সবার জন্য আসছে ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ কর্মসূচি
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সবার জন্য আসছে ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ কর্মসূচি। কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে নিয়োগ দেওয়া হবে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী। প্রাথমিকভাবে একটি জেলায় ‘পাইলট প্রকল্প’ হিসাবে এর কাজ শুরু হবে, যা পরে পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ হবে। এর আওতায় দেওয়া হবে ই-হেলথ কার্ড। যেখানে মিলবে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ব্যয়ে সহায়তা ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিসহ এক ছাতার নিচে ১০ ধরনের সুবিধা।সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ কর্মসূচি নিয়ে বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে সরকারপ্রধান এ কর্মসূচির রোডম্যাপ বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্রমতে, এ কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মস্থলে যথাসময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের মর্যাদা, নিরাপত্তা, পেশাগত উন্নয়ন ও পদায়নসংক্রান্ত নীতিমালাও প্রণয়ন করা হবে।জানা গেছে, ২০১৮ সালে ভারতে এ ধরনের কর্মসূচি শুরু হয় ‘আয়ুস্মান ভারত’ নামে। যুক্তরাজ্যে এ ধরনের কর্মসূচি আছে ‘জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা’ নামে এবং ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ নামে কর্মসূচি চলছে থাইল্যান্ডে।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ ও মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেছেন, এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে একটি আধুনিক ও সর্বজনীন চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এছাড়া রাষ্ট্রের একজন এলিট নাগরিক যে মানের স্বাস্থ্যসেবা পাবেন, তেমনি প্রান্তিক মানুষও সরকারিভাবে একই মানের চিকিৎসা সুবিধা পাবেন।
সূত্রমতে, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ‘দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’সহ ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি ঘোষণা দেওয়া হয়। এর বাস্তবায়নে ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে ২৬ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনকে প্রধান এবং স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীকে সদস্য-সচিব করে ১৩ সদস্যের সেল গঠন করা হয়। উপদেষ্টা শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত সেলের সদস্য। সেলে ছয়জন সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন-তথ্য, সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু, নির্বাচন কমিশন, অর্থ ও পরিকল্পনা। সদস্যদের মধ্যে আরও আছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং জাপানের ঐতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুল ফ্যাকাল্টি ড. মো. শাকিরুল ইসলাম।
সূত্রমতে, সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বুধবার সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ কর্মসূচি বাস্তবায়নসংক্রান্ত বৈঠকে সেলের সব সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ই-হেলথ কার্ড তৈরি, প্রযুক্তিগত কাঠামো ও বাস্তবায়নের রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা হয়। এ প্রক্রিয়ায় জড়িত অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্প হিসাবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং আগামী বাজেটে পুরোপুরি বাস্তবায়নে অর্থের প্রয়োজন হবে। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগ কাজ করছে।
সূত্রমতে, পেশেন্ট (রোগী) ম্যানেজমেন্ট ও ইলেকট্রনিক রেফারেল সিস্টেম নিয়ে কাজ শুরু করেছেন এ সেলের সদস্যরা। খুব শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া হবে।
সূত্র আরও জানায়, এ কর্মসূচির আওতায় পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে চুক্তিভিত্তিক সেবা কাঠামো গড়ে তোলা হবে। রোগীদের জরুরিভিত্তিতে আনা নেওয়ার জন্য একটি বিশেষ অ্যাম্বুলেন্স পুল গঠন হবে। যেখানে সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স থাকবে। পুলের অ্যাম্বুলেন্সের গতি ও অবস্থান দেখা যাবে অ্যাপের মাধ্যমে। এছাড়া ঢাকার সব হাসপাতালে মেডিকেল বর্জ্যরে নিরাপদ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে নেওয়া হবে বিশেষ প্রকল্প।
জানা গেছে, সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ কর্মসূচিতে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ ও বিনামূল্যে মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত এবং প্রতিটি জেলায় আধুনিক সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে। এছাড়া রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে ওষুধ ও টিকা সরবরাহ নেটওয়ার্কের উন্নয়ন, মহামারি ও মশাবাহিত রোগ নির্মূল, পুষ্টি বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিও। আরও থাকবে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্য খাতে অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন ও প্রেসক্রিপশন অডিট চালু। পাশাপাশি মেডিকেল শিক্ষার মানোন্নয়ন, সমন্বিত ও আধুনিক পুষ্টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং তামাক ব্যবহারজনিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘স্বাস্থ্যসেবা’ শিরোনামের অধীনে বলা হয়েছে, ‘স্বাস্থ্য কোনো সুবিধা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে আমাদের লক্ষ্য হলো সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ) নিশ্চিত এবং প্রত্যেক নাগরিককে মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা।’বিশ্বব্যাপী সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এখন জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি-৩) গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।