শেষ দিনে জমজমাট প্রচারণা,জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট - Alokitobarta
আজ : বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শেষ দিনে জমজমাট প্রচারণা,জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট


মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কার্যত প্রচারণা শেষ হয়েছে। এ নির্বাচনে ভোটার টানতে টানা ১৯ দিন নির্বাচনি প্রচার চালিয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো। প্রচারণার শেষ দিনে সোমবার তারা ঢাকায় সমাবেশ করেছেন।এর আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশের বিভিন্ন জেলায় সমাবেশ করেন। একইভাবে অন্য রাজনৈতিক দলের প্রধানরাও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। আইন অনুযায়ী আজ সকাল ৭টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত প্রচারের সুযোগ রয়েছে।কিন্তু দলীয় প্রধানরা সোমবার রাতেই তাদের নির্বাচনি শেষ সমাবেশ করেছেন। গতকাল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতে ভাষণ দিয়েছেন তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমান। ভাষণে জয়ী হলে দেশের মানুষের জন্য কী করবেন-সেই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তারা।

নির্বাচন কমিশন মনে করছে, নির্বাচনি প্রচারে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নেতা ও প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ায় ভোট উৎসব দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে দেখা যাচ্ছে বেশি আগ্রহ। অন্য তিন নির্বাচনের তুলনায় এই নির্বাচনে সহিংসতার সংখ্যা ও তীব্রতা দুই-ই কম থাকলেও ভোটের দিন সহিংসতার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। তবে কমিশনের প্রত্যাশা, ভোটগ্রহণের দিন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা সহনশীলতা দেখাবেন।ইসি জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাবে শেষ করতে এক লাখ সেনা সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয় লাখ ১৯ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এক হাজারের বেশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৫ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। তারা ভোটের মাঠে অনিয়ম, জাল ভোট, কেন্দ্র দখলের মতো ঘটনা দেখলে তাৎক্ষণিক সাজা দিতে পারবেন।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, বিগত তিন নির্বাচনের তুলনায় এ নির্বাচনে সহিংসতা অনেক কম হয়েছে। নির্বাচনের পরিবেশ ভালো রয়েছে। আমরা আশা করছি, ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন। তিনি বলেন, এ নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন। কারণ একই সঙ্গে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা আগে কখনো একসঙ্গে হয়নি।

এদিকে নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বিরাজ করছে। বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকরা ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সোমবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে নির্বাচনি সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সকাল থেকে ভোটকেন্দ্রে থাকার জন্য দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান।তিনি বলেন, ‘আপনারা ফজরের নামাজ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আদায় করবেন। ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে যাবেন, যাতে করে কেউ ষড়যন্ত্র করে কিছু করতে না পারেন।’ ‘শুধু ভোট দিলেই চলবে না, ভোট দিয়ে চলে আসবেন না। ভোট বুঝে নিয়ে আসবেন। হিসাব বুঝে নিয়ে আসবেন’ এমন কথাও বলেন তিনি।

অপরদিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এখন থেকেই ভোট পাহারা শুরু করতে হবে। জালিয়াত, ভোটচোর, অবৈধ ইঞ্জিনিয়ারদের জনগণের কপাল নিয়ে খেলতে চাইলে, রুখে দিতে হবে। বিজয়ের মালা গলায় পরিয়ে দিয়ে তারপর আপনারা ঘরে ফিরবেন।

দেশে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই তিন নির্বাচনে কারচুপি করে জয়ের কারণে শেখ হাসিনা ফ্যাসিস্ট রূপ ধারণ করেন। এর বিরুদ্ধে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকে একপর্যায়ে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এ কারণে এবারের নির্বাচন ঘিরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে বিদেশি পর্যবেক্ষক মহলও।এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব কোন দল বা জোট পাচ্ছে-তা নির্ধারণ হবে আগামী বৃহস্পতিবার। এদিন গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে চলবে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। নির্বাচনে ভোটারদের রায়ে নির্ধারিত হবে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের আসনে কারা বসছেন?

দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কে পাচ্ছে; বিএনপি নাকি জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট-সে সিদ্ধান্তও আসবে এ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। একই সঙ্গে নির্ধারিত হবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের ভাগ্য। এ নির্বাচনে ‘হ্যাঁ ভোট’ জয়ী হলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক হবে। আর ‘না ভোট’ জয়ী হলে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী সংস্কার করতে পারবে। এ কারণে এ নির্বাচন বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে এসেছেন ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক।

বৃহস্পতিবার সারা দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ হবে। এর মধ্যে ২১ হাজার ৫০৬টি ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। বাকি ২১ হাজার ২৭৩টি কেন্দ্র সাধারণ কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের অবস্থান, গুরুত্ব ও ঝুঁকি বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৫ থেকে ১৮ জন সদস্য মোতায়েন থাকছে। ইসি আশা করছে, বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ পর মধ্যরাতে ফলাফল প্রকাশ করতে পারবে।

এক নজরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। তিনশ’ আসনে ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মারা যাওয়ায় শেরপুর-৩ আসনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে না।

২৯৯টি আসনে দুই হাজার ২৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৪ জন। নির্বাচনে মূল লড়াই হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট। ইসিতে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি এ নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগসহ ৯টি দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এ নির্বাচনের ব্যালট পেপারসহ অন্য সামগ্রী নির্বাচনি এলাকায় পাঠানো হয়েছে।

মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখের বেশি সদস্য : ভোটগ্রহণের নিরাপত্তায় নয় লাখ ১৯ হাজার সদস্য মাঠে নেমেছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনী এক লাখ তিন হাজার, পুলিশ এক লাখ ৮৭ হাজার, বিজিবি ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন, আনসার পাঁচ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন। বাকি অন্যান্য বাহিনীর। এ নির্বাচনে বিএনসিসির এক হাজার ৯২২ জন সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। নির্বাচনি এলাকায় বড় ধরনের সহিংসতা এড়াতে মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ হচ্ছে।

৫৪০ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক : নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে আসছেন ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক। এর মধ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে আসছেন প্রায় ৬০ জন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা থেকে আসছেন প্রায় ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক। ৪৫টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে আসছেন প্রায় ১৫০ জন বিদেশি সাংবাদিক।

ইসি জানায়, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রিত প্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছেন ভুটান ও নাইজেরিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মালয়েশিয়ার নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার আইসিএপিপি স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান। এছাড়া তুরস্ক থেকে ছয়জন সংসদ-সদস্য ও সুপ্রিম ইলেকশন কাউন্সিলের কর্মকর্তাসহ ১০ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়া থেকে পাঁচজন করে প্রতিনিধি দল এবং ফিলিপাইন, জর্জিয়া, রাশিয়া, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান ও ইরানের নির্বাচন কমিশনের কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে আসছেন।নির্বাচনের সংবাদ কভার করতে প্রায় ১৫০ জন বিদেশি সাংবাদিক বাংলাদেশে আসছেন। এর মধ্যে পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে ৪৮ জন ও আলজাজিরা থেকে সাতজন সাংবাদিকও রয়েছেন। এছাড়া সংবাদ সংস্থা এনএইচকে, বিবিসি নিউজ, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), রয়টার্স ও ডয়েচে ভেলের সাংবাদিকরাও রয়েছেন।

নির্বাচনি এলাকায় বহিরাগত নয় : ভোটগ্রহণ উপলক্ষ্যে নির্বাচনি এলাকায় বহিরাগতদের অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইসি। আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। নির্বাচনি কার্যক্রমে যুক্ত, ইসির অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার বাসিন্দা বা ভোটার ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি ভোটগ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে ভোটগ্রহণ শেষের ২৪ ঘণ্টা পর পর্যন্ত নির্বাচনি এলাকায় অবস্থান করতে পারবেন না।সোমবার ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে এ নির্দেশনা জারি করা হয়। অপর এক চিঠিতে আজ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব ধরনের সভা-সমাবেশ আয়োজনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

Top