারা দুনিয়া প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল। আমরা সেই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। আমাদের সন্তানদের হাতকে দক্ষ কারিগরের হাত হিসাবে গড়ে তুলতে চাই। তাদের হাতে হাতে আমরা কাজ দিতে চাই। কোনো বেকার ভাতা তাদের দিয়ে ছোট করতে চাই না। ন্যায়বিচার : রাষ্ট্র ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হলেই প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়া সম্ভব বলে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, অন্যথায় দুঃশাসন এবং দুর্নীতির কণ্ঠরোধ মোটেই সম্ভব হবে না।

অর্থনীতি : জামায়ত আমির বলেন, তৃতীয় জায়গাটা হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি। এই ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে দেশকে আগানো সম্ভব নয়। সুতরাং অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করতে হবে। বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত এনে দেশে বিনিয়োগ করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। দেশকে স্বাবলম্বী করা হবে।

প্রসঙ্গত, তাবলিগ জামাত : জামায়াত আমির তাবলিগ জামাতের উদ্দেশে বলেন, আপনারা দ্বীনের জন্য যে মেহনত করছেন, দেশ গড়ার কাজেও আমাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করি। আমরা দ্বীনের কাজে আপনাদের মেহনতকে মূল্যায়ন করতে চাই।

সংসদে আনুপাতিক হারে প্রবাসী প্রতিনিধি : জামায়াত আমির বলেন, আমাদের প্রবাসীরা দেশের সম্পদ। তারা যেন দেশের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। প্রবাসীদের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী করতে আনুপাতিক হারে সংসদে প্রবাসী প্রতিনিধি নির্বাচন বা মনোনয়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলেও অঙ্গীকার করেন জামায়াত আমির।

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হচ্ছে আমানত : ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি যে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হচ্ছে আমানত। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কোনো উপভোগের বিষয় নয়। সর্বাবস্থায় আমরা স্মরণে রাখব-‘আমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং আমাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’। আমরা হজরত ওমরের সেই বিখ্যাত উক্তি ও দায়িত্বশীলতা মনে রাখব-‘ফোরাতের তীরে একটি কুকুর না খেয়ে মরে গেলেও আমি ওমর দায়ী থাকব।’ আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ থাকব।

১১ দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহ্বান : অঙ্গীকার ও স্বপ্নকে বিশ্বাস করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশবাসীর সমর্থন চান জামায়াত আমির। তিনি জামায়াতের প্রার্থীদের দাঁড়িপাল্লা মার্কায় এবং যেসব অঞ্চলে ১১ দলীয় প্রার্থী আছেন, সেসব এলাকায় ১১দলীয় প্রার্থীদের প্রতীকে ভোট দেওয়ার আকুল আবেদন জানান।

তিনি বলেন, আল্লাহ পরিবর্তনের এক মহাসুযোগ আমাদের দিয়েছেন। আসুন সেটা কাজে লাগাই। বিগত দিনের রাজনীতি পরিহার করি। একটি নতুন বাংলাদেশ তৈরি করি, যেখানে সবাই মান-ইজ্জত-মর্যাদা নিয়ে বাস করবে।

Top