পরপরই ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড,এত মৃত্যুর দায় কার - Alokitobarta
আজ : সোমবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
প্রশাসনে সচিব পদে বড় রদবদল জাতীয় স্বার্থ ও আত্মমর্যাদা রক্ষাই মূল অঙ্গীকার সরকারের সমালোচনা আর সাইবার অপরাধকে এক করে দেখা যাবে না বিনিয়োগ নিয়ে চারদিকে হাহাকার আর অনিশ্চয়তার কালো ছায়া,কোনো সুখবর নেই নড়েচড়ে বসেছে কর্তৃপক্ষ, বেড়েছে তৎপরতা পরপরই ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড,এত মৃত্যুর দায় কার অনিয়ম দুর্নীতিতে জর্জরিত বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশলঃ দুদকে অভিযোগ প্রতিবাদ শিরোনামে প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি’ তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ বরিশাল ইইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরূদ্ধে নিজেই ঠিকাদারী করার অভিযোগ নেত্রকোণায় গুলি করে সাংবাদিক হত্যা, বাংলাদেশ অনলাইন সংবাদপত্র ও সাংবাদিক ইউনিয়নের নিন্দা ও উদ্বেগ ...

পরপরই ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড,এত মৃত্যুর দায় কার


মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ড এখন আর কেবল দুর্ঘটনা নয়, রীতিমতো জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। কিছুদিন পরপরই ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড।এতে প্রাণ যাচ্ছে শত শত মানুষের।ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে, গত ১১ বছরে সারা দেশে অগ্নিকাণ্ডে ১ হাজার ৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে; আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৯৫ জন।তবে এই হিসাবেও গরমিল রয়েছে।তাৎক্ষণিক মৃত্যুর হিসাব এটি। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যারা মারা যান তাদের খবর কেউ রাখে না। প্রশ্ন উঠেছে, এসব হতাহতের দায় আসলে কার?পুরান ঢাকার নিমতলী, চকবাজারের চুড়িহাট্টা, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপো,নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মেসার্স হাশেম ফুড লিমিটেডের কারখানা,বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের আগুনের ঘা এখনো দগদগে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টের ভয়াবহ আগুনের ঘটনা, যা মানুষকে কাঁদিয়েছে।

বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর সাম্প্রতিক সময়ের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে ভয়াবহ সব অগ্নিকাণ্ডের পেছনে দায় রয়েছে সরকারি-বেসরকারি ১১টি প্রতিষ্ঠানের। এসব প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তাদের উদাসীনতার কারণে অগ্নিঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দায়দায়িত্ব নিরূপণ করতে গিয়ে কমিটি বলছে, ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি, উন্নয়নকারী সংস্থা (যেমন-রাজউক, চউক, খুউক ইত্যাদি), সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, পুলিশ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থা, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, ওয়াসা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছেন। তাদের দায়বদ্ধতার আওতায় আনতে হবে।টুপটুপ রিসোর্ট অগ্নিকাণ্ডের পর জানা গেছে, কক্সবাজারের ইনানীর এই রিসোর্টটি চলছিল ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছাড়াই। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর বলছে, রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্রও ছিল না।

সূত্র বলছে, কোনো ভবনে অগ্নিঝুঁকি আছে কি না, তা তদারকিতে থাকেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। এলাকা ভাগ করে তারা দেখভাল করেন। অগ্নিঝুঁকি থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার সুযোগ রয়েছে ফায়ার সার্ভিসের। তবে এ ধরনের মোবাইল কোর্ট খুব কমই পরিচালিত হয়। অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ভবন মালিক বা প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করেই দায় এড়িয়ে যান।তবে ফায়ার সার্ভিসের দাবি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও সিলগালা করার একক নির্বাহী ক্ষমতা না থাকায় তাদের পক্ষে কার্যকর কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয় না। তাদের নিজস্ব কোনো ম্যাজিস্ট্রেট নেই; এজন্য অন্য সংস্থার দারস্থ হতে হয়। রয়েছে জনবলের স্বল্পতাও।

ফায়ার সার্ভিসের বাৎসরিক প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে সারা দেশে অগ্নিকাণ্ডে সাধারণ মানুষ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ ১ হাজার ৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৮৮ জন, ২০২৪ সালে ১৪১ জন, ২০২৩ সালে ১০২ জন, ২০২২ সালে ৯৮ জন, ২০২১ সালে ২১৯ জন, ২০২০ সালে ১৫৪ জন, ২০১৯ সালে ১৮৫ জন, ২০১৮ সালে ১৩০ জন, ২০১৭ সালে ৪৫ জন, ২০১৬ সালে ৫২ জন এবং ২০১৫ সালে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া এই সময়ের মধ্যে অগ্নিদুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৯৫ জন। জানা গেছে, ২০২২ সালের ৪ জুন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোর আগুন (মারা যান ৪৯ জন); ২০২১ সালের ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মেসার্স হাশেম ফুড লিমিটেডের কারখানার আগুন (মারা যান ৫২ জন); ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুন (৮১ জন মারা যান); ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীর এফআর টাওয়ারের আগুন (মারা যান ২৫ জন) এবং ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের আগুন (নারী-শিশুসহ মারা যান ৪৬ জন) স্মরণকালের বড় অগ্নিদুর্ঘটনা।

অগ্নিকাণ্ডের দায় : সূত্র বলছে, ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন করে রাজউক বা সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অনুমোদন (ট্রেড লাইসেন্স) দেয় সিটি করপোরেশন। কিন্তু আবাসিক ভবনে অবৈধভাবে রেস্তোরাঁ, গুদাম বা রাসায়নিক কারখানা গড়ে উঠলেও নিয়মিত পরিদর্শন বা ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজের ঘটনার মতো অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে পুরো ভবনকে বাণিজ্যিক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। অধিক মুনাফার আশায় অনেক ভবন মালিক ন্যূনতম অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা (যেমন : ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার, ফায়ার এক্সিট, স্মোক ডিটেক্টর, জরুরি সিঁড়ি) ছাড়াই ভবন ভাড়া দেন। বাণিজ্যিক ভবনে সিঁড়িতে মালামাল বা সিলিন্ডার রেখে পথ অবরুদ্ধ করে রাখা এখন খুবই সাধারণ দৃশ্য। ফায়ার সার্ভিস শত শত ভবনকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসাবে চিহ্নিত করে নোটিশ জারি করেই দায় সারছে। অগ্নিকাণ্ডের দায় রয়েছে তিতাস, ডেসকো ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলোরও। পুরোনো জরাজীর্ণ তার, মানহীন সরঞ্জাম এবং অবৈধ গ্যাস সংযোগের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করায় স্ফুলিঙ্গ থেকেই বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এ ছাড়া সাধারণ মানুষ ও কর্মচারীদের মধ্যে ফায়ার ড্রিল বা জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে বের হওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় দুর্ঘটনার মুহূর্তে প্যানিক সৃষ্টি হয় এবং হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রাণহানি আসলে কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা এখনো আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হইনি। শুধু এই সেক্টরে নয়, সব সেক্টরে আইনকানুন মানার ব্যাপারে আমরা খুবই শিথিলতা বজায় রেখেছি। সেফটি নিয়ে খরচ করতে চাই না, সেফটি নিয়ে ভাবতে চাই না, সেফটি নিয়ে কিছু করতে চাই না-যতক্ষণ না বিপদ আসে। এটাই হচ্ছে মূল কারণ। আমাদের আসলে এই কনসার্নটা সব লেভেলেই গ্রো করতে হবে।এদিকে,সরকারের উচ্চপর্যায়ের ওই কমিটির বলছে, ৭ কারণে মাঝেমধ্যেই দেশে ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের কারণ হিসাবে ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ ও শর্টসার্কিট, গ্যাস সিলিন্ডারের যত্রতত্র ব্যবহার ও লিকেজ, অসচেতনতা ও জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরো, মশার কয়েল ও চুলার আগুন, কেমিক্যাল ও দাহ্য পদার্থের অবৈধ মজুত, ট্রান্সফরমার ও বয়লার বিস্ফোরণ, ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অভাবকে চিহ্নিত করা হয়।

উচ্চপর্যায়ের ওই কমিটির প্রতিবেদনে দেশের অগ্নিদুর্ঘটনা রোধ ও প্রাণহানি কমাতে ‘বিট পুলিশিং’-এর বিটকে ভিত্তি করে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, রাজউক, বিদ্যুৎ বিভাগসহ মোট দশটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ‘অগ্নিনিরাপত্তা সচেতন কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আজও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে ওই কমিটির সুপারিশ এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

ডিএমপির রমনা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘অগ্নিনিরাপত্তা সচেতন কমিটির বিষয়টি আমার জানা নেই। গত এক বছরে এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড হয়নি।’ সরকারের পক্ষ থেকে ‘অগ্নিনিরাপত্তা সচেতন কমিটি’ গঠনের কোনো নির্দেশ পেয়েছেন কি না-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার মনে পড়ছে না।’

রাজধানীর চকবাজার এলাকায় বিভিন্ন সময় বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এ এলাকার জন্যও তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কোনো কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিউদ্দিন মারুফ বলেন, ‘অগ্নিনিরাপত্তা সচেতন কমিটির বিষয়ে আমার জানা নেই। আমি নতুন এসেছি, খোঁজ নিতে হবে।

Top