৭৩টি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে ২৫ কোটি টাকার ঋণ - Alokitobarta
আজ : বৃহস্পতিবার, ৫ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

৭৩টি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে ২৫ কোটি টাকার ঋণ


জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর শাখায় ৭৩টি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে ২৫ কোটি টাকার ঋণ সৃষ্টি হয়েছে। একই শাখার আরেক কর্মকর্তার পাসওয়ার্ড চুরি করে বের করা হয় এ টাকা।সরকারি মালিকানার বিশেষায়িত ব্যাংকটির দুই শাখায় এভাবে প্রায় ২৬ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ধরা পড়েছে।এদিকে চট্টগ্রামের পথেরহাট শাখায় এক প্রবাসী গ্রাহকের আমানত রসিদ নকল করে তা বন্ধক হিসেবে রেখে নেওয়া হয়েছে ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকার ঋণ।ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে,অনিয়মে সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরও পথেরহাট শাখার ব্যবস্থাপক মো. লোকমান হাছানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে প্রধান কার্যালয়ের ঋণ আদায় বিভাগে বদলি করা হয়েছে।অন্যদিকে শ্রীনগর শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মো.সাখাওয়াত হোসেনকে কেবল সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রধান কার্যালয় থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত দল এই ঘটনা তদন্ত করে সম্প্রতি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।দুটি ঘটনা ধামাচাপা দিতে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের একটি পক্ষ কাজ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের পথেরহাট শাখায় মোহাম্মদ শাহজাহান নামের একজন প্রবাসী ডাবল প্রফিট স্কিমে ৭০ লাখ ৮৬ হাজার টাকার আমানত রাখেন।২০২১ সালের জানুয়ারিতে এ অর্থ জমা রাখেন তিনি।পথেরহাট শাখার ব্যবস্থাপক মো.লোকমান হাছান এই আমানতের বিপরীতে একটি নকল ডিপোজিট স্লিপ তৈরি করেন।এরপর গ্রাহকের স্বাক্ষর জাল করে একই শাখা থেকে ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেন।ওই গ্রাহক সম্প্রতি দেশে এসে তাঁর ডিপোজিট স্লিপের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন।

গ্রাহকের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে ‘আমানত সুরক্ষিত আছে’মর্মে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়।সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, ডাবল প্রফিট স্কিমের আমানতকারী বিদেশে থাকা অবস্থায় শাখা ব্যবস্থাপক মো.লোকমান হাছান এককভাবে গ্রাহকের মূল আমানত রসিদের আদলে একটি নকল আমানত রসিদ তৈরি করেন।গ্রাহকের স্বাক্ষর জাল করে নকল রসিদ লিয়েন করে ঋণ মঞ্জুরি ও প্রদানের ব্যবস্থা করেন।প্রাথমিক তদন্তে যা প্রমাণিত হয়।শাখার সুনাম ও গ্রাহকের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখা ও অনাকাঙ্ক্ষিত গুজব রোধে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী আমানত সুরক্ষিত আছে মর্মে প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এই গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে সুদসহ বর্তমানে প্রায় এক কোটি টাকা রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো.লোকমান হাছান বলেন,গ্রাহকের এখানে ক্ষতির কোনো বিষয় নেই।যে কোনো কারণে একটা প্রতারণা
হয়ে গেছে।ব্যাংক এটা দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা নিচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু টাকা জমা হয়েছে।তিনি বলেন,ওই সময় শাখা ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলাম আমি। যে কারণে আমি চেষ্টা করছি দ্রুত আদায়ের ব্যবস্থা করতে।ব্যাংকের প্রাথমিক তদন্তে লোকমান হাছানের বিরুদ্ধে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,আমি নেই কীভাবে। আমি এটা নিতে পারি কখনও? এটা যে কোনো কারণে একটা প্রতারণা হয়ে গেছে।

জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর শাখার অফিসার শাখাওয়াত হোসেন একই শাখার সেকেন্ড অফিসারের আইডি চুরি করে কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারে (সিবিএস) ৭৩টি ভুয়া ঋণ অ্যাকাউন্ট তৈরি করেন। এসব অ্যাকাউন্টের বিপরীতে প্রায় ২৫ কোটি টাকার ঋণ সৃষ্টি করে বেসরকারি একটি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন।বিষয়টি ধরা পড়ার পর তা ঢাকতে একের পর এক জালিয়াতির আশ্রয় নেন। শুরুতে তিনি মুন্সীগঞ্জের শ্রীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ‘ক্রয়’ অ্যাকাউন্ট থেকে এই ঋণ সমন্বয় দেখান। এরপর শাখার জেনারেল লেজার (জিএল) থেকে আবার খাদ্য নিয়ন্ত্রকের টাকা সমন্বয় করেন। পরে ব্যাংক থেকে চাপচাপির পর বের করে নেওয়া অর্থে এই ঋণ সমন্বয় করা হয়েছে। ব্যাংকের পাঁচ সদস্যের তদন্তে এই জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

তদন্ত দলের অফিস আদেশে বলা হয়েছে, শ্রীনগর শাখার কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন কর্তৃক জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাৎ বিষয়ে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক অবগত হন। অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য ৫ সদস্যের তদন্ত টিম করা হলো। ব্যাংকটির ভিজিলেন্স স্কোয়াড বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক আবিদ আহমদ আফজালের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত দলকে সাখাওয়াত হোসেন কর্তৃক এই ৭৩টি হিসাবের বাইরে আর কোনো হিসাবে অনিয়ম হয়েছে কিনা, অন্য কোনো শাখায় অনিয়ম হয়েছে কিনা এবং অন্য কোনো কর্মকর্তা জালিয়াতিতে সম্পৃক্ত কিনা সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্যসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

গত ২২ জানুয়ারি গঠিত তদন্ত দল জালিয়াতির তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া ভুয়া ঋণের অর্থ সমন্বয় করেছেন সাখাওয়াত হোসেন। সাখাওয়াত হোসেন এর আগে গাজীপুরের দুটি শাখার দায়িত্ব পালনের সময়ও একই ধরনের অনিয়মে সম্পৃক্ততা ছিলেন বলে তথ্য পেয়েছে তদন্ত দল।

জানতে চাইলে মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন,অভ্যন্তরীণ একটি সমস্যা হয়েছিল। এখন সমাধান হয়ে গেছে।৭৩টি ঋণ সৃষ্টি করে ২৫ কোটি টাকা বের করে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন,আপনাকে এসব তথ্য কে দিয়েছে? কাজ-কর্ম করতে গিয়ে কত সমস্যা হয়। ভুলে এরকম হয়েছিল। এখন সমাধান হয়ে গেছে।এর আগে গাজীপুরেও একই রকম ঘটনা ঘটেছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন,সেখানেও আমার ক্ষতি করার জন্য একটি পক্ষ চেষ্টা করেছিল।

সার্বিক বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলীকে ফোন করে পাওয়া যায়নি।ব্যাংকের অন্য একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,এরকম অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত পক্ষকে বাঁচানোর জন্য ব্যাংকের ভেতরে একটি পক্ষ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।অভ্যন্তরীণ কিছু ঝামেলার কারণে দুটি ঘটনায় এখনও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। নতুন সরকার এসেছে,আশা করি শিগগিরই বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

Top