আমাদের অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল-ত্রুটি হয়েছে,সেজন্য আমি দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি
নুর নবী জনী:জনগণের ভোটে বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে তাঁবেদারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।তিনি বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার দিন। বিএনপি সরকার গঠনের সুযোগ পেলে প্রতিটি সেক্টর ও প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করবে। তরুণ ও বেকারদের জন্য দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য বিশেষ আর্থিক ভাতা দেবে। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য যথাসময়ে জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করা হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির মূলমন্ত্র থাকবে মহানবীর (সা.) মহান আদর্শ ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে। সোমবার রাতে বিটিভিতে সম্প্রচারিত জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জনগণের চূড়ান্ত বিজয় দেখে যেতে পারেননি। যারা খালেদা জিয়া, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে ভালোবাসেন, তারা জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষকে বিজয়ী করুন। ধানের শীষের বিজয়ের অর্থ বাংলাদেশের বিজয়, স্বাধীন ও সার্বভৌম তাঁবেদারমুক্ত বাংলাদেশ।তরুণদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি আপনারা ধানের শীষের প্রার্থীদের দায়িত্ব নিন। ১৩ তারিখ থেকে নির্বাচিত এমপিরা আপনাদের দায়িত্ব নেবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আপনাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে কিনা সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমি নেব ইনশাআল্লাহ।
তারেক রহমান বলেন, অতীতে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে। দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে সেই সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো আমাদের অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল-ত্রুটি হয়েছে। সেজন্য আমি দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অর্জনগুলোকে অবলম্বন করে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি আমি আপনাদের সমর্থন চাই।তিনি আরও বলেন, প্রতিটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের কাছে রাষ্ট্র ও সরকারকে দায়বদ্ধ রাখার কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্র পরিচালনায় আপনাদের সমর্থন পেলে আগামী দিনে সরকার হবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে যতটা কঠোর হওয়া যায় বিএনপি সরকার ততটাই কঠোর হবে। দেশে পুনরায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
বিএনপি ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারের নানা বিষয় তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, প্রতিটি সেক্টর এবং প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমরা আমাদের পরিকল্পনা সাজিয়েছি। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল এবং ভবিষ্যৎ প্রজরন্মের জন্য একটি নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিএনপির সব পরিকল্পনা, বিশেষ করে দেশের সব তরুণ-তরুণী বেকার জনগোষ্ঠী এবং নারীদের জন্য দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই এবার বিএনপির প্রথম এবং প্রধান অগ্রাধিকার।
তারেক রহমান বলেন, বেকার সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে দেশে-বিদেশে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এভাবে পর্যায়ক্রমিকভাবে কয়েকটি সেক্টরকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির উপায় এবং কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসাবে দেশব্যাপী কারিগরি এবং ব্যবহারিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে বেকার জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা হবে।
তারেক রহমান আরও বলেন, বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখের বেশি। বিপুলসংখ্যক বেকারের অধিকাংশই ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি। বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে, শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ এক বছর কিংবা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের অর্ধেক জনশক্তির বেশি নারীশক্তিকে রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতির মূলধারার বাইরে রেখে দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়। দেশে প্রায় চার কোটি পরিবার রয়েছে। বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিলে, আমরা এবার প্রথমবারের মতো দেশে প্রতিটি পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
শিক্ষার মান উন্নয়নের নানা দিক উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষাগ্রহণের সুবিধা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ ও ভূমিকা বাড়ানো হবে। স্বচ্ছন্দে চলাফেরা নিশ্চিত করতে শুধু নারীদের জন্য বিশেষায়িত ইলেকট্রিক পরিবহণ চালু করা হবে। কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কর্মস্থলে ডে-কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করা হবে। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত অবশ্যই করা হবে।
কৃষক কার্ড প্রসঙ্গে তারেক রহমান আরও বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে কৃষকের স্বার্থ রক্ষার অর্থ দেশের স্বার্থ রক্ষা। আমরা কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তাদের জন্য ফার্মার্স কার্ড ইস্যুর উদ্যোগ নিয়েছি। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষক একদিকে কৃষিসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য পাবেন। অপরদিকে সরকারের কাছ থেকে পাবেন আর্থিক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা। এ সময় স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিএনপির পরিকল্পনার কথাও জানান বিএনপি চেয়ারম্যান।
তারেক রহমান বলেন, পতিত ফ্যাসিবাদী অপশক্তি দেশের সব সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দিয়েছিল। প্রশাসনকে চূড়ান্ত রকমের দলীয়করণ করে ফেলেছিল। প্রশাসন পরিচালনায় বিএনপির নীতি হবে প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান চলবে সাংবিধানিক নিয়মে। শাসন প্রশাসনকে দলীয়করণ নয়। প্রশাসনে নিয়োগ কিংবা পদোন্নতি হবে মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে। জনপ্রশাসন সঠিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে না পারলে আমাদের কোনো উদ্যোগই সুফল মিলবে না। কেউ যেন ধর্ম নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে না পারে তার জন্য দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।