জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনি ইশতেহারে এ ঘোষণা
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি)।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনি ইশতেহারে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।ইশতেহার পাঠে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফায় প্রথমে জুলাই সনদের বিষয়টি ছিল না; কিন্তু দেশের দলমত সবাই ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি চায় না। আমরা ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি চাই না। তাই আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করব।এছাড়া জুলাই সনদের বেশিরভাগ বিষয়বস্তু আমাদের ৩১ দফার মধ্যে রয়েছে। ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর এবং উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি করবে বিএনপি। একই সঙ্গে সংসদের উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ নারী নিশ্চিত করবে দলটি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত ইশতেহারে এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর হোটেল সোনারওগাঁওয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে ইশতেহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।ইশতেহারের রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার অংশে বলা হয়েছে, সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা হবে। এছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, অগণতান্ত্রিক সংশোধনী বাতিল, ৩১ দফার ভিত্তিতে সংস্কার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃজন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার, উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ নারী, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার করবে দলটি।
ন্যায়পরায়ণ বাংলাদেশ গঠন, ফ্যাসিবাদ ও তাঁবেদারিত্বের পুনরাবৃত্তি দমন, বৈষম্য দূরীকরণ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, রাষ্ট্রের সব স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জনকল্যাণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন করা হবে, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে ভবিষ্যৎমুখী নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় বিএনপি।
রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারে বিএনপির ইশতেহারে আরো বলা হয়েছে, বিএনপি বিশ্বাস করে জাতি গঠন মানে কেবল রাষ্ট্র পরিচালনা নয়, বরং বিভাজন অতিক্রম করে একটি অভিন্ন জাতীয় সত্ত্বা নির্মাণ। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের অবসান ঘটানো, আমাদের একটাই পরিচয় আমরা সবাই বাংলাদেশি, বাংলাদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পাহাড়ের মানুষ, সমতলের মানুষ, ধনী-দরিদ্র্য নির্বিশেষে সবাই মিলে আমরা গড়ে তুলব জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ড জাতীয় সত্ত্বা। একই সঙ্গে ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠন করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি।শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকালে ঢাকার হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুমে নির্বাচনি ইশতেহারে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন তারা যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য তাদের নামে নিজস্ব এলাকায় রাস্তা, ব্রিজ প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হবে।প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি এখনো আদর্শচ্যুত হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, আজ থেকে ৪৭ বছর আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিএনপি তাদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের সভাপতিত্বে ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান।নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি। নাজুক অর্থনীতির উন্নতি ও বেকার তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা ও ফ্রিল্যান্সিং খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির অঙ্গীকার করেছে দলটি।একই সঙ্গে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে তিনি এসব পরিকল্পনার কথা জানান।তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে আইসিটি খাতকে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এজন্য নির্বাচনি ইশতেহারে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল খাত নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিএনপির আইসিটি খাতভিত্তিক পরিকল্পনা
এআই, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার হাব: বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার উৎপাদনের কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে। সাইবার নিরাপত্তা ও এআইসহ বিশেষ পাঁচটি খাতে দুই লাখ এবং ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনে আট লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে।
দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট: দেশব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল স্থানে বিনামূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। সাবমেরিন ক্যাবল এবং লো-অরবিট স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ৯৯ দশমিক ৯৯৯ শতাংশ নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা চালু করা হবে।
মেইড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগ: দেশীয় সফটওয়্যার, অ্যাপ ও হার্ডওয়্যার পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগ জোরদার করা হবে।
সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা: জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র স্থাপনসহ শক্তিশালী নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে সাইবার বুলিং ও নাগরিক তথ্য সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্যাশ-লাইট অর্থনীতি: পেপ্যালসহ আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা চালু এবং জাতীয় ই-ওয়ালেট চালুর মাধ্যমে ক্যাশ-লাইট অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে।
এআই-চালিত ডাটা সেন্টার: এআই-নির্ভর ডাটা সেন্টার ক্যাম্পাস, এজ ডাটা সেন্টার এবং ক্লাউড প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে।
স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনে সহায়তা: উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ বছরের করমুক্ত সুবিধা, ভর্তুকিযুক্ত ঋণ এবং স্টার্টআপ তহবিল গঠন করা হবে।
জাতীয় ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম: স্টার্টআপে বিনিয়োগের জন্য নাগরিক ও প্রবাসীদের অংশগ্রহণে আইনি কাঠামোর আওতায় জাতীয় ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম চালু করা হবে।
উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও সাশ্রয়ী সেবা: টেলিকম খাত উন্মুক্ত করে প্রতিযোগিতা বাড়ানো হবে, ফলে ইন্টারনেট সেবার মূল্য কমবে।তারেক রহমান বলেন, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রযুক্তিনির্ভর, কর্মসংস্থানমুখী ও উদ্ভাবনী অর্থনীতিতে রূপান্তর করা হবে।