নড়েচড়ে বসেছে কর্তৃপক্ষ, বেড়েছে তৎপরতা
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া : প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের পর রাজধানীর হাসপাতাল ও সরকারি আবাসিক এলাকাগুলোর দায়িত্বরতরা নড়েচড়ে বসেছেন। হাসপাতালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিচ্ছন্নতা, খালের সীমানা নির্ধারণ ও পুনঃখনন এবং বৃক্ষরোপণ তদারকিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২০টি জোনে বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। কমিটিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা সক্রিয় থেকে কাজ করবেন।কর্মশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে দেওয়া হয়েছে কঠোর নির্দেশনা। আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টারে পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হয়েছে। গ্রিন রোড সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারে বন্ধ করা হয়েছে অস্থায়ী বাজার।
শনিবার রাজধানীর হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি আবাসিক এলাকা ও ফুটপাত আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি রোগী, শিক্ষার্থী, বাসিন্দা ও পথচারীদের কাছ থেকে সেবা এবং পরিবেশ সম্পর্কে খোঁজ নেন। কয়েকটি স্থানের অপরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। পরিস্থিতির উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সময়সীমাও বেঁধে দেন। সরেজমিন পরদিনই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রতিফলন দেখা যায়। হাসপাতালের পরিবেশে কিছু পরিবর্তন দেখে রোগী ও স্বজনরা স্বস্তি প্রকাশ করেন। তবে তাৎক্ষণিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং চিকিৎসক-জনবল, শয্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের দীর্ঘদিনের সংকট দূর হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
আজিমপুরে পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু, গ্রিন রোডে বাজার বন্ধ : রোবাবার আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টারে পরিচ্ছন্নতার কাজ চলতে দেখা যায়। শনিবার প্রধানমন্ত্রী যখন কোয়ার্টার এলাকা পরিদর্শন করছিলেন, তখন সরকারি বাসা সাবলেট দেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে। এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী। তাই পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সরকারি আবাসনের ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।এদিকে কলাবাগানের গ্রিন রোড সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারের দুই নম্বর খেলার মাঠসংলগ্ন ‘সকালের হাটবাজার’ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গ্রিন রোড এস্টেট সরকারি কর্মচারী সমাজকেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধির নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ওই স্থানে অস্থায়ী দোকানপাট বসানো, হাটবাজার পরিচালনা কিংবা বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ। কোয়ার্টারের অভ্যন্তরে এবং দুই পাশের ফুটপাতেও দোকানপাট বসতে পারবে না। বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাচল, খেলার মাঠের পরিবেশ এবং শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা ও কর্মশৃঙ্খলায় জোর : প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জিয়াউল হক রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল শতভাগ ধূমপানমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কার কমিটিও গঠন করা হয়েছে।’
শনিবার পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলামকে নিজের কক্ষে ধূমপানরত অবস্থায় পান প্রধানমন্ত্রী। কক্ষের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। পরে পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ওই চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।রোববার দুপুরে হাসপাতালের এ-১৬৮ নম্বর কক্ষটি বন্ধ দেখা যায়। এ বিষয়ে পরিচালক বলেন, ‘সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় তিনি হাসপাতালে আসতে পারবেন। তবে চিকিৎসাসেবা বা দাপ্তরিক কাজে অংশ নিতে পারবেন না। প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শিশুর অভিভাবক শাহাদাত বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। সকাল থেকেই পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে।’ ভোলা থেকে মেয়েকে নিয়ে এসে ১৫ দিন ধরে হাসপাতালে থাকা তানিয়া বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর অপরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধযুক্ত শৌচাগারগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে।শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। হাসপাতালের স্যাঁতসেঁতে স্থানে ব্লিচিং পাউডার ছিটানোসহ বিভিন্ন জায়গায় পরিষ্কারের কাজ করতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. মির্জা গোলাম সারোয়ার বলেন,প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। তার নির্দেশনাকে অনুপ্রেরণা হিসাবে নিয়ে সবাই কাজের গতি বাড়িয়েছেন। শৌচাগারের স্বল্পতা, শয্যা সংকট ও পরিচ্ছন্নতার সমস্যা সমাধানে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে।দ্রুত সংস্কার ও পরিচ্ছন্নতার কাজ এগিয়ে নিতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন মায়ের সঙ্গে থাকা কল্যাণপুরের জহির উদ্দিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর কর্তৃপক্ষ আগের চেয়ে বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। তবে রোগী ও দর্শনার্থীদের আচরণেও পরিবর্তন প্রয়োজন। সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে শুধু কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন।’
বদলে গেছে মিরপুরের ফুটপাতের চিত্র : প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের পরদিন রোববার সরেজমিন দেখা যায়, মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুল, আদর্শ স্কুল, হোপ মার্কেট এবং আশপাশের বিভিন্ন সড়কের ফুটপাতের ওপর আগে যেসব দোকান ও অস্থায়ী পসরা বসত, সেগুলো নেই। ফুটপাত পুরোপুরি ফাঁকা। নতুন করে কেউ যাতে বসতে না পারে, এজন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপর থাকতে দেখা গেছে। মিরপুর মডেল থানার ওসি হাফিজুর রহমান বলেন, ‘মিরপুর ১০ নম্বর এলাকা হকারমুক্ত করেছি। পর্যায়ক্রমে অন্য জায়গার ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে।’
সরেজমিন আরও দেখা যায়, দীর্ঘদিন পর ফুটপাতের পুরো অংশ দিয়ে মানুষ হাঁটতে পারছেন। মূল সড়কের পাশেও আগের মতো দোকানের সারি না থাকায় যানবাহন চলাচলের জায়গা বেড়েছে। মিরপুর ১০ নম্বরকেন্দ্রিক যানজটও নেই।
কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতায় উন্নতি, সেবায় ভোগান্তি : প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের পর রাজধানীর উত্তরায় কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা ও মশারির ব্যবস্থায় কিছুটা উন্নতি হলেও বহির্বিভাগে রোগীদের দুর্ভোগ কমেনি। রোববার সরেজমিন দেখা যায়, ১০ টাকার টিকিট সংগ্রহে রোগীদের দীর্ঘ সারি। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ সংগ্রহেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে গেলে ‘টিকিট নট অ্যাভেইলেবল’ বার্তা দেখাচ্ছে। ফলে হাসপাতালে এসে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।বোনকে নিয়ে আসা সামিয়া আফরিন জানান,দীর্ঘ সারি দেখে অনলাইনে টিকিট কাটার চেষ্টা করেও পাননি।প্রতিবেদককে এ সংক্রান্ত স্ক্রিনশটও দেখান তিনি।
চিকিৎসাপ্রার্থীদের আরও অভিযোগ, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যেই বিভিন্ন চিকিৎসকের কক্ষে নতুন রোগী দেখা হবে না বলে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও অনেকে চিকিৎসা না নিয়ে ফিরে যান। সকাল ৮টায় রোগী দেখার কথা থাকলেও কোনো কোনো চিকিৎসক সাড়ে ৯টার পর কক্ষে আসেন। তবে ব্লক-৩-এর ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি কয়েকজন রোগী জানান, প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর পরিচ্ছন্নতা ও মশারির ব্যবস্থায় উন্নতি হয়েছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মিজানুর রহমান অধিকাংশ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘চিকিৎসক সংকটের মধ্যেও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর কনসালট্যান্ট, সুপারভাইজার ও ওয়ার্ড মাস্টারদের নিয়ে কমিটি গঠন এবং পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।’ অনলাইন টিকিটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকে পদ্ধতি না জানায় সরাসরি লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।’ উল্লেখ্য, শনিবার হাসপাতাল পরিদর্শন করে পরিবেশ ও সেবার উন্নয়নে কর্তৃপক্ষকে সাত দিন সময় দেন প্রধানমন্ত্রী।