টিআইবিসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নিন্দা প্রত্যাহার দাবি,আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন: সরকারের অনুমতি পেলে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করবে-পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের এমন বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। অবিলম্বে বক্তব্য প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি আইজিপির অপসারণ দাবি করা হয়েছে। পৃথক বিবৃতিতে সংগঠনগুলো বলেছে, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনা তুলে ধরা আইনের শাসন, সংবিধান ও মানবাধিকারের পরিপন্থি।’ এদিকে নিন্দা ও প্রতিবাদের মুখে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এতে বলা হয়েছে, “আইজিপি আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে‘ক্রসফায়ার’শব্দটি উল্লেখ করেছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি শব্দটি ব্যবহার করেননি।
সোমবার দুপুরে পুরান ঢাকায় ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব, আইন-সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেটাই আমরা করব। যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে, আমরা সেটা করব।’ এছাড়া আইজিপি সাংবাদিকদের নিয়েও নেতিবাচক মন্তব্য করেন।তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতার ঢাল হিসাবে পুলিশপ্রধান কি ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন? সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার পথ খোঁজা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি কি না, সেই প্রশ্নও তোলা যায়।তিনি বলেন,পুলিশের দায়িত্ব পেশাদার তদন্ত, অপরাধী শনাক্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করা। ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসাবে তুলে ধরা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান নয়। সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধ করতে পারে না। আইজিপির বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বেআইনি বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।’
বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, নিঃশর্ত ক্ষমা, প্রত্যাহার ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আইজিপিকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে টিআইবি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থ না পেয়ে পুলিশের সমালোচনা করার অভিযোগের বিষয়ে সংস্থাটি বলেছে, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বিবৃতিতে বলেন, ‘অপরাধের অভিযোগ থাকলেও কোনো নাগরিককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার অধিকার রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সরকারি নির্দেশেও খর্ব করা যায় না।
আইজিপির বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ছাড়পত্র দেওয়ার শামিল বলে উল্লেখ করেছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার। সংগঠনটির দাবি, বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পাঁচটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তারা নথিভুক্ত করেছে। আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার, এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে আইনসম্মত প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে। আইজিপির বক্তব্য সরকারের অবস্থান, নাকি ব্যক্তিগত-তা স্পষ্ট করতে হবে।’ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আইজিপির এমন বক্তব্য সংবিধান ও আইনের শাসনের পরিপন্থি। এটি অতীতের ফ্যাসিস্ট আমলের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেয়।জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ফয়জুল হাকিম বলেন,ফ্যাসিবাদী চিন্তা জোঁকের মতো রাষ্ট্রের মাথায় জেঁকে বসে আছে, আইজিপির বক্তব্য তারই দৃষ্টান্ত।ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘আইজিপি’র বক্তব্য পতিত ফ্যাসিস্ট আমলের পুলিশের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। আইজিপি হালকা মেজাজে মন্তব্যটি করেছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির এ ধরনের মন্তব্য করা উচিত নয়।
এদিকে এনসিপির দপ্তর সম্পাদক সাদিয়া ফারজানা দিন এক বিবৃতিতে বলেছেন, সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ক্রসফায়ার চালুর বিষয়ে আইজিপির বক্তব্য সংবিধান, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের পরিপন্থি। এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা। সরকারের অনুমতি দিয়েও এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বৈধ করা যায় না। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের অঙ্গীকারের সঙ্গে এ বক্তব্য সাংঘর্ষিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ঢাকতে ক্রসফায়ারের কথা বলা পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্বের প্রকাশ এবং বেআইনি বলপ্রয়োগে উসকানি দিতে পারে। এ অবস্থায় আইজিপিকে অবিলম্বে অপসারণ এবং জুলাই সনদের আলোকে পুলিশ কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে এনসিপি।
এনসিপির শীর্ষ নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এক প্রতিবাদ সমাবেশে আইজিপির ‘অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার’ বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, এমন বক্তব্যের পর কোনো সভ্য দেশে আইজিপি স্বপদে বহাল থাকতে পারতেন না। কতিপয় কর্মকর্তার দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যে পুরো পুলিশবাহিনী আবারও কলঙ্কিত হচ্ছে। সরকার স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না নিলে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নেওয়ার বার্তা দেওয়া হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় মোংলার মিরাজের সন্ধান,কোস্টগার্ডের হাতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেওয়া এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে আটক নারীর মুক্তি দাবি করেন হাসনাত। পাশাপাশি মুগদায় গ্যাস সংকট, সিলিন্ডারের অতিরিক্ত দাম, বাজার সিন্ডিকেট ও প্রকাশ্য চাঁদাবাজির সমালোচনা করেন তিনি। হাসনাত বলেন, সরকার দেড় কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে মোড়ে মোড়ে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে অধিকার আদায় করবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল এক বিবৃতিতে বলেন,সাংবাদিকদের পেশাগত সততা নিয়ে ঢালাও মন্তব্য স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থি। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এই বক্তব্য প্রত্যাহার করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা না চাইলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।’ বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল ও সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ বিবৃতিতে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ তোলা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। এই বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে কর্মসূচি নেওয়া হবে।
আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা পুলিশ সদর দপ্তরের : রাতে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখা থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন আইজিপি। বক্তব্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে উল্লেখ করা হলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি শব্দটি ব্যবহার করেননি।’ ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘প্রচলিত আইন, বিশেষ করে দণ্ডবিধি-১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ ও পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১-এ পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলা হয়েছে।সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির মন্তব্যের বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এতে বলা হয়, ‘সাংবাদিকদের সম্পর্কে তিনি ঢালাও কোনো মন্তব্য করতে চাননি। বিষয়টি অসাবধানতাবশত হয়েছে।