বিরোধী দলের ওয়াকআউট ,সমঝোতাভঙ্গের অভিযোগ
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ অনুমোদন নিয়ে বিকালে বিতর্কের সূচনা হয়।সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করেন।অধ্যাদেশটি হুবহু অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি।কিন্তু সেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে এমন তিনটি সংশোধনী এনে বিল পাশ করা হয়েছে।এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি করা হয়েছিল। সেখানে ৯৮টি অধ্যাদেশ সম্পর্কে আমরা ঐকমত্য পোষণ করেছিলাম যে, সেগুলো ‘অ্যাজ ইট ইজ’ (যেভাবে আছে) সংসদে বিল আকারে আসবে এবং পাশ হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিলটিও সেই তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল।সরকারি দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমঝোতা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ এনে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। শুক্রবার সন্ধ্যায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশগুলোর অনুমোদন নিয়ে সরকারি দলের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনেন।কিন্তু আজ বিলটি উত্থাপনের মাত্র আধা ঘণ্টা আগে একটি সংশোধনী দেওয়া হলো। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক সমঝোতা ও ‘কনসেনসাস’ ভঙ্গ করা হলো। তিনি বলেন, সরকারি দল চাইলে যে কোনো বিল পাশ করতে পারে, তাদের সেই মেজরিটি আছে। কিন্তু এই বিশেষ কমিটি করার তবে প্রয়োজন কী ছিল। যদি আমাদের কথা বলার সুযোগই না দেওয়া হয়, তবে এই সংসদ আর জনস্বার্থ রক্ষা করবে কীভাবে। দিনদুপুরে একটা ছলচাতুরী ও জোচ্চুরির মাধ্যমে এই বিলের সংশোধনী পাশ করে নেওয়া হয়েছে।জবাবে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রয়োজনে পরে এ বিলটি আবার সংশোধন করা যাবে। বিষয়টি নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সঙ্গে বিতর্কের একপর্যায়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সংসদ-সদস্যরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে উত্থাপন করা হয় সংসদে। বিলে সংস্কৃতিমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে এ জাদুঘরের পর্ষদের সভাপতি করা এবং জনস্বার্থে সরকারকে যে কোনো সময় যে কোনো সদস্যের মনোনয়ন বাতিলের ক্ষমতা যুক্ত করা হয়। এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি হুবহু সংসদে অনুমোদন করার সুপারিশ করেছিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। অধ্যাদেশটি সংসদে হুবহু ঠিক রেখেই বিল আনা হয়েছিল। তবে এ বিলে তিনটি সংশোধনী প্রস্তাব দেন সরকারি দলের সদস্য আনিসুর রহমান। তার তিনটি সংশোধনী প্রস্তাবই গৃহীত হয়। সংশোধনী আনার প্রস্তাব দেওয়ার পর বিরোধী দলের সদস্যরা এতে আপত্তি জানান। তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার এই পর্যায়ে এসে এভাবে আপত্তি জানানোর সুযোগ নেই। বিরোধী দলের সদস্যদের আগেই সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া উচিত ছিল। পরে সরকারি দলের সদস্যের আনা সংশোধনী প্রস্তাব তিনটিই গ্রহণ করা হয় এবং কণ্ঠভোটে বিলটি সংসদে পাশ হয়।
অধ্যাদেশে পর্ষদের সভাপতির বিষয়ে বলা ছিল, সরকার নির্ধারিত শর্তে নিযুক্ত শিক্ষা, ইতিহাস, সাহিত্য বা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কোনো প্রথিতযশা বিশেষজ্ঞ একজন ব্যক্তি পর্ষদের সভাপতি হবেন। এখানে সংশোধনী এনে সংস্কৃতিমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে পর্ষদের সভাপতি করার বিধান করা হয়েছে। অধ্যাদেশে বলা ছিল, পর্ষদের কোনো সদস্য যে কোনো সময় সরকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারবেন। এখানে সংশোধনী এনে বলা হয়েছে, পর্ষদের কোনো সদস্য বা সভাপতি যে কোনো সময় সরকারের উদ্দেশে পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারবেন। অথবা সরকার জনস্বার্থে যে কোনো সময় যে কোনো সদস্যের মনোনয়ন বাতিল করতে পারবে। অধ্যাদেশে বলা আছে, পর্ষদের সভাপতি মনোনয়নের তারিখ থেকে তিন বছর পদে থাকবেন এবং অনধিক এক মেয়াদের জন্য পুনঃমনোনয়নের যোগ্য হবেন। এটা বাদ দেওয়ার জন্য সংশোধনী প্রস্তাব দেন সরকারি দলের ওই সদস্য। এটিও গৃহীত হয়।
অধ্যাদেশগুলো অকার্যকর করার কূটকৌশল নিয়েছে : ওয়াকআউটের পর রাতে প্রেস ব্রিফিংয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো সরকারি দল ইচ্ছাকৃতভাবে অকার্যকর করার কূটকৌশল নিয়েছে। গণভোটে পাশ হওয়া গণরায়কে অগ্রাহ্য করে তারা জনগণকে অপমান করেছে। তিনি বলেন, সরকারের সুবিধামতো বিলগুলো তারা একের পর এক এনেছে শেষ মুহূর্তে। আমাদের সেগুলো পড়ে দেখার সময় দেওয়া হয়নি। তারপরও তাদের প্রতি আস্থা রেখে বিলগুলো পাশ করতে তাদের সহযোগিতা করেছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে তাদের দেওয়া ওয়াদাও তারা রাখেনি। কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যদের মতামতের সুযোগ না দিয়ে অধ্যাদেশ সংশোধন করা হয়েছে। আবার সংশোধিত বিল পাশ করার আগে আপত্তি জানানোর কথা বিরোধী দলের। সেখানে আমরা অবাক হয়ে দেখলাম সরকারি দলের একজন সদস্যের অনেকগুলো আপত্তি উত্থাপিত হলো এবং তা গ্রহণও করে নেওয়া হলো। যে সংশোধনী সম্পর্কে আমরা কিছু জানতেও পারলাম না। তাহলে আমাদের এই সংসদে থাকার দরকার কী? এজন্য আমরা ওয়াকআউট করেছি।
সরকার বিশ্বাস হারিয়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, তারা আমাদের শিশু ভেবে কমলালেবু দেখাচ্ছে। দুদক, পুলিশ, গুম, পিএসসি, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিলগুলো তারা ইচ্ছাকৃতভাবে রেড লাইনে ফেলে অকার্যকর করার কূটকৌশল নিয়েছে। যেসব অধ্যাদেশ পাশ হলে সরকার আর ফ্যাসিস্ট হবে না সেসব অধ্যাদেশ তারা অকার্যকর করছে। তার অর্থ হলো তারা ফ্যাসিস্টের পথে হাঁটছে। তারা নিজেদের কথাই নিজেরা রাখেনি। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জুলাই সনদ পাশ না করে তারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, জনগণকে অপমান করেছে। জনগণের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের বিজয় শিগ্গিরই আসবে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, হুইপ রফিকুল ইসলাম খানসহ জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সময়মতো বিলের কাগজ না পাওয়ার অভিযোগ বিরোধী দলের : সময়মতো বিলের কাগজ না পাওয়ায় এদিন বিরোধী দল স্পিকারের কাছে অভিযোগ করে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিন দিন আগে আমাদের ডকুমেন্টগুলো দেওয়ার কথা। সমস্যা, বাস্তবতা সবগুলো কনসিডার করে বলা হয়েছিল মিনিমাম একদিন আগে দেওয়া হবে, এনশিওর করা হবে। আমি তো অর্থনীতির ছাত্র না। এতগুলো ডকুমেন্ট এখানে আসার পর আমাদের দেওয়া হয়েছে। একদিকে সংসদ চলছে, আরেকদিকে ডকুমেন্টগুলো রেখে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু দুর্বল ছাত্র এজন্য এখন ওপরে হাত তুলব, না নিচে নামাব-এটাও বুঝতে পারি না। এখন যদি সংসদ-সদস্য হিসাবে কিছু না বুঝে হ্যাঁ বলি এটা হবে অপরাধ, যদি না বুঝে নাও বলি এটাও হবে অপরাধ। এজন্য আমরা চুপ থেকেছি। আমাদের অবস্থান এখন তাই।’
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি এসব কর্ম নির্ধারণ করছে। আইনগুলো পর্যালোচনা করার জন্য সংসদে বিশেষ এই কমিটিতে আমাদের সংসদ-সদস্য জয়নাল আবদিন সাহেব সভাপতি ছিলেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন সদস্য ছিলেন। আইনমন্ত্রীসহ সবাই এটা আলোচনা পরিচালনা করে যেসব অধ্যাদেশ সর্বসম্মতিক্রমে অ্যাজ ইট ইজ পাশ করার জন্য ডিসাইডেড হয়েছে, তার মধ্যে এই বিলটাও ছিল। কিছু বিল নোট অব ডিসেন্ট ছিল, আলোচনার দাবি রেখেছিলেন বিরোধীদলীয় সদস্য। সেটি ইতোমধ্যে দুই মিনিটের জায়গায় ১০ মিনিট, ১৫ মিনিট যেভাবে উপযুক্ত মনে করেছেন আলোচনার জন্য দিয়েছেন। বিল পাশ হয়ে যাওয়ার পর এখন যদি বলেন, আমি কিছু বুঝলাম না, যদি আপত্তি দিতেই হতো উত্থাপনের পর তারপর সেকেন্ড রিডিংয়ে বিবেচনার সময় তো!
এ সময় জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বিশেষ কমিটির কথা। বিশেষ কমিটিতে এ আলোচনা হয়নি যে, যখন সংসদ চলবে তখন টেবিলে টেবিলে বিলগুলো হাজির করা হবে। এটা তো তিন দিন আগেই দেওয়ার কথা ছিল। যেগুলো আপত্তি আমরা জানিয়েছি ওটা ছাড়াও এই বিলগুলোর ব্যাপারে সংসদে কথা বলার সুযোগ আছে। সুতরাং আমাদের কথা বলার অধিকার আছে। এ সুযোগ থাকা উচিত ছিল আর কী।’
এ পর্যায়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘মাননীয় সদস্য বলেছেন সবগুলো উপস্থাপনের কথা ছিল। সো আমি ওই বিশেষ কমিটির সদস্য হিসাবে এটা রিকালেক্ট করতে পারি না। আমার মনে হচ্ছে না যে, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত ছিল। দ্বিতীয়ত, আর্টিকেল ৯৩ অব দি কনস্টিটিউশন, সেখানে বলা আছে তিনটা অপশন। নম্বর ওয়ান ৩০ দিনের মধ্যে বিল উপস্থাপন করতে হবে। সব ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো আপনাদের সামনে আনতে হবে। আমরা এনেছি। নম্বর টু অপশন হলো-আমরা কোনটা উত্থাপন করব। যদি কোনোটা উত্থাপন না করি, তাহলে সেটা ল্যাপস হবে। যেটা উত্থাপন করা হবে সেটার আবার দুটি ফ্যাক্ট আছে। এক বিল আকারে অনুমোদন হবে অথবা অনুমোদন হবে না। শব্দগুলো এভাবে দেওয়া আছে। তো যেগুলো উপস্থাপন করা হবে না ওখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে সেগুলো আমরা উপস্থাপন করিনি। ওগুলোর ওপর আলোচনার সুযোগ রুলস অব বিজনেস এবং আর্টিকেল ৯৩-তে নেই। যেগুলো আমরা উপস্থাপন করেছি সেগুলো বিল আকারে যেটা পাশ হয়েছে। যদি কোনোটা পাশ না হতো তাহলে ওইটা অননুমোদন হিসাবে গণ্য হয়ে সাইডলাইনে চলে যেত। এটা হলো আর্টিকেল ৯৩ রেড উইথ সংসদের যে কার্যপ্রণালি বিধি আছে সেটা। আমরা আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটাইনি।’
জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমি তো বিশেষ কমিটিতে ছিলাম না, আমি বলতে পারব না। যারা ছিলেন তারা এটা এক্সপ্লেইন করবেন। কিন্তু আপনার সভাপতিত্বে আমরা যখন কার্য উপদেষ্টা কমিটির মিটিং করি তখন এ বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। আলোচনার পর দুটি জিনিস একেবারেই স্পষ্ট হয়েছে আমি যেটা বলেছি। একটা হলো-সবগুলো বিল আসবে। দুই নম্বর হলো-মিনিমাম একদিন আগে আমাদের ডকুমেন্টগুলো দেওয়া হবে। এই দুইটার বাইরে আপনি কোনো রুলিং দেননি। তিন নম্বর হলো-আমি একান্ত শ্রদ্ধা রেখে বলব যারা বিশেষ কমিটির সদস্য ছিলেন তারা খুবই বিজ্ঞ, তারা সরকারি দল থেকেও ছিলেন, বিরোধী দল থেকেও ছিলেন। তাদের রায় যদি চূড়ান্ত হয়ে থাকে তাহলে আর এখানে কাগজপত্রেরও দরকার নেই। তাতে আমাদের যে অধিকার, শুধু অধিকার না দায়িত্বের যে বিষয়টা আছে সেটা পালন হবে কীভাবে।’
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার প্রত্যেকটা বিল উত্থাপনের পর এ কথাগুলো বিরোধীদলীয় নেতা বলতে পারতেন। আপনি যেমন উত্থাপনের অনুমতি দিচ্ছেন তখন ইউ হ্যাভ অলরেডি কন্ডন দি টাইম। এটাই হচ্ছে মাননীয় স্পিকার রুলস অব প্রসিডিউর।’
শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, মাননীয় বিরোধী দলের নেতা যে কথাগুলো বলেছেন, আমিও তার সঙ্গে একমত। অ্যাকচুয়ালি বিল শেষ মুহূর্তে পেলে এটার ওপর আলোচনা করা ডিফিকাল্ট। কিন্তু এই যে সিচুয়েশনটা হলো, এটার প্রধান কারণ হলো যে আজকের মধ্যে আমাদের বিলগুলো ফাইনালাইজ করতে হবে। পাশ করতে হবে। এই টাইম লিমিটের কারণে ৩০ দিন না হলে তো আমরা আরও ১৫ দিন বা এক মাস সময় নিতে পারতাম।