আটকা পড়েনি ভয়ংকর অপরাধী‘বিশেষ’ অভিযানে ও - Alokitobarta
আজ : সোমবার, ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আটকা পড়েনি ভয়ংকর অপরাধী‘বিশেষ’ অভিযানে ও


মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:সাধারণ রুটিন অভিযান ও বিশেষ অভিযান। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার হয় ১৪ হাজার ৪৯৮ অপরাধী। উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ মাদক ও অস্ত্র। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ৩৬ হাজার ৮০৪ জনকে সুনির্দিষ্ট মামলা ও ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনা হয়। এছাড়া জুনের প্রথম ১৩ দিনে গ্রেফতার করা হয়েছে ২০ হাজারের বেশি আসামি।মে মাসে সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করে ৫১ হাজার ৩০২ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।অভিযান ছিল দুই ধরনের।

কাগজে-কলমে এই পরিসংখ্যানকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিশাল ‘সাফল্য’ দেখালেও বাস্তবতা ভিন্ন। অভিযান যত জোরালোই হোক না কেন প্রকৃতপক্ষে আড়ালেই থেকে গেছে ‘বিশেষ’ অভিযানের টার্গেটকৃত অপরাধীরা। ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী, মাদকের গডফাদার কিংবা শীর্ষ চাঁদাবাজদের স্পর্শই করতে পারেনি পুলিশ কিংবা অন্য সংস্থা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জালে আটকা পড়ে কিছু ‘চুনোপুঁটি’ মাদকের খুচরা কারবারি, ছিঁচকে ছিনতাইকারী বা তাদের সহযোগীরা। ফলে এ অভিযানের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন ‘নরম’ অভিযানের কারণে নিয়ন্ত্রণে আসছে না দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।

সূত্র জানায়, বিশেষ অভিযান চলাকালে মে মাসে মামলা হয়েছে ১৮ হাজার ১৪৯টি। এর মধ্যে খুনের ঘটনায় মামলা হয় ৩১০টি। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় এক হাজার ৯৫২টি, অপহরণের ঘটনায় ৯০টি। অভিযান পরিচালনার সময় পুলিশ আক্রান্ত হয়েছে ৫৫টি ঘটনায়।

বিশেষ অভিযানের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ছোটখাটো চোরাকারবারি ও খুচরা মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার হয়েছে ১০ হাজার ২৭১ জন। এর মধ্যে মাদকসংশ্লিষ্টতায় ৯ হাজার ৪৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৮৭ পিস ইয়াবা, ৪ হাজার ২১৫ গ্রাম হেরোইন, ২১ লিটার ফেনসিডিল, ৪ হাজার ২৮৮ লিটার বিদেশি মদ, ১১ হাজার ৭৮৬ লিটার দেশি মদ, ৫ হাজার ৩৯৩ কেজি গাঁজা এবং অন্য মাদক দ্রব্য উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছে ৬ হাজার ৪০৪টি। এছাড়া ছিনতাই, দস্যুতা ও ডাকাতির অভিযোগে ১ হাজার ৮৩১ জন এবং চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ৬৮৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

জুনের প্রথম ১৩ দিনে মাদকদ্রব্যসহ গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার জনকে। কিন্তু টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া-যাদের ইশারায় এসব মাদক দেশের অভ্যন্তরে ঢুকছে, মাদকের সেই ‘গডফাদার’ বা সিন্ডিকেট প্রধানদের কারও টিকিটিও স্পর্শ করতে পারেনি পুলিশ। গ্রেফতার হওয়া ১৩ হাজারের বেশি ‘মাদক ব্যবসায়ী’ আসলে মূল অপরাধী চক্রের একদম শেষ প্রান্তের সদস্য-কুলি বা বাহক। যারা সামান্য টাকার বিনিময়ে ঝুঁকি নেয়।

পুলিশের দাবি, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার অংশ হিসাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী, পরিকল্পনাকারী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। মে মাসজুড়ে অভিযানে এমন ৯৭৬ জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। যারা মূলত কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ১০৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি ২৫২ জন অবৈধ অস্ত্রধারীকে গ্রেফতার করা হয়।

ইউনিট ভিত্তিক গ্রেফতারের তালিকায় এগিয়ে ছিল ঢাকা রেঞ্জ ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ঢাকা রেঞ্জে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫৮৭ জন এবং ডিএমপি এলাকায় ২ হাজার ১৪৭ জনকে ধরা হয়। এর পরেই রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ। যেখানে গ্রেফতার করা হয় ২ হাজার ১২২ জনকে। এছাড়া চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ৮৯৮ জন, খুলনা রেঞ্জে ১ হাজার ৪৯২ জন, রাজশাহী রেঞ্জে ৭২০ জন, রংপুর রেঞ্জে ৮৯৪ জন, বরিশাল রেঞ্জে ৫৫৬ জন, সিলেট রেঞ্জে ৪৫৩ জন এবং ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৮০৩ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ মূলত রাস্তার মোড়ের খুচরা ছিনতাইকারী, মাদক বহনকারী বা চুনোপুঁটিদের ধরে হাজতে ভরেছে। অথচ এই অপরাধীদের যারা নিয়ন্ত্রণ করে, সেই মূল পরিকল্পনাকারী বা গডফাদারদের আইনের আওতায় আনার নজির গত প্রায় দেড় মাসের বিশেষ অভিযানে দেখা যায়নি। গত দেড় মাসের বিশাল পরিসংখ্যানের খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ কমেনি।

অভিযানে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ৬৮৮ জনকে গ্রেফতার দেখানো হলেও, যারা ঢাকার বিভিন্ন কাঁচাবাজার, পরিবহণ সেক্টর, কিংবা শিল্পাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি করছে, সেই চাঁদাবাজ বা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাউকে এই তালিকায় দেখা যায়নি। চলমান বিশেষ অভিযানের প্রথম মাসে পেনগান থেকে শুরু করে এসএমজি বা পিস্তলের মতো অত্যাধুনিক ১০৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হলেও এগুলো যারা আমদানি করছে বা মূল অর্থায়ন করছে, তারা পর্দার আড়ালেই রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যতদিন পর্যন্ত বড় ধরনের সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ আর গডফাদারদের কোমরে দড়ি পরানো না যাবে, ততদিন এই হাজার হাজার চুনোপুঁটি গ্রেফতার কেবলই সংখ্যার খেলা। এক প্রকার সাময়িক আইওয়াশও বটে। অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে হলে পুলিশকে চুনোপুঁটি শিকারের জাল ছিঁড়ে রাঘববোয়ালদের ডেরায় আঘাত হানতে হবে।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলেন, অপরাধীদের গডফাদাররা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের মতাদর্শকে আর্নিং সোর্স বা আয়ের উৎস হিসাবে বেছে নিয়েছে। ফলে তারা কেউই ধরা পড়ছে না। কারণ তারা ক্ষমতাগোষ্ঠীর কাছাকাছি থাকে। ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে পেশাদার অপরাধীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটায়। তারা মূলত গডফাদার। যদি তাদের আইনের আওতায় আনা না যায় তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, মাদকের গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে নতুন কৌশলে এগোচ্ছি। তারা মানি লন্ডারিংয়ে জড়িত। এ আইনে মামলা করে তাদের গ্রেফতার করা হবে। চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা যখনই কোনো ঘটনা ঘটাচ্ছে তখনই দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। যেসব অপরাধী বাইরে আছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

Top