পুলিশের শীর্ষ ১০০ কর্মকর্তার মধ্যে একজন নারী
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা :শীর্ষ তিনটি পদে ১০০ কর্মকর্তার মধ্যে নারী মাত্র একজন। কর্মরত মোট সদস্যের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান সদস্য সংখ্যা এক লাখ ৯৬ হাজার ১২৬। মহাপরিদর্শক থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত ১৮টি পদের চারটিতে কোনো নারী নেই।পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের এক লাখ ৯৬ হাজার ১২৬ জন সদস্যের মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৭৮ হাজার ২১৩ জন। নারী ১৭ হাজার ৯১৩ জন। অর্থাৎ, সদস্যদের মধ্যে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ নারী।পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে দায়িত্বে আছেন একজন। অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতি. আইজিপি-গ্রেড ১) পদে আছেন দুজন। অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড ২) পদে ১৬ জন এবং চলতি দায়িত্বে আরও একজন রয়েছেন। ডিআইজি (গ্রেড-৩) পদের ৭৮ জনের মধ্যে আছেন মাত্র একজন নারী। ডিআইজি পদে সুপারনিউমারারি হিসেবে আছেন আরও দুজন পুরুষ সদস্য। অর্থাৎ, শীর্ষ এই তিন পদে কর্মরত ১০০ জনের মধ্যে নারী মাত্র একজন।
বিসিএসে নিয়োগ পাওয়া পুলিশের এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব সব পদে বর্তমানে কর্মরত দুই হাজার ৬৪৭ জন। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৩০৩, যা শতাংশের হিসাবে ১১ দশমিক ৪৪। কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদে মোট সদস্য এক লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৯ জন। এর মধ্যে নারী ১৭ হাজার ৬১০, যা শতাংশের হিসাবে ৯ দশমিক ১।
অতিরিক্ত ডিআইজি ১৬৩ জনের মধ্যে নারী পুলিশ সদস্য রয়েছেন ১৭ জন। অতিরিক্ত ডিআইজি পদে চলতি দায়িত্বে ১০ জনের মধ্যে নারী একজন। একই পদে সুপারনিউমারারি হিসেবে ১০৩ জনের মধ্যে নারী ১৫ জন। পুলিশ সুপার (এসপি) পদে কর্মরত ৪৬২ জনের মধ্যে নারী ৫৪ জন। আর এই পদে সুপারনিউমারারি হিসেবে ৭১ জনের মধ্যে ২১ জন নারী রয়েছেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে ৮৭১ জনের মধ্যে নারী ১৩৯ জন। সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে ৮৪৬ জনের মধ্যে নারী ৫৫ জন।
৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেশ কয়েকজন নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি পদের নারী কর্মকর্তাও রয়েছেন। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে সাত নারী অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।
এসআই থেকে পরিদর্শক– চার পদে নারী নেই
পরিদর্শক (টিটি), পরিদর্শক (সশস্ত্র), টিএসআই, এসআই (সশস্ত্র) পদে পাঁচ হাজার ১৮১ জনের মধ্যে কোনো নারী নেই।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পর্যন্ত বিভিন্ন পদে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে পরিদর্শক (নিরস্ত্র) চার হাজার ৭১৯ জনের মধ্যে নারী ১২৮ জন। পরিদর্শক (টিটি) পদে কর্মরত ৯৮৪ জন এবং পরিদর্শক (সশস্ত্র) পদে ৮৩৬ জন। এ দুই পদে কোনো নারী নেই। উপপরিদর্শক (এসআই, নিরস্ত্র) পদে ১৯ হাজার ২০৪ জনের মধ্যে নারী ৯৯৮ জন। সার্জেন্ট পদে দুই হাজার ২৫ জনের মধ্যে নারী ৯২ জন। বর্তমানে ৮৫ জন শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট রয়েছেন। টিএসআই পদে ৪৪৬ জন এবং এসআই (সশস্ত্র) দুই হাজার ৯১৫ জনের মধ্যেও কোনো নারী নেই।এ ছাড়া সহকারী উপপরদির্শক (এএসআই, নিরস্ত্র) ২০ হাজার ৬৩৮ জনের মধ্যে নারী এক হাজার ৪২৭ জন। এটিএসআই পদে দুই হাজারের মধ্যে নারী ২১ জন। এএসআই (সশস্ত্র) ছয় হাজার ৮৫৭ জনের মধ্যে নারী ১৮৯ জন। সাত হাজার ২০ জন নায়েকের মধ্যে নারী ৫২৭ জন। এক লাখ ২৫ হাজার ৭৫০ জন কনস্টেবলের মধ্যে নারী ১৪ হাজার ২২৮ জন।
পুলিশে নারীর আনুষ্ঠানিক যাত্রা ১৯৭৪ সালে
বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন্স নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশে নারীর আনুষ্ঠানিক যাত্রা ১৯৭৪ সালে। সেই বছর স্পেশাল ব্রাঞ্চে ১৪ নারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে সাতজন উপপরিদর্শক (এসআই) এবং সাতজন কনস্টেবল ছিলেন। অর্থাৎ, পুলিশের এসআই ও কনস্টেবল– দুই পদে নারীদের প্রথম নিয়োগ হয়। এর পর ১৯৭৬ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো ইউনিফর্মধারী নারী পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই দফায় ১৫ নারী সদস্য নেওয়া হয়েছিল।
১৯৮৬ সালে পঞ্চম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের মাধ্যমে এএসপি হিসেবে নারীদের প্রথম নিয়োগ দেওয়া হয়। ফাতেমা বেগম দেশের প্রথম নারী বিসিএস পুলিশ ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম নারী অতিরিক্ত আইজিপি ছিলেন। ২০১৩ সালের অক্টোবরে তাঁকে ডিআইজি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তিনি পুলিশ সদরদপ্তরে অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে অবসর নেন। এর পর রৌশন আরা বেগম ২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান। ২০১৯ সালে কঙ্গোয় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
পুলিশে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে কোটা ও লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হয়েছিল। ২০১৮ সাল পর্যন্ত কোটা পদ্ধতিতে নিয়োগও দেওয়া হয়। তবে ২০১৮ সালে নিয়োগে কোটা পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়।২০১১ সালে জনপ্রশাসনে জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বাংলাদেশ-বিষয়ক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশে এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পর্যায়ে নারীদের জন্য ১০ শতাংশ এবং কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদে ১৫ শতাংশ নিয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০১৬ সালে তৎকালীন সংসদে জানানো হয়, নারী এসআই নিয়োগে ১০ শতাংশ কোটা অনুসরণ করা হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশ (আইএডব্লিউপি) সেন্ট্রাল ও সাউথ এশিয়া কো-অর্ডিনেটর এবং ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, নারী এসআইর সংখ্যা কম হওয়ায় প্রতিটি থানায় সব ক্ষেত্রেই হয়তো নারী তদন্ত কর্মকর্তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে প্রতিটি থানাতেই নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী সার্ভিস ডেস্ক রয়েছে, যেখানে নারীরা নির্ভয়ে তাদের বিষয়গুলো বলতে পারেন।
নারী পুলিশ সদস্য কম থাকার বিষয়ে শামীমা পারভীন বলেন,কোটা পদ্ধতি না থাকায় নারীরা কাজের ধরনসহ নানা কারণে আসতে পারছেন না বা আসছেন না। তবে নারী সদস্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়োগ হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বলেন,আমাদের দেশে নারীদের নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি পুরুষের নিশ্চিত করার মানসিকতা রয়েছে। তাই নিরাপত্তা বাহিনীর কাজে নারীদের জন্য চিন্তা করা হয়নি।এসব সেক্টরে অনেক দেরিতে নারীরা যুক্ত হয়েছেন। এখনও নারীরা এসব কাজে যুক্ত না হওয়ার পেছনে আমাদের সমাজের মানসিকতা দায়ী। তাই নারীদের শুধু নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে সম্মান দেওয়া ও আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন দরকার। তাহলে এসব পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে।
বাংলাদেশ পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন,পুলিশে ক্যাডার অফিসারের সংখ্যা আগের তুলনায় বাড়ছে। তবে মাঠ পর্যায়ের পদগুলোতে নারী পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা কম। আমাদের দেশের সামাজিক কাঠামোর কারণেই হয়তো অনেকে এই পেশায় আসেন না।