বিশ্বের শীর্ষ ৩০ অর্থনীতির একটি হতে পারে বাংলাদেশ - Alokitobarta
আজ : বুধবার, ৭ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
সাংবাদিকদের ওপর হামলায় গভীর উদ্বেগ ঢাকা মেট্রোপলিটন প্রেস ক্লাব সাংবাদিকদের ওপর হামলায় গভীর উদ্বেগ বাংলাদেশ অনলাইন সংবাদপত্র ও সাংবাদিক ইউনিয়ন সাংবাদিকদের ওপর হামলায় গভীর উদ্বেগ South Bangal Press Club -দক্ষিণবঙ্গ প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের ওপর হামলায় গভীর উদ্বেগ সাংবাদিক সুরক্ষা পরিষদের মাদকের বিস্তার এখন মহামারির পর্যায়ে,অভিযান শুধু বৈধ বারগুলোতে ভয়াবহতা ছড়াচ্ছে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অব্যবস্থাপনায় হয়রানি ভোগান্তি স্বার্থান্বেষী মহলের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের শিকার বিআইডব্লিউটি এর প্রকৌশলী মামুন উর রশিদ বরিশালের ‘বিউটি সিনেমা হল’ জমি ঘিরে কোটি টাকার বিরোধ রিকশাচালকের ব্যানারে ‘গুপ্ত’ আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ-যুবলীগ-শ্রমিক লীগ, মজদুর লীগ

বিশ্বের শীর্ষ ৩০ অর্থনীতির একটি হতে পারে বাংলাদেশ


বিশেষ প্রতিনিধি:বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং নানামুখী ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ তার টেকসই প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক রূপান্তরের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। এই সম্মেলন কেবল একটি আলোচনা সভা নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা ও প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিশেষজ্ঞদের ইতিবাচক মূল্যায়ন বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন -২০২৬’-এ দেশি-বিদেশি কূটনীতিবিদ,অর্থনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষকদের বক্তব্যে বাংলাদেশের এই ইতিবাচক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আলোচনায় উঠে এসেছে কিভাবে কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর কাতারে শামিল হওয়ার অভিমুখে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক ও বিভিন্ন শিল্পপণ্য। গতকাল রোববার এ প্রসঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধার এক আশাব্যঞ্জক চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ পণ্য যুক্তরাজ্যের বাজারে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বাজারে দেশের ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্য এই সুবিধা পেলেও এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী তিন বছরের রূপান্তরকালে তা অপরিবর্তিত থাকবে এবং পরবর্তীতেও পোশাক খাতসহ সিংহভাগ পণ্য এই সুবিধা অব্যাহতভাবে ভোগ করবে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য উন্নয়ন সহায়তা নির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে বাংলাদেশের সঙ্গে আধুনিক কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় উভয় দেশের যৌথ উদ্যোগ এবং যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিশাল বাংলাদেশি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবদান দুই দেশের সার্বিক মেলবন্ধনকে আরো মজবুত করছে। এই অংশীদারত্ব শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। ব্রিটিশ হাইকমিশনারের এই আশাব্যঞ্জক বার্তা বাংলাদেশের রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) একে কেবল দাতা-গ্রহীতার সম্পর্কে সীমাবদ্ধ না রেখে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদার হিসেবে মূল্যায়নের রূপরেখা প্রকাশ করেছে। ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের মতে, বঙ্গোপসাগরের অর্থনৈতিক কেন্দ্রের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করা বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম গতিশীল অর্থনীতি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এটি বিশ্বের শীর্ষ ৩০টি অর্থনীতির একটিতে পরিণত হওয়ার সামর্থ্য রাখে। এলডিসি উত্তরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ইইউ প্রথমবারের মতো উত্তরণ সম্পন্ন করেনি এমন কোনো দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাবনা যাচাই এবং উন্মুক্ত, স্থিতিশীল ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম রাষ্ট্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে একযোগে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং রাজনীতি ও নীতিপ্রণয়নে বৈশ্বিক মানদণ্ড বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশের এই রূপান্তর ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানান তিনি। ইইউ-এর এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের জন্য কেবল অর্থনৈতিক সুযোগ নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার একটি বড় সুযোগ। এই অংশীদারত্ব বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত করবে।

জাতীয় রূপরেখা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ লক্ষ্যমাত্রাও সুনির্দিষ্ট এবং আত্মবিশ্বাসী। দেশের প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের নতুন মাত্রা তুলে ধরে প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার টেকসই মডেলের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের অর্থনীতিকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার দূরদর্শী লক্ষ্যের ঘোষণা দিয়ে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সার্বিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। এই রূপরেখার সঙ্গে সংগতি রেখে দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারে কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, যার অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনশীলতার বিকাশ বাংলাদেশের বিশ্ব অর্থনীতিতে শীর্ষ অবস্থান অর্জন ও ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার মূল চাবিকাঠি হিসেবে ভূমিকা রাখবে। লক্ষ্যটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হলেও বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রগতির ধারা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন বিবেচনায় এটি অর্জনযোগ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ, মানবসম্পদের উন্নয়ন এবং অবকাঠামো আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই লক্ষ্য পূরণের পথ আরও সুগম হবে।

আঞ্চলিক মেলবন্ধন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান চিহ্নিত করেছেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান। তিনি উল্লেখ করেন, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার যথাযথ সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ আগামী দিনে এশিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত হবে, যা ২০৩০ সালের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে বিশাল সহায়ক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণ ও কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর গুরুত্বারোপ করে বলেন যে, বর্তমান কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ৩০টি অর্থনীতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত। তার এই মন্তব্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে এবং একই সঙ্গে সম্ভাবনার দুয়ারও উন্মুক্ত করেছে। সংস্কার ও সুশাসনের সমন্বয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতাসক্ষম হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতার বিষয়ে বৈশ্বিক গবেষণা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়নেও অভিন্ন ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যায়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন জোর দিয়ে বলেছেন যে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতিতে উন্নীত হবে এবং বিশ্বে দ্রুততম বর্ধনশীল তিনটি অর্থনীতির অন্যতম হিসেবে অবস্থান তৈরি করবে। এই ধরনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার প্রতি বৈশ্বিক আস্থারই প্রমাণ। এটি কেবল পরিসংখ্যানগত পূর্বাভাস নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভাবনার একটি বিশ্বাসযোগ্য চিত্র।

এছাড়াও, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এর ডেটার ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান গতিধারা বজায় থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জিডিপির আকার দাঁড়াবে ৬৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩২তম বৃহৎ অর্থনীতিতে উন্নীত হবে এবং একই সঙ্গে মালয়েশিয়া (৬৭২.৫ বিলিয়ন ডলার), ভিয়েতনাম (৬৬৭.৫ বিলিয়ন ডলার) ও থাইল্যান্ডের (৬৪৭.৫ বিলিয়ন ডলার) মতো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোকেও পেছনে ফেলে আঞ্চলিক অর্থনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে স্থান করে নেবে। এই তুলনামূলক চিত্রটি বাংলাদেশের অগ্রগতির গতি ও দিককে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা একটি অনুপ্রেরণাদায়ী উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও অগ্রযাত্রা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইতিবাচকভাবে গৃহীত হচ্ছে। কৌশলগত অবস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ, ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ ও সংস্কারের ধারাবাহিকতা বাংলাদেশকে আগামী দশকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অর্থনীতির দেশে পরিণত করার পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রা কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নয়, বরং একটি উন্নত, আত্মবিশ্বাসী ও সম্মানিত জাতি হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের প্রতীক। আগামী দিনগুলোতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর কেবল একটি স্বপ্ন নয়, বরং একটি বাস্তব অর্জনে পরিণত হবে বলে আশা করা যায়। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়ন কৌশলের ওপর অবিচল থাকলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে।

Top