মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাত সামলানো চ্যালেঞ্জ,নতুন সরকারের কাছে আকাশসম প্রত্যাশা - Alokitobarta
আজ : রবিবার, ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
নির্বাচনী ফলাফলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার জেরে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ওপর হামলা বরিশালে খালেদা জিয়ার রুহের মাগফেরাত ও বিএনপির নির্বাচনী সাফল্যে শুকরিয়া আদায়ে মিলাদ ও দোয়া মাহফি... দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি বাধ্য করা হলে রাজপথে নামবো লক্ষ্মীপুর ২১ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত, আলোচনায় তানিয়া রব-খালেদ সাইফুল্লাহ নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ ২৫০ কোটি টাকার ফুলের বাজার ফেব্রুয়ারির তিন দিবসে মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাত সামলানো চ্যালেঞ্জ,নতুন সরকারের কাছে আকাশসম প্রত্যাশা হালুয়াঘাটে শিশুকে পিটিয়ে হত্যা বড় পরিবর্তন আসছে শাসন কাঠামোয় ,গণভোটে বিশাল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ জয়ী

মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাত সামলানো চ্যালেঞ্জ,নতুন সরকারের কাছে আকাশসম প্রত্যাশা


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিশাল বিজয়ের পর বিএনপির নেতৃত্বাধাীন জোট দু-এক দিনের মধ্যেই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।নতুন সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা আকাশসম।কিন্তু এসব প্রত্যাশা পূরণ করতে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও প্রকট।অন্তর্বর্তী সরকারের কৃচ্ছ্র সাধনের অর্থনীতি অনুসরণের পরও রয়েছে বড় ঘাটতি।ফলে নতুন সরকার পূর্বসূরিদের কাছ থেকে একটি দুর্বল অর্থনীতি পাচ্ছে। যা সচল করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও সংস্থা দুটির মতে, নতুন সরকারের আমলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগ বাড়বে। শিল্প খাত চাঙ্গা হবে। এতে কর্মসংস্থানও বাড়বে। ফলে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো সম্ভব হবে।অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির আগেই নতুন সরকার গঠন করা হবে। এই সময়ে সরকার অর্থনীতির যে মৌলিক সূচকগুলো পাচ্ছে তার মধ্যে কেবল প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। অন্য খাতগুলো আছে অস্বস্তিতে।দুর্বল ব্যাংক খাত অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী টাকার জোগান দিতে অক্ষম।আবার টাকার জোগান বাড়ানো হলে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।অন্যদিকে টাকার জোগান না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব হবে না।এমন বহুমুখী বাস্তবতা সামনে রেখে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে।আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক-আর্থিক খাতসহ প্রায় সব খাতেই ব্যাপক লুটপাট,দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ফলে দেশের মূল অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। সেই গর্ত থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকার।কিন্তু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের তেমন গতি বাড়াতে পারেনি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতি আরও শ্লথ হয়েছে।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার এবং নিট রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ৯৫২ কোটি ডলার। এই রিজার্ভ দিয়ে ৪ দশমিক ৭ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কমপক্ষে তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রিজার্ভ থাকলে তাকে নিরাপদ মাত্রার ধরা হয়। সে হিসাবে বাংলাদেশের রিজার্ভ এখন নিরাপদ মাত্রায় রয়েছে। তবে নতুন সরকার ক্ষমতায় বসলে শিল্প খাত চাঙ্গা হবে এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। তখন এ রিজার্ভ আরও বাড়াতে হবে।আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে। কোনো কোনো মাসে ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। গত জুলাই-জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৯৪৩ কোটি ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি।

আওয়ামী লীগের আমলে ডলারের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা ছিল। বর্তমানে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। কিন্তু ডলারের দাম বেশ বেড়েছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২২ টাকা ৭২ পয়সা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ক্রমে ডলারের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে আইএমএফ ডলারের দাম আরও বাড়ানোর পক্ষে। এক্ষেত্রে আইএমএফের চাপ মোকাবিলা করে নতুন সরকার ডলারের দাম কতটুকু ধরে রাখতে পারবে সেটি এখনো দেখার বিষয়।আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছাপানো টাকায় ঋণ নেওয়ার মাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বর্তমান সরকার বেশ কিছু ঋণ পরিশোধ করেছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ছাপানো টাকায় ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন সরকার ঋণ নিয়েছে ১৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের মোট ব্যাংক ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়েছে ৫১ হাজার কোটি টাকা। নন ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জুলাই-ডিসেম্বরে ঋণ নিয়েছে ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাকি ঋণ সময় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ডের মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে।

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২৪৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে সরকারি খাতের ঋণ ৯ হাজার ৩০০ কোটি ডলার এবং বেসরকারি খাতের ঋণ ২ হাজার কোটি ডলার। স্থগিত ঋণের পরিমাণ একেবারেই নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় থেকেই সরকারের রাজস্ব আয়ে ঘাটতি দেখা দেয়। বর্তমান সরকারের আমলে এ ঘাটতি আরও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে রাজস্ব আয় হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি। তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আয় এখনো কম। এদিকে সরকারের খরচ বেশি হচ্ছে। ফলে সরকারকে ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। নতুন সরকারের জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ ব্যবসায় মন্দার কারণে রাজস্ব আয় আদায় কঠিন।

সরকারের জন্য আগামীতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গত জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, নির্বাচন, রোজা ও সরকারি কর্মীদের বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়তে পারে। তবে অর্থবছর শেষে তা কিছুটা কমতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে।রপ্তানি আয় বহুমুখী চ্যালেঞ্জে পড়ে। যে কারণে রপ্তানি আয় কমছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে রপ্তানি আয় হয়েছে ২ হাজার ৮৪১ কোটি ডলার। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কম। রপ্তানি শিল্পে কাঁচামাল আমদানি ও এলসি খোলা কমছে। ফলে আগামীতেও রপ্তানি আয় কমতে পারে।বাজারে ডলারের প্রবাহ বাড়ায় আমদানিও বাড়ছে। প্রতি মাসে এখন ৫০০ কোটি ডলারের আমদানি হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে রপ্তানি ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে সামান্য বেশি।

সম্প্রতি ডলার খরচের চেয়ে আয় কম হওয়ার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত জুলাই-নভেম্বরে এ খাতে ঘাটতি হয়েছে ৭০ কোটি ডলার। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ ঘাটতি হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।সরকারি খাতে ঋণ বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় গত বছরের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বেড়েছে ২ দশমিক ৩১ শতাংশ। এ খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জিং মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি খাতে এক বছরের হিসাবে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে ৩২ শতাংশ এবং ছয় মাসের হিসাবে বেড়েছে সাড়ে ১২ শতাংশ।গত অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ হার বাড়বে বলে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক পূর্ভাবাস দিয়েছে। খাদ্য মজুদ রয়েছে প্রায় ১১ লাখ টন। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থবিরতা বিরাজ করছে। গত অর্থবছরে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ২৬৮ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে এসেছে ৩২ কোটি ডলার।সরকার ব্যাংক খাত নিয়ে পড়বে বড় বিপাকে। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক লুটপাট ও টাকা পাচারের কারণে ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। তারল্য সংকট রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে ডিসেম্বরে তা কিছুটা কমেছে। ঋণের সুদের হারও বেড়েছ প্রায় দ্বিগুণ। বর্তমান এ হার ৯ থেকে ১৭ শতাংশ। সুদের হার বেশি থাকার কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

Top