তিন বিষয়ে অগ্রাধিকার ,মন্ত্রিসভা ও সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনস্বার্থের তিনটি বিষয় অগ্রাধিকার দিয়ে মন্ত্রিসভার সদস্য ও সচিবদের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। বিএনপি সরকারের প্রথম কর্মদিবসে বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এ সংক্রান্ত পৃথক বৈঠক থেকে প্রধানমন্ত্রী আরও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্দেশনা দেন। অগ্রাধিকার দেওয়া তিনটি বিষয়ের মধ্যে রয়েছে-দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। বৈঠকে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা বিষয়গুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।এদিকে মন্ত্রীদের যে কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তি ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শক্ত অবস্থানের’ ওপর জোর দিয়ে সবাইকে সতর্কও করা হয়। রোজায় দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।এর আগে মঙ্গলবার বিকালে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও নতুন মন্ত্রিসভায় ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মন্ত্রণালয় বা বিভাগের দায়িত্ব বণ্টন করেন। এছাড়া মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখান থেকে তারা সচিবালয়ে আসেন। বেলা ৩টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠক শুরু হয়। বৈঠক শেষে সচিবদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও আলোচনার বিষয়গুলো তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রথামাফিক সরকারের প্রথম দিনে মন্ত্রিসভার বৈঠক করতে হয়। এ বৈঠকে মন্ত্রিসভার সব সদস্য এবং উপদেষ্টারাও উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বেশকিছু অনুশাসনও দিয়েছেন। সরকার ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকার কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করছে। সেটি পরে জানানো হবে।
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করাসহ সরবরাহ ঠিক রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে (গ্যাস-বিদ্যুৎ) যেন কোনো সমস্যা না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে বলা হয়েছে।তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার হচ্ছে পবিত্র রমজান উপলক্ষ্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে মানুষের সহনীয় রাখা এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, বিশেষ করে তারাবি ও ইফতারের সময়। মূলত এ তিন বিষয় অগ্রাধিকারে এসেছে।এগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা কর্মপরিকল্পনা দু-একদিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবেন এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের জানান, এটি ছিল একটি অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল) কেবিনেট মিটিং। সেখানে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে তাদের পাশে থাকার জন্য। আমরা জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছি। বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে প্রতিটি মন্ত্রণালয় যেন সুন্দরভাবে কাজ করে, সেটাই ছিল প্রধানমন্ত্রীর মূল বক্তব্য।’
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনি অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো যেন আমরা মনে রাখি। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে সেই অনুযায়ী কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকার একটি ‘ক্লিন সরকার’ গঠনের অঙ্গীকার করেছে এবং সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।
মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর বলেন, ‘বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের যে এত বিপুল জনসমর্থন, সেই জায়গা থেকে প্রধানমন্ত্রী আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, জনগণ আমাদের কাছ থেকে সুশাসন ও জবাবদিহি চায়। সেক্ষেত্রে আমরা স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ের যারা দায়িত্বে আছি, তারা যেন যে কোনো ধরনের প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করি। বিশেষ করে দুর্নীতির প্রশ্নে যেন আমাদের একটা শক্ত অবস্থান থাকে।’ তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার (আজ) থেকে রমজান শুরু হচ্ছে, এই রমজানকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা, প্লাস হচ্ছে সেহরি-ইফতার-তারাবির সময়টায় যেন বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন থাকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে এবং সরকারের যে কমিটমেন্ট, বিশেষ করে নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় জনসভায় যে বিষয়গুলো বলেছেন-ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড-সেগুলো কীভাবে তাৎক্ষণিকভাবে আসলে কিছু দৃশ্যমান কাজ করা যায়, সে বিষয়গুলো নিয়েও তিনি (প্রধানমন্ত্রী) আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন, আলোচনা করেছেন।এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর একটি ঘোষণা ছিল যে, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বিষয়ে সরকারের একটি উদ্যোগ থাকবে। সেটি নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বিষয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে কী করা যায়। সামগ্রিকভাবেই সব বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে।’
সচিবদের সঙ্গে বৈঠক : মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সংক্ষিপ্ত বৈঠকে তিনি জনস্বার্থে দেশের জন্য ভালো কাজ করতে নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। সরকার আপনাদের পেশাদারি ও কর্মদক্ষমতা মূল্যায়র করবে।বৈঠক শেষে আলোচনা প্রসঙ্গে জানাতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সবাইকে আমরা বলেছি, কে, কার কী অ্যাফিলিয়েশন (সম্পৃক্ততা) আছে, সেটি আমরা দেখব না। আমরা মেধার ভিত্তিতে সবাইকে যাচাই করব।ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, জনগণ রায় দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ইশতেহার দেখে। নিশ্চয়ই তারা ইশতেহারকে পছন্দ করেন। সেই ইশতেহার যেন জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পূরণ হয়, সেজন্য সব সচিবের মেধাকে কাজে লাগিয়ে পেশাদারির সঙ্গে কাজ করা দেশের জন্য ভালো হবে।
ভূমি সচিব বলেন, সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব ও সচিবরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। আমরা সবাই সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতির অংশ নই। বিএনপির ইশতেহারে যা রয়েছে, তা যেন জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, সেজন্য প্রধানমন্ত্রী সচিবদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে জনস্বার্থে দেশের জন্য ভালো কাজ করতে নির্দেশ দেন। এ ব্যাপারে তিনি আমাদের সহযোগিতা চেয়েছেন।সচিবদের সঙ্গে বৈঠকটি বিকাল সাড়ে ৪টায় শুরু হয়ে ১৫ মিনিট স্থায়ী হয়। সচিবদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এবিএম আব্দুস সাত্তারসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।