ফ্যাসিবাদী আচরণ যারা করবে তাদের লাল কার্ড দেখাতে হবে
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া : জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটির পাহারাদারি করা আমাদের দায়িত্ব। আধা ইঞ্চি মাটিও কাউকে ছাড় দেব না। জুলাই যোদ্ধারা বলেছিল-‘জীবন দিব, জুলাই দিব না’। আমরাও তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলি, ‘জীবন দিব মাটি দিব না।’ বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। কোনো আধিপত্যবাদ আর মেনে নেওয়া হবে না। তিনি বলেন, আমরা কোনো দলের সরকার চাই না, আমরা চাই জনগণের সরকার। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী আচরণ যারা করবে তাদের লাল কার্ড দেখাতে হবে। সোমবার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
চট্টগ্রাম নগরীর বন্দর স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে আয়োজিত জনসমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, আমাদের যুবসমাজ প্রমাণ করেছে, যে কোনো প্রয়োজনে তারা বুক চিতিয়ে জীবন দিতে পারে। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী আচরণ যারা করবে তাদের লাল কার্ড দেখাতে হবে। জামায়াত যখন দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করল, তখন আরেকটি দল চাঁদাবাজিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এখানে-ওখানে দখলদারি শুরু হয়ে গেল। এসব দখলদারি করতে গিয়ে তারা (বিএনপি) নিজেরা নিজেদের ২৩৪ জনকে মেরে ফেলল। এরা বাংলাদেশকে কী দেবে? ২০০৬ সালে অক্টোবরের মতো লগি-বৈঠার তাণ্ডব চালিয়ে আওয়ামী লীগ যে বার্তা দিয়েছিল এখন এ দলটি একই বার্তা দিচ্ছে। এখন তারা লেগেছে আমাদের পেছনে। তারা বোনদের গায়ে হাত দেয়। আমরা মায়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে দেব না। প্রয়োজনে জান দেব। তিনি বলেন, আমার এক্স-এর আইডি হ্যাক করে একটি জঘন্য বিষয় চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। হ্যাক করেছে হ্যাকার। এখন আবিষ্কার হয়ে গেছে-এসব কারা করেছে। পেছনে কারা আছে তাও বের করব।
চট্টগ্রাম প্রতিরোধের রাজধানী উল্লেখ করে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। বর্তমানে যে বিএনপি সেটি জিয়াউর রহমানের বিএনপি নয়, খালেদা জিয়ারও বিএনপি নয়। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর পুঁজি করে কাউকে স্বার্থ হাসিল করতে দেওয়া হবে না। যুবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমার কাজটা তুমি নাও, এবার আমার দেশটা গড়ে দাও। ধর্মে ধর্মে আর কোনো ভেদাভেদ চাই না। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বন্দর স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন নগর জামায়াতের আমির নজরুল ইসলাম।
লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া এসিএম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। আমরা কোনো দলের সরকার চাই না, চাই জনগণের সরকার- যে সরকার দেশের মালিক নয়, সেবক হয়ে কাজ করবে। দুপুর আড়াইটার দিকে দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে জনসভায় ডা. শফিকুর বলেন, দেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং ন্যায় ও ইনসাফের দাবিতে সারা দেশে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। যুবসমাজকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, দেশের নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ গঠনে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। তাদের নেতৃত্বেই পরিবর্তনের আন্দোলন সফল হয়েছে। চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এসব অনিয়ম কোনোভাবে সহ্য করা হবে না। রাজনীতির আড়ালে অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
জনসমাবেশে বক্তব্য দেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম), নেজামে ইসলামীর সভাপতি সরোয়ার কামাল আজিজী, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সাবেক এমপি আ ন ম শামসুল ইসলাম, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিঙ্গাতুল্লাহ সিদকা এবং ডাকসুর সাবেক জিএস এস এম ফরহাদ। বিভিন্ন আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে আগামী নির্বাচনে তাদের সমর্থনের আহ্বান জানান জামায়াতের আমির।
প্রার্থীরা হলেন-চট্টগ্রাম-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৬ আসনে জহিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম-১৩ আসনে অধ্যাপক মাহমদুল হাসান, চট্টগ্রাম-১২ আসনে ডা. ফরিদুল আলম, বান্দরবান আসনে ১১ জোটের শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থী আবু সাঈদ মুহাম্মদ সুজা উদ্দিন।
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, দুপুরে কক্সবাজারের বাহারছড়া মুক্তিযোদ্ধা গোলচত্বর মাঠে আয়োজিত নির্বাচনি জনসমাবেশে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা যুবকদের হাতে বেকারভাতা তুলে দিয়ে অপমানিত করব না। তাদের হাতকে শক্ত করব, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করব। দেশ গড়ার কারিগর হিসাবে যুবকদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে বলা হবে-এগিয়ে যাও, এ দেশ তোমার। সেই সময় যুবকরা বলবে-আমিই বাংলাদেশ।
‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ, গণভোটে হ্যাঁ দিই’-এ স্লোগান সামনে রেখে আয়োজিত জনসমাবেশে নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর বলেন, আমরা মায়েদের মাথার ওপরে তুলে রাখার মর্যাদা দেব। ঘর থেকে কর্মস্থল পর্যন্ত নারীদের চলাচলের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। নারীদের মাস্টার্স পর্যন্ত শিক্ষার সব খরচ সরকার বহন করবে বলেও তিনি জানান। সম্প্রতি নারীদের প্রতি সহিংসতা ও অপমানের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গত কয়েক দিনে মা-বোনদের অপমান করার মতো একাধিক ঘটনা ঘটেছে। আমি এর প্রতিবাদ করায় একটি চক্র আমার পেছনে লেগেছে। তারা সামনে এসে মোকাবিলা করতে পারে না, পেছন থেকে আঘাত করে। তবে পেছনের লোকেরা সবসময় পেছনেই পড়ে থাকবে।
কক্সবাজারের উন্নয়ন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর বলেন, কক্সবাজার একটি অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল। তবুও এ কক্সবাজার আজও কেন হংকং বা সিঙ্গাপুর হতে পারেনি-এ প্রশ্ন রাখেন তিনি। তার মতে, অসৎ, দুর্নীতিবাজ ও ব্যাংক লুটেরাদের কারণে এ অঞ্চল পিছিয়ে আছে। তিনি বলেন, দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। এ অর্থ উদ্ধার করে জনগণের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারবাসীর প্রাণের দাবি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। কক্সবাজার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যা মানুষ গড়বে এবং দেশ গঠনে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করবে।
রাজনৈতিক সংস্কার প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘রাজার ছেলে রাজা হবে’-এ রাজনীতি থেকে দেশকে বের করে আনতে চাই। যার যোগ্যতা আছে, সেই হবে দেশের সেবক। একজন রিকশাচালকের মেধাবী সন্তানও যেন যোগ্যতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারে-এমন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য তাদের।
গণভোট প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার নামই ‘হ্যাঁ’। অনেকে শুরুতে ‘না’ বললেও এখন জাতির চাপে ‘হ্যাঁ’ বলতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ যেন শুধু মুখের কথা না হয়ে বুকের কথা হয়। তবে এবার ‘না’-এর পক্ষে দাঁড়ালে জাতি তার হিসাব বুঝে নেবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ মানে আজাদি, না মানে গোলামি।’ জনসভায় কক্সবাজার-১, ৩ ও ৪ আসনের প্রার্থীদের হাতে ডা. শফিক দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন। তারা হলেন-কক্সবাজার-১ আসনে আবদুল্লাহ আল ফারুক, কক্সবাজার-৩ আসনে শহিদুল আলম বাহাদুর, কক্সবাজার-৪ আসনে নুর আহমদ আনোয়ারী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির কেন্দত্রীয় নেতা ডা. মাহমুদা মিতু, জাগপার কেন্দ্রীয় সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি মো. সিগবাতুল্লাহ সিফাত এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. পারভেজ।
এর আগে সকালে মহেশখালীতে আয়োজিত জনসমাবেশে ডা. শফিকুর বলেন, আমরা শুধু জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, আমরা চাই দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। জনগণের বিজয়ই প্রকৃত বিজয়। জনসভায় তিনি কক্সবাজার-২ আসনের প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন। মহেশখালী ও কক্সবাজারের জনসভা শেষে জামায়াতের আমির চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন।