মাদকের বিস্তার এখন মহামারির পর্যায়ে,অভিযান শুধু বৈধ বারগুলোতে
বিশেষ প্রতিনিধি:দেশে অবৈধ মাদকের বিস্তার এখন আর শুধু ভয়ানক অবস্থার মধ্যেই নেই, মহামারীর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিসংখ্যান বলছে দেশে মাদক সেবীর সংখ্যা ৮২ লাখ।দেশের বৈধ বারগুলোর মালিকরা সরকারের সকল আইন-কানুনের মধ্য থেকে লাইসেন্স নিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। তারা নিয়মিত সরকারকে ভ্যাট ট্যাক্স দিচ্ছেন।শুধুমাত্র পারমিটবিহীন কেউ মদপান করছেন কিনা এ অযুহাত তুলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এ বারগুলোতেই অভিযান চালায়।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঠিক মনিটরিং ও দিক নির্দেশনার অভাবে দুর্নীতির সাথে জড়িত ওই সংস্থার কতিপয় কর্মকর্তা দিনকে দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে।তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি।হাত বাড়ালেই মিলছে হেরোইন,ফেন্সিডিল,ক্রিস্টাল মেথ বা আইস,ফেন্টানিল,ক্রোকোডিল (মাংস-খেকো মাদক),কোকেন ও ক্র্যাক কোকেন,এমডিএমএ বা এক্সট্যাসি, এলএসডির মতো জীবন ধ্বংসকারী মাদক।আর ইয়াবা এখন মিলছে সর্বত্র। অথচ মাদকের বিস্তার রোধে দেশের একমাত্র সংস্থা ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর’ উল্লেখিত ভয়ানক মাদক ঠেকানোর চেয়ে কম ক্ষতিকর ও বৈধ মদের বারগুলোতেই অভিযানে বেশি আগ্রহী।
অভিযোগ রয়েছে, শুধু বারগুলোতে নিয়মিত মাসোহারা পেতে দেরি হলেই তারা অভিযানে যায়। অথচ ভয়ঙ্কর সব মাদকে দেশ সয়লাব সেদিকে তাদের নজর নেই। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ গুলোতে নারকোটিক্সের অভিযানের নিয়ম না থাকলেও তারা সেখানেও অভিযান চালায় আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে। সম্প্রতি রাজধানীতে এমন একাধিক অভিযান নিয়ে নারকোটিক্সের রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে সর্বত্র সমালোচনা চলছে। বড় শিল্প গোষ্ঠী তাদের নানা পণ্য বাজারে চড়া দামের বিক্রি ও প্রচার বাড়াতেও টার্গেট করে ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানোর জন্য দুর্নীতিবাজ সরকারী কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চালায় এ অভিযান।
অভিযোগ রয়েছে, একমাত্র মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে একযোগে কাজ করছে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় সবগুলো সংস্থা। অথচ পুলিশ, এসআরবি, বিজিবি, কোষ্টগার্ড নিজেদের মূল দায়িত্বের বাইরে গিয়েও যে পরিমাণ অবৈধ মাদক দ্রব্য উদ্ধার করে এবং এরসাথে জড়িতদের গ্রেফতার করে তার সিকিভাগও সাফল্য দেখাতে পারেন না একমাত্র দায়িত্বে থাকা নারকোটিকস। মাঝে মধ্যে কিছু কিছু ইয়াবা ও গাঁজা ব্যবসায়ীকে ধরেও তারা টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয় এমন অভিযোগও রয়েছে বিস্তর। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দু’একটি অভিযানের সামান্য সাফল্যের খবর তারা প্রচার করেন ঢাক ঢোল পিটিয়ে বিশাল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। টাকা খরচ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেদের সফলতা জাহির করে। এদিকে ভয়ঙ্কর সব মাদকের বিস্তার প্রসঙ্গে নারকোটিক্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মদপান বা মদের বারগুলোতে প্রবেশ সহজীকরণ করা হলে ভয়ঙ্কর মাদক সেবনে অনীহা চলে আসবে। কাজেই মদ সহজলভ্য করা উচিৎ।
২০২৫ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি এবং আরএমসিএলের পরিচালিত জরিপ মতে, দেশে মোট মাদকসেবীর সংখ্যা ৮,১৯৪,৬০৫ জন বা ৮২ লাখ। এটি মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। সে হিসেবে এটি মহামারীর দিকে যাচ্ছে। একজন ব্যক্তি একাধিক ধরনের নেশায়ও আসক্ত হতে পারেন। ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তারা ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে মাদক সেবন শুরু করেছেন। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী ৫৯ বছর বয়সে শুরু করেছেন। অর্ধেকের বেশি জানিয়েছেন তারা ২০ বছর বা তার আগেই নেশা শুরু করেছে। জরিপ মতে, ভয়ঙ্কর সব মাদক আসে দেশের বাইরে থেকে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে আসে। ভারত সীমান্ত দিয়ে ফেন্সিডিল ও গাঁজা ও হেরোইন এলেও ইয়াবা আসে টেকনাফের নাফ নদী হয়ে। যা মায়ানমারের তৈরি। কর্মকর্তারা জানান, আমাদের দেশে ইয়াবার কোনো কারখানার সন্ধান মেলেনি। জন্ম নিবন্ধন বড়ি দিয়ে বানানো ইয়াবা উদ্ধার হলেও সেটি আসলে ইয়াবার আদলে তৈরি। একমাত্র আমিন হুদার বাসার ভেতরে ইয়াবার কারাখানটি ছিলো অরিজিন্যাল।এদিকে নারকোটিক্স সূত্র মতে, মাদকের গডফাদার রয়েছে এটি সত্য। তবে তাদের অবস্থান সর্বদাই আড়ালে। ধরা পড়ে ছোটরা। সারাদেশে ছোট বড় মিলিয়ে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ মাদক বিক্রেতার সংখ্যা ২৩ হাজার। যদিও এ সংখ্যার হের ফের হয়। কারণ ত্রৈমাসিক জরিপ কালে এসব বিক্রেতার কেউ গ্রেফতার হন। কেউ জেলে থাকেন, কেউবা বিদেশে পালিয়ে যান। আবার কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বার লাইসেন্সের সংখ্যা ২৪৩টির মতো (যার মধ্যে হোটেল বার ১২৭টি, রেস্তোরাঁ বার ৬৪টি, ক্লাব বার ৪৮টি এবং রিসোর্ট বার ৪টি)। বিগত আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ মেয়াদকালে এর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি মদের বার ও মাদকের লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছিল। তবে চব্বিশের পট-পরিবর্তনের পর নতুন কোন লাইসেন্স দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছে অধিদফতর।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক (অপারেশ) মুকুল জ্যোতি চাকমা মঙ্গলবার বলেন, মাদকের বিস্তার যে পর্যায়ে পৌঁচেছে তা নিয়ন্ত্রণ করা আসলেই চ্যালেঞ্জিং। সবার আগে পরিবার থেকে দায়িত্ব নিতে হবে যাতে কোনো তরুণ-কিশোর মাদকের সংস্পর্শে না আসে। এরপর রাষ্ট্রীয় বিষয়। মাদকের সঙ্গে জড়িতরা যাতে সহজে মুক্তি না পায় সে বিষয়টি বিচার ব্যবস্থাকেও আমলে নিতে হবে। আইনজীবীদেরও ভূমিকা রয়েছে। যে সব ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদকের অনেক মামলা রয়েছে তার পক্ষে আদালতে ওকালতি না করা শ্রেয়। মাদকের সামাজিক বিস্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জেনেভা ক্যাম্পে সব সময় মাদক বিক্রি হয়। ক্যাম্পটির ভৌগোলিক অবস্থান,সেখানের বাসিন্দাদের সামাজিক মর্যাদা সব মিলিয়ে সেখানে অভিযান চালানো কষ্টকর। সরকারের উচিৎ আগারগাঁও বিএনপি বস্তির মতো জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে সেখানে সরকারি অফিস আদালত তৈরি করা। মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু একক কোনো সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার সমন্বিত উদ্যোগ। মাদকের করাল গ্রাসে সমাজ বিপর্যস্ত হলেও মূল হোতা বা গডফাদাররা অতীতে যেমন ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে, এখনো তেমনই আছেন।
এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অসাধু কর্মকর্তারাই মাদক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে নিজেরা অর্থনৈতিক সূবিধা নিচ্ছে। আবার মাদক মামলায় নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে বা আসামিকে মামলা থেকে বাদ দেয়ার কথা বলে বড় অঙ্কের ঘুষ নেয়া, জব্দকৃত মাদক ফেরত বা পরিমাণ কমানো: অভিযানে উদ্ধার করা ইয়াবা, ফেনসিডিল বা অন্যান্য মাদকের পরিমাণ কম দেখিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দেয়া কিংবা জব্দ করা আলামত সরিয়ে ফেলা, মাসিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।৩০ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সংক্রান্ত এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা আমাদের হাতে আছে। তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। এই অভিযান আরও তীব্র করা হবে।
গত ১১ আগস্ট রাজশাহী মহানগরীর দামকুড়া থানাধীন কাদিপুর গ্রামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) একটি অভিযানকে কেন্দ্র করে ১ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ, আসামি ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ ওঠে। রাজশাহী জেলা শাখার ‘খ’ সার্কেলের পরিদর্শক হেলাল উদ্দীনের নির্দেশনায় উপ-পরিদর্শক আল আমিনের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়। গত ১ অক্টোবর নওগাঁর বদলগাছীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক সহকারী উপপরিদর্শকের বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে এক নারী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১০ হাজারের পর আরও ৪০ হাজার টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ ওঠে। গত জুন মাসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) ১০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ, চাঁদা দাবি এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালকের (ডিজি) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ী ও লা পেসেতা ফ্যাশন অ্যান্ড ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক ফরহাদ বিল্লা রুবেল। জানা গেছে, দেশে মাদকের প্রবাহ রোধে কাজ করা সংস্থাটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রায় সময়েই বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হলেও বেশিরভাগ সময়েই সেই কমিটির প্রতিবেদন অন্ধকারেই থেকে যায়।