রাজধানীর ফুটপাত ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়,সড়কের ফুটপাত কারো না কারো দখলে থাকছে - Alokitobarta
আজ : সোমবার, ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
শিক্ষার্থীর খরা, তবু নতুন ১১ প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের চেষ্টা পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তি ঘোলা পানিতে মাছ শিকার চায় প্রশ্নবিদ্ধ বাংলাদেশিদের গ্রহণযোগ্যতা ফুয়াদ হাসান আকন্দের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অপপ্রচারের প্রকৃত সত্য প্রকাশ স্থানীয় নির্বাচনে জোট করতে শরিকদের চাপে জামায়াত মাদক ও সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ঠাকুরগাঁওবাসী দাঁড়িপাল্লার বিজয়ের অপেক্ষায় রয়েছে রাজধানীর ফুটপাত ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়,সড়কের ফুটপাত কারো না কারো দখলে থাকছে ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণে গ্যারান্টর জালিয়াতি সুস্পষ্ট লঘুচাপ ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা,চার দিন বৃষ্টির আভাস বন্ধ হচ্ছে সামিটের তিন বিদ্যুৎকেন্দ্র

রাজধানীর ফুটপাত ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়,সড়কের ফুটপাত কারো না কারো দখলে থাকছে


বিশেষ প্রতিনিধি:রাজধানীর ফুটপাত ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়,পথচারীদের চলাচলের জন্য। কিন্তু যুগের পর যুগ ধরে ঢাকার অধিকাংশ সড়কের ফুটপাত কারো না কারো দখলে থাকছে। কোথাও অস্থায়ী দোকান।এ অভিযান নিয়ে চলছে বিতর্ক। তবে দীর্ঘদিন পর দুই সিটি কর্পোরেশনের এমন উদ্যোগে মানুষ খুশি। অভিযানে সরানো হচ্ছে অস্থায়ী দোকান ও অবৈধ স্থাপনা। কিছু এলাকায় ফিরে আসছে হাঁটার পরিবেশ। কিন্তু অন্য কিছু এলাকায় উচ্ছেদের পর আবার দখল করে বসানো হচ্ছে দোকান। সাম্প্রতিক সময়ের অভিযানগুলোর পর এমন চিত্র ফোটে ওঠেছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদকৃত এলাকা সুন্দর এবং মানুষের নির্বিঘœ চলাচল উপযোগী; কিন্তু দাক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনেক এলাকার ফুটপাত ফের দখলদারদের হাতে চলে গেছে। কোথাও পণ্যের স্তূপ। কোথাও আবার স্থায়ী দোকানের বর্ধিত অংশ। ফুটপাত থাকলেও সে পথে চলাচল করতে পারেন না সাধারণ মানুষ। আর ফুটপাত দখলে থাকার কারণে সড়কে নিত্য যানজট লেগেই থাকে। মানুষের চলাচল নির্বিঘœ করতে ফুটপাত দখল মুক্ত করতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে।

নগর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফুটপাত দখলকে কেন্দ্র করে বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। নাগরিক ভোগান্তি কমাতে ও ফুটপাতের ব্যবহার নিশ্চিত করতে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অতীতে বিভিন্ন স্থানে উচ্ছেদের পর আবারো দোকান বসানোর অভিযোগ ওঠেছে। এতে কাঙ্খিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। সমস্যার সঙ্গে জড়িত চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা এবং পুনর্দখল ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে থানা-পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ, ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। চাঁদা আদায়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি যে পরিচয়েরই হোক না কেন প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

রাজধানীর মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকায় মেট্রোরেল লাইনের নিচের সড়ক ও ফুটপাত একসময় ছিল অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। ফুটপাতজুড়ে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য অস্থায়ী দোকানপাট। কোথাও কাপড়ের দোকান, কোথাও ফলমূল, চা-নাশতা কিংবা বিভিন্ন পণ্যের পসরা। এসব দোকানের কারণে ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা ছিল কঠিন। বাধ্য হয়ে অনেক পথচারীকে নামতে হতো মূল সড়কে। এতে একদিকে যেমন যানজট বাড়ত, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হতো। তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অভিযানে এসব এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় এসেছে পরিবর্তন। দখলমুক্ত ফুটপাত ও সড়কের আশপাশে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ করায় এলাকাগুলোতে তৈরি হয়েছে ভিন্ন পরিবেশ। এখন অনেকটা স্বস্তি নিয়ে চলাচল করতে পারছেন পথচারীরা।গতকাল শনিবার সরেজমিনে মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকার মেট্রোরেল লাইনের নিচের সড়ক ও আশপাশের এরাকা ঘুরে দেখা যায়, আগের তুলনায় ফুটপাতের ওপর দোকানপাটের দখল নেই। যেসব স্থানে একসময় দোকানের মালামাল, টেবিল, বেঞ্চ কিংবা পণ্যের স্তূপ পড়ে থাকত,সেসব জায়গার অনেকাংশ এখন পথচারীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত। ফুটপাতের ওপর দিয়ে হাঁটার সুযোগ তৈরি হওয়ায় পথচারীদের আর আগের মতো বারবার মূল সড়কে নেমে যেতে হচ্ছে না। মিরপুর-১০ এলাকার কর্মজীবী মানুষ,শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতিদিন নানা প্রয়োজনে এ পথ ব্যবহার করতে হয়।

কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকাতেও একই ধরনের পরিবর্তন চোখে পড়ে। মেট্রোরেল লাইনের নিচের সড়কের পাশে বিভিন্ন জায়গায় গাছ লাগানো হয়েছে। সড়কের দুই পাশের খালি জায়গা ও ফুটপাতসংলগ্ন অংশে সবুজের উপস্থিতি পরিবেশকে কিছুটা হলেও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যে এসব গাছপালা পথচারীদের চোখে স্বস্তি এনে দিচ্ছে। পাশাপাশি সড়ক ও ফুটপাতের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা গেলে এসব এলাকা আরো সুন্দর ও বসবাসবান্ধব হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।গত ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চলাকালে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় সিটি করপোরেশনের যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুন লাগার ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। তবে সংঘর্ষের পরও উত্তর সিটি করপোরেশন অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, পথচারীদের নির্বিঘœ চলাচলের স্বার্থে ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চলবে। উচ্ছেদের পর কেউ আবার দখল করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মিরপুর-১০ এর ফুটপাতে হকার উচ্ছেদ ও অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে জনগণ দাঁড়িয়ে গেছে এবং জনগণ উত্তর সিটি করপোরেশনের এই অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন। ফুটপাতে অবৈধ হকারদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হবে।

মিরপুর-১০ এলাকার ব্যবসায় আরিফুর রহমান বলেন, ফুটপাত দখল হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ি আমরা পথচারীরা। দেখা যায় আমাদের দোকানের সামনে দিয়ে দখল হয়ে গেছে কষ্ট করে হাঁটতে হতো। অনেক সময় দোকানের পণ্য ও ক্রেতাদের ভিড়ের কারণে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করা সম্ভব হতো না। ফলে সড়কে নেমে হাঁটতে হতো। অফিস ছুটির সময়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও বন্ধের সময় এবং ব্যস্ত সময়ে এ সমস্যা বেশি হতো। ডিএনসিসির অভিযানে ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ার পর সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে। তাই উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি করাও জরুরি। তা না হলে কিছুদিন পর আবারো ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে মতিঝিল, পল্টন, গুলিস্তান, সেগুনবাগিচা ও আশপাশের বাণিজ্যিক এলাকায় ফুটপাতের ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা রয়েছে। এসব এলাকায় মানুষের চলাচল বেশি। দোকানপাট, বাজার, অফিস,ব্যাংক, গণপরিবহন ও বিভিন্ন সেবাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয়। ফলে ফুটপাতের প্রতিটি অংশের গুরুত্ব রয়েছে। অনেক জায়গায় ফুটপাতের ওপর দোকান বসে। পণ্য সাজিয়ে রাখা হয়। দোকানের কর্মচারীরা ফুটপাত ব্যবহার করেন।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও অভিযান চালাচ্ছে। পল্টন থেকে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট হয়ে নর্থ সাউথ রোড পর্যন্ত সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চালানো হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত স্থান ছাড়া হকারদের বসতে না দেওয়ার কথা জানানো হয়। উচ্ছেদের পর কিছু সময়ের জন্য ফুটপাত খালি থাকে। পথচারীরা স্বস্তি পান। এরপর ধীরে ধীরে ফিরে আসে দোকানপাট। কয়েক সপ্তাহ পর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, রাজধানীতে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকান বসালে সরাসরি মামলা ও মালামাল ক্রোক করা হবে। রাস্তায় যানজট, যত্রতত্র ময়লা ফেলা এবং পথচারীদের চলাচলে বিঘœ সৃষ্টির জন্য অবৈধ হকার ও ভাসমান দোকান অনেকাংশে দায়ী। নগরবাসীকে এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে রাস্তা ও ফুটপাত দখলের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। নির্ধারিত নিয়মের বাইরে দোকান বসালে মালামাল জব্দের পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিউমার্কেট এলাকার সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার জন্য আগামী সপ্তাহেই আবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। কোনো অবস্থাতেই সড়কে হকার বসতে দেওয়া হবে না।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ প্রফেসর ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক এলাকা আলাদা। কিন্তু নগরবাসীর দৈনন্দিন চলাচল এই সীমানা মেনে চলে না। অনেক মানুষ উত্তরে বসবাস করেন দক্ষিণে কাজ করেন। কেউ এক সিটি করপোরেশনের এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত করেন। ফলে এক অংশে ফুটপাত ভালো থাকলেও অন্য অংশে দুর্ভোগ থাকলে সামগ্রিক সুবিধা কমে যায়। এ কারণে দুই সিটির মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় করা যেতে পারে। একই ধরনের পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে।

তিনি বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা গেলে পথচারীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারবেন। ফলে যানবাহন চলাচলেও কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরতে পারে। নগর পরিবহন ব্যবস্থায় পথচারীদের জন্য নিরাপদ ও বাধাহীন ফুটপাত গুরুত্বপূর্ণ। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থা ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া যাবে না। ফুটপাত দখলের সঙ্গে জড়িত চাঁদাবাজি বা প্রভাবশালীদের ভূমিকা থাকলে তা বন্ধ করার ব্যবস্থাও জরুরি।

Top