দেশে এডিস মশার প্রাদুর্ভাব বাড়ার পাশাপাশি ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে,মশার কামড়ে মৃত্যু মিছিল কি ‘মহামারি’? - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ২৯শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফের জানাযায় মাওলানা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের অংশগ্রহণ বই ছাপায় সিন্ডিকেট,আওয়ামী লীগ নেতা রাব্বানীর একক দরপত্র, সরকারের বাড়তি খরচ ৩ কোটি টাকা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবি অর্থায়ন করতে আগ্রহী,গাবতলী-নারায়ণগঞ্জ মেট্রোরেল ব্যয় ৬১ হাজার কোটি টাকা অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তৃণমূলের দায়িত্বশীলদের যোগ্য হয়ে উঠতে হবে ওয়াশরুমের ফলস ছাদে লুকিয়ে পুলিশকে গুলি,মোবারকসহ গ্রেফতার ৪,পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত , লুট হওয়া অস্ত্র-গু... ফ্যামিলি কার্ডে নতুন হিসাব ৪১ লাখ কার্ড বানাতেই ব্যয় ২৪৬ কোটি টাকা শেষ মুহূর্তে বিরোধী দলের ওয়াকআউট,সংসদে তিন বিল উত্থাপন ফের আলোচনায় ভারতের হাইভোল্টেজ বিদ্যুৎ লাইন,বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার অপপ্রচার ঠেকাতে এমপিদের মাঠে থাকার নির্দেশ,

দেশে এডিস মশার প্রাদুর্ভাব বাড়ার পাশাপাশি ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে,মশার কামড়ে মৃত্যু মিছিল কি ‘মহামারি’?


ডা.মুন্সী মুবিনুল হক:দেশে এডিস মশার প্রাদুর্ভাব বাড়ার পাশাপাশি ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে।চলতি বছরের অক্টোবরে ৮০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে যে রোগে সেটাকে কি মহামারি বলা যাবে? চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন,অন্যদেশ হলে বলতো। কারণ তাদের সুশাসন রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই মৃত্যু মিছিলকে রাজনৈতিক কারণেই মহামারি বলেনি কোনও সরকার।একসময় বছরের নির্দিষ্ট একটা সিজনে এডিস মশা থেকে সাবধান থাকলে ডেঙ্গু এড়ানো গেলেও এখন সারা বছরই এই মশা কামড়াচ্ছে এবং মানুষ মারা যাচ্ছে।

পরিস্থিতি কি ‘মহামারি’র মতো?
‘মহামারি’ ঘোষণা একটি নীতিগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত — যা নির্ভর করে রোগের বিস্তার, মৃত্যুহার, হাসপাতালের চাপ এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নির্দেশনার ওপর। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের অক্টোবর মাসটি বাংলাদেশের জন্য ডেঙ্গু জ্বরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ মাসে ডেঙ্গুতে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সর্বোচ্চ সংখ্যক আক্রান্তের ঘটনাও রেকর্ড হয়েছে। শুধু অক্টোবর মাসেই দেশে ২,২৫০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, যা চলতি বছরের এক মাসে সর্বাধিক সংখ্যা। এর আগে সেপ্টেম্বরে ৭৬ জন, জুলাইতে ৪১ জন এবং আগস্টে ৩৯ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। এদিকে, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে।

কখন মহামারি বলা হয়?
কোনও নির্দিষ্ট রোগ যদি কোনও দেশ, অঞ্চল বা জনসংখ্যায় স্বাভাবিক বা প্রত্যাশিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি হারে ছড়িয়ে পড়ে তখন তাকে মহামারি বলা হয়। কোনও নির্দিষ্ট সময় বা এলাকায় রোগের আক্রান্তের সংখ্যা যখন হঠাৎ বেড়ে যায় এবং স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে যায় — বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে তখন সেটি মহামারি হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি হতে পারে — সংক্রামক রোগ (ডেঙ্গু, কলেরা, কোভিড-১৯) কিংবা কোনও নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত ঘটনা (খাদ্যে বিষক্রিয়া বা রাসায়নিক দূষণজনিত অসুস্থতা)। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তারকেও অনেক বিশেষজ্ঞ ‘মহামারি পরিস্থিতি’ বলেছিলেন, যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সেই ঘোষণা দেয়নি।

মশার কামড়ে মৃত্যু বলেই কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কিনা প্রশ্নে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মশাবাহিত রোগ বিষয়ক গবেষক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘মহামারি বিষয়টা দেশ বিভেদে ভিন্ন হয়। আমরা অনেক কিছুই খুব হালকাভাবে নিয়ে থাকি। আমাদের দেশে রাস্তায় দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা যায়, বিদেশে এমন ঘটনা হলে প্রতিক্রিয়া আমাদের দেশের মতো হতো না। আর রাজনৈতিক কারণেও সরকার মহামারি শব্দটা ব্যবহার করতে চায় না।তিনি বলেন, ‘মহামারি ঘোষণা করলেও কী লাভ, মানুষ আতঙ্কিত হবে, সরকারকে দোষারোপ করবে। প্রশাসন সেটার মুখোমুখি হতে চায় না। আমরা সব মেনে নিয়েছি, নিজেদের মানিয়ে নিয়ে চলতে শিখে গেছি।’

ডেঙ্গু এমন ভয়াবহ আকার কেন নিলো প্রশ্নে ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘এটা দীর্ঘসময় ধরে এরকম হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও সুশাসনের অভাব এর প্রধান কারণ। কোনও জবাবদিহি নেই। কোনও সেবা কেন পাবেন না, সেই প্রশ্নের জবাব কে দেবে, আর প্রতিকার কোথায় পাবেন-তা নাগরিকদের জানা নেই।’

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণ তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকা ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের ঘাটতি একটা বড় কারণ। এছাড়া জনগণের সচেতনতার অভাব প্রকট। স্বাস্থ্য অধিদফতর, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনগণ একসঙ্গে কাজ না করলে এই বলয় থেকে বের হওয়া সম্ভব না।’

ডেঙ্গু জনস্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা তৈরি করেছে উল্লেখ করে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘পরিস্থিতি জটিল হলেও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অস্বীকার করার প্রবণতা থেকে, দায় নেওয়া থেকে বিরত আছেন। এর আগে প্রদর্শনজনিত কারণে হলেও যা যা করণীয় সেটা দৃশ্যমান থাকতো, এখন তেমনটা নয়। ফগিংয়ের যে উদ্যাগ, সেটা এডিস মশা নিধনে কার্যকর তো নয়ই; বরং পরিবেশ ও অন্যান্য কীটের জন্য ক্ষতিকর।’

তিনি বলেন, ‘বৃষ্টিপাতের ধরনের কারণে এখন সারা বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ও এর কারণে মৃত্যু পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে রোগের কারণ প্রতিরোধ করা যায়, এমন রোগে সংঘটিত মৃত্যুকে যখন গুরুত্ব না দেয়া হয়, সেটা অগ্রহণযোগ্য।’

পরিস্থিতির ক্ষুদ্র অংশ দৈনন্দিন প্রতিবেদনে উঠে আসে উল্লেখ করে এই প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘যে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি, সেটার ভয়াবহতা সরকারি রিপোর্টে পুরোপুরি উঠে আসে না। সিভিল সার্জনের কাযালয় থেকে যে চিত্র পাওয়া যায় তার চেয়ে প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। ফলে এটা মরণব্যাধিতে রূপান্তরিত হয়েছে বলা যায়।’

আসলেই সিটি করপোরেশনের উদ‍্যোগে ঘাটতি আছে কিনা জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই আমরা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সভা করেছি। সভায় বিশেষজ্ঞরা যে পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলো সারা বছর ধরে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি এবং তা এখনও চলমান।’

তিনি বলেন, ‘বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে সেবা কার্যক্রম জোরদার করতে ডিএনসিসি এলাকায় ইতোমধ্যে ৭ জন পরিদর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত বছরের তুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। তবে ডেঙ্গুতে একটি মৃত্যুও আমাদের কাম্য নয়। স্বল্প জনবল নিয়েও আমরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

ডিএনসিসি প্রশাসক আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতি হাজারে ২.৩ জন কর্মীর প্রয়োজন, কিন্তু আমাদের রয়েছে প্রতি ১১ হাজারে একজন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। তবুও আমরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বোচ্চটুকু দিয়ে কাজ করছি। শুধুমাত্র সিটি করপোরেশনের একক উদ্যোগে নয়, বরং জনগণের সচেতনতা ও সেবাদানকারী সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।

Top