নিয়ন্ত্রণহীন চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার,নিষ্ক্রিয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় - Alokitobarta
আজ : রবিবার, ৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
নিয়ন্ত্রণহীন চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার,নিষ্ক্রিয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গায়ে হাত তোলার দাবি, কিন্তু ঘটনাস্থলে নেই ক্যামেরা,মামলার এজাহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন বিএনপি ছেড়ে জামায়াতে যোগ দেয়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়েছে ৬ টাকার বিদ্যুৎ ১২ টাকায় ব্যয় ৩১টি কারিগরিভাবে নষ্ট,৬০ শতাংশ মেডিকেল অক্সিজেন প্ল্যান্ট অচল রোগীর পথ্য এখন বিলাসপণ্য শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ,বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্ব বিআরটিসির ডিজিএম আশরাফুল আলমের খুঁটির জোর কোথায় : প্রধানমন্ত্রী ও দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে কর্মক...

নিয়ন্ত্রণহীন চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার,নিষ্ক্রিয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়


বিশেষ প্রতিনিধি:সঠিক মনিটরিং,আইন-শৃংখলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও নেতৃত্বের অভাবেই নিয়মিত তল্লাশি এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির পরও কমছে না অবৈধ অস্ত্রধারীদের দাপট-চাঁদাবাজি।ফলে অবৈধ অস্ত্রের উৎস ও সরবরাহের নেটওয়ার্ক নিয়ে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।সারাদেশেই খুন, হত্যা চেষ্টা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার হলেও নেপথ্যে সরবরাহকারী, শ্যুটার ও কেনাবেচা চক্রের সদস্যরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।অন্যদিকে ফুটপাত, কাঁচাবাজার, বালুমহাল এবং ইন্টারনেট বা ক্যাবল সংযোগ, কলকারখানা, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিংমল থেকে চাঁদা তুলছে চাঁদাবাজরা। ছোট-বড় ব্যবসায় চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ নেয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। খুব কম ঘটনায় চাঁদাবাজির অভিযোগ থানায় যাচ্ছে, মামলা হচ্ছে। বেশির ভাগ ভুক্তভোগী প্রাণনাশের শঙ্কায় থানায় মামলা করছেন না। পুলিশের মধ্যে চেইন-অব কমান্ড ফিরিয়ে আনা এবং চাঁদাবাজি-খুনসহ নানা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সঠিক মনিটরিং ও দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মাঠ পর্যায়ের পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তাদের সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দূরত্ব স্পষ্ট। ফলে সরকারের সফলতা মøান হচ্ছে। এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজির মামলার ৮৫ শতাংশের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব মামলার চার্জশিটও জমা দিয়েছে পুলিশ। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক মামলার বিচার শুরু হয় না। সম্প্রতি ঢাকার ৫০টি থানার চাঁদাবাজি ও দখলসংক্রান্ত মামলার তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমনই চিত্র। এদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের এক পরিসংখ্যানে ঢাকায় প্রায় ১২৮০ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজদের নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে অস্ত্রধারী চাঁদাবাজ আছে ১৪৮ জন।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ঢাকায় বেপরোয়া চাঁদাবাজির নেপথ্য শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের শেল্টারেও চাঁদাবাজরা বেপরোয়া। তবে চিহ্নিত চাঁদাবাজরা এখন আর প্রকাশ্যে আসেন না। মূলত রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা মিলেমিশে চাঁদাবাজি করে। আর তাদের নির্দেশ পালন করেন কিশোর গ্যাং সদস্যরা। কারণ, চাঁদাবাজরা এখন অনেক কৌশলী। আইনের ফাঁকফোকরে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই এই বয়সে অপরাধ করলেও সহজে পার পাওয়া যায়। তাই চিহ্নিত চাঁদাবাজরা কিশোর গ্যাং সদস্যদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করাচ্ছে। এক্ষেত্রে সব ধরনের সহযোগিতা করছেন রাজনৈতিক নেতা ও সন্ত্রাসীরা। সাহস, অস্ত্র, এমনকি আইনি সহযোগিতা করছেন তারা।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাঁদাবাজিতে ঢাকায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে। চিহ্নিত চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণেই এসব নতুন মুখ আসছে। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে- অস্ত্রধারী চাঁদাবাজরা। কারণ, অস্ত্রধারীরা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদা চায়। চাঁদা না দিলে তারা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে সময় নেয় না। অস্ত্রের ভয়ে অনেকেই নীরবে চাঁদা তুলে দেয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে থানা পুলিশ থেকে শুরু করে আশপাশের মানুষরাও এ বিষয়ে জানতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে যখন চাঁদাবাজি দখলবাজি নিয়ে ঢাকায় একের পর এক ঘটনা ঘটছে তখন পুলিশ চিহ্নিত চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারছে না। পুলিশের কাছে চাঁদাবাজদের তালিকা থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, কোন এলাকায় চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধ বেড়ে গেলে কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা নিষ্ক্রিয় থাকেন। অন্যদিকে পুলিশ সদর দফতরসহ শীর্ষ কর্মকর্তারাও লোক দেখানো পরিদর্শন করে মিডিয়া ব্রিফিংয়ের মাধ্যমেই দায়িত্ব শেষ করছেন। ফলে আইন-শৃংখলা উন্নয়ন বা অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ আর হচ্ছে না। সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র মাঠে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশ দীর্ঘ সময় ধরে ছিনতাইকারী বা চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করল, তালিকা অনুযায়ী কাউকে কাউকে অভিযানের মাধ্যমে গ্রেফতারও করেছে। কিন্তু এই অপরাধের সুবিধাভোগী যারা তাদের তালিকা কিন্তু কখনোই হয় না। আবার যাদের তালিকা তৈরি করা হলো, সবাইকে যদি গ্রেফতার বা আইনের আওতায় আনা সম্ভব না হয়, কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো, কারো বিরুদ্ধে হলো না, এই ধরনের দৃষ্টান্ত বা উদাহরণ তৈরি করে কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

সূত্র মতে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যখন চাঁদাবাজি ও দখল নিয়ে শোরগোল চলছে ঠিক এমন এমন সময়েই আগ্নেয়্স্ত্রা দিয়ে এক যুবকের মাথায় আঘাত করে আলোচনায় এসেছে বহিষ্কৃত যুবদল নেতা ফেরদৌস আহমেদ সাইমন। রাজধানীর বাংলামোটর ও নিউ ইস্কাটন রোড এলাকার ত্রাস সাইমুন শুধু একজনকে অস্ত্রদিয়ে আঘাতই করেননি। ঘটনার সময় সে একাধিক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ঘটনার পর দ্রুত পুলিশ ও এসআরবি সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা সময় লাগে তাকে গ্রেফতার করতে। ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী সোহানের দায়ের করা মামলায় সাইমুন ও তার দুই সহযোগী গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে পুলিশের রিমাণ্ডে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ হেফাজতে থাকাবস্থায়ও সে পুলিশসহ স্থানীয় একাধিক ব্যক্তিকে হুমকি দিয়েছে। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরই মধ্যে ভাইরাল হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃত সাইমন চাঁদাবাজ ও অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করতো। গত ১০ দিনের ব্যবধানে মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, আদাবরের শ্যামলী হাউজিং, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান ও মিরপুরের ইসিবি চত্বরসংলগ্ন একটি আবাসন প্রকল্পে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর সঙ্গে রয়েছে আশুলিয়ার একটি মাদরাসায় হামলার অভিযোগ এবং মিরপুরে ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। ঘটনাগুলোর কারণ ভিন্ন। কোথাও সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ, কোথাও চাঁদা দাবির অভিযোগ, কোথাও আবার সরকারি উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘাত। তবে আগাম ঝুঁকি শনাক্তকরণ কতটা কার্যকর, খবর পাওয়ার পর পুলিশের সাড়া কতটা দ্রুত এবং দখলমুক্ত বা বিরোধপূর্ণ স্থানে পরবর্তী নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

জানতে চাইলে মানবাধিকার কর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, রাজধানীতে কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে যা, অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এত বড় জমায়েত, প্রস্তুতি ও সংঘবদ্ধতার বিষয়গুলো আগাম আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় আসেনি কেন এ প্রশ্নের স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তিনি বলেন, দখল, উচ্ছেদ ও হামলার আতঙ্ক নাগরিকের স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপত্তাবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে উচ্ছেদ, দখল বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে পারে না। এসব ঘটনায় কারা জড়িত, কীভাবে সংগঠিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনও পর্যায়ে দায়িত্বে ঘাটতি ছিল কি না— তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি। “রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ঘটনার পর ব্যবস্থা নেয়া নয়; আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।”

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওসমান গনি বলেন, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার ঘটনায় পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে। মামলা হয়েছে, আসামি গ্রেফতার এবং একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা সমাজ থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, এ কথা বলা যাবে না। তবে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। একটি ঘটনার পর সারা রাত অভিযান পরিচালনা করেছি, পরে মোহাম্মদপুর থেকেও আসামি গ্রেফতার করা হয়েছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।

সম্প্রতি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর আওয়ামীপন্থি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট রাতারাতি উধাও হয়ে যায়। কিন্তু একদিনের জন্যও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। বরং আওয়ামী লীগশূন্য ফাঁকা মাঠে সহজেই দখল প্রতিষ্ঠা করে বিএনপিপন্থি হিসাবে পরিচিত একশ্রেণির অসাধু রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং পেশাদার অপরাধীচক্র। এমনকি জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং ছাত্রনেতা পরিচয়েও নতুন করে চাঁদাবাজি শুরু হয়। চাঁদাবাজির ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ৭ জানুয়ারি স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা উত্তর সিটি ইউনিটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা স্থায়ীভাবে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং অপরাধীদের গ্রেফতার দাবিতে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন। কিন্তু অদ্যাবধি অবস্থার কোনো হেরফের হয়নি। বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী পরিচয়ে দুর্বৃত্তদের আনাগোনা এবং ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি আরো বেড়েছে।

Top