নির্বাচন নিয়ে কেউ সন্ত্রাস করলে আল্লাহর ওপর ভরসা করে সমান জবাব দেবেন
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা.শফিকুর রহমান বলেছেন, ১৮ কোটি মানুষের মুক্তি যতদিন নিশ্চিত না হবে, ততদিন ২৪-এর আন্দোলন চলবে।রোববার দুপুরে শেরপুর শহরের পৌর দারোগ আলী মাঠে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।২৪ শেষ হয়ে যায়নি। দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জেগে থাকবেন,পাহারা দেবেন,নির্বাচন নিয়ে কেউ সন্ত্রাস করলে আল্লাহর ওপর ভরসা করে সমান জবাব দেবেন।অবশ্য জবাব দেওয়ার আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবগত করবেন। যদি দেখেন প্রশাসন কিছু করছে না এবং সন্ত্রাসীদের অভয়াশ্রম হয়ে যাচ্ছে, তখন আপনার ওপর ওয়াজিব হয়ে যাবে তা প্রতিহত করার।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, যে দলের নেতারা হাসিমুখে ফাঁসির তক্তার ওপর দাঁড়াতে পারেন, তাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন না। আমরা আপনাদের অনুনয়বিনয় করছি-মা-বোনদের গায়ে হাত দেবেন না। হাত উঠলে বাংলাদেশ বিস্ফোরিত হবে। মায়ের সন্তানরা গালে হাত দিয়ে বসে থাকবে না। তিনি বলেন, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে যে যুবকরা রাস্তায় নেমে আসছিল, তারা কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না। ২৪ এখনো চলছে? ২৪ চলবে, যতক্ষণ না ১৮ কোটি মানুষের মুক্তি নিশ্চিত না হবে। সবাই জেগে থাকবেন। যুবকদের দেশ চালানোর যোগ্যতা অর্জনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের যুবসমাজ তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী মর্যাদার কাজ হাতে পেতে চায়। আল্লাহ আমাদের নির্বাচিত করলে যোগ্যতা অনুযায়ী যুবকদের হাতে কাজ তুলে দিয়ে বলব, তোমরাই বাংলাদেশ। আমরা যুবকদের হাতে এ বাংলাদেশ তুলে দিতে চাই। তোমরা তৈরি হয়ে যাও। তিনি বলেন, যুবকরা রাস্তায় নেমেছিল কাজের অধিকার চাইতে। তোমরা কি মিছিল করে বলেছিলে, আমরা বেকার ভাতা চাই! বেকার ভাতা দিয়ে আমরা যুবসমাজকে অপমান করতে চাই না। বাংলাদেশের ভার তোমাদেরই বহন করতে হবে।
নারীদের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা আপনাদের জন্য তিনটি জায়গায় দুটি কাজ করব। কাজ দুটি হলো-নিরাপত্তা ও সম্মান; আর জায়গা তিনটি হলো-ঘর, চলাচল ও কর্মস্থল। এ নিয়ামত আপনাদের হাতে তুলে দেব। সমালোচকদের জবাবে তিনি বলেন, বলা হয়-আমরা আপনাদের (নারী) বন্দি করে রাখব। আল্লাহর রাসুল মায়েদের যুদ্ধের ময়দানে যোদ্ধা হিসাবে নিয়ে গেছেন। আমি কে আমার মাকে ঘরে বন্দি রাখার! তিনি বলেন, আমরা দেখব না, সেই মা কোন ধর্মের। দেখব তার যোগ্যতা ও দেশপ্রেম আছে কি না। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ আমরা করব না। এ দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ধর্মের মানুষের। সর্বধর্মের মানুষকে একত্রিত করে ফুলের বাগান সাজাতে চাই। এক জাতের গাছ দিয়ে বাগান হয় না। জোর করে একের ধর্ম আরেকজনের ওপর চাপানোর অধিকার আমাদের নেই।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, রাজনৈতিক দল হিসাবে আমরা ছিলাম মজলুম। আমাদের নিবন্ধন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আমাদের নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পতনের চার দিন আগে আমরাও নিষিদ্ধ হয়েছিলাম। পঞ্চম দিনে আল্লাহ তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন। ২৪ পরিবর্তন আনলেও আমরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করিনি, রাস্তায় মিছিল করিনি, স্লোগান দিইনি। আল্লাহর দরবারে সিজদা দিয়ে শুকরিয়া আদায় করেছি। তিনি বলেন, আমরা কারও ওপর থেকে দলীয়ভাবে কোনো প্রতিশোধ নেব না। তবে ব্যক্তি বা কোনো পরিবার বিচার চাইলে আমরা তাদের পূর্ণ সহযোগিতা করব।
জামায়াতের আমির শফিকুর বলেন, আমরা বলে দিয়েছিলাম, কোনো চাঁদাবাজ, বাটপাড়ের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। আমরা বলেছিলাম, অতীতে যারা অপরাধ করেছে, তাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আমরা মামলা বাণিজ্য করব না। সুনির্দিষ্ট অপরাধের বিরুদ্ধে মামলা হবে, নিরীহ কোনো মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হবে না। আমাদের মামলায় শতশত আসামি নেই, আর হাজার হাজার মামলাও নেই। এক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, আপনারা শুনলে অবাক হবেন, বাংলাদেশে আমরা সর্বোচ্চ মামলা করেছি ১ হাজার ২০০টি। এর মাঝে ৮টি মামলা আছে আসামি মাত্র একজন। আমরা দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি খুঁজে পাইনি। কেন অন্যজনের নাম দেব। এটি হারাম, এটি আমরা করিনি। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয় দেখানো হয়। তাদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য আছে। পুলিশ, সেনাবাহিনীর বেতন বৈষম্যের উদাহরণ দেন তিনি।
নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া ও অনাকাঙ্ক্ষিত পোস্টের বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মায়েদের কি পরিমাণ সম্মান করি, তা বাংলাদেশের ৯ কোটি মা সাক্ষী। আমার টুইটার (এক্স) অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে অত্যন্ত বাজে, অরুচিকর মন্তব্য দিয়েছে। এ নিয়ে একটা দল হইহই-রইরই করছে। তিনি বলেন, সাবধান করে দিচ্ছি! এ কাজ করবেন না। একেবারেই ইতর শ্রেণি না হলে কেউ এ কাজ করতে পারে না।
শেরপুর অঞ্চলের কিছু দাবির বিষয়ে ডা. শফিকুর বলেন, আমরা আগেই বলেছি, বাংলাদেশের কোনো জেলা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়হীন থাকবে না। দক্ষ জনশক্তি ছাড়া কিছু যন্ত্রপাতি আর বিল্ডিং করে দিলে বিশেষায়িত হাসপাতাল করে দিলে হবে না। বরং এটি মানুষ মারার আরেকটি রিফাইন কারখানা হবে। এজন্য আমরা মেডিকেল কলেজ দিয়ে শুরু করব। রেললাইন সম্প্রসারণ করা, সারা বাংলাদেশকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনা দুটি কারণে প্রয়োজন। কারণ, রেলভ্রমণে ব্যয় কম এবং তুলনামূলক নিরাপদ।
বক্তব্য শেষে শেরপুরের তিনটি আসনের জামায়াতের প্রার্থীদের হাতে ডা. শফিকুর রহমান দাঁড়িপাল্লার প্রতীক তুলে দিয়ে সবার কাছে ভোট চান। জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনি জনসভায় উপস্থিত ছিলেন শেরপুর-১ (সদর) আসনের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের মুহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া ভিপি এবং শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের নুরুজ্জামান বাদল, এনসিপির জেলা সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার লিখন মিয়া, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় আমির মাওলানা শফিকুল ইসলাম, এবি পার্টির জেলা সভাপতি শাজাহান মল্লিক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক রিয়াদ হোসাইন, ডাকসু জিএস এসএম ফরহাদ, জকসু সমাজ সেবা সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান, শেরপুর জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নেতা মামুনুর রহমান, শহীদ মাহবুবের ভাই মাজহারুল ইসলাম প্রমুখ।
ঝিনাইগাতী উপজেলায় ২৮ জানুয়ারি বিএনপির-জামায়াত সংঘর্ষে নিহত শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিমের কবর সকালে জিয়ারত করেন জামায়াত আমির। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি শোক ও সমবেদনা জানান।
এদিকে রোববার দুপুরে জামালপুর শহরের সিংহজানী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জেলা ১১ দলীয় জোট আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের বাঁক পরিবর্তনের নির্বাচন। এ নির্বাচন ১ হাজার ৪০০ শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নির্বাচন। এ নির্বাচন আয়নাঘরের অবসানের নির্বাচন। এ নির্বাচন বস্তাপচা রাজনীতির কবর রচনার নির্বাচন। ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ জিতলে বাংলদেশ জিতবে। তিনি বলেন, জামায়াতের বিজয় না, আমরা দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। দুর্নীতিমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ গড়তে তিনি দাঁড়িপাল্লায় ভোট চান। জামালপুরের পাঁচটি আসনের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা তুলে দিয়ে তাদের জন্য ভোট প্রার্থনা করেন দলের আমির ডা. শফিকুর। এ সময় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, আমরা শহীদের লাশ ও রক্তের সঙ্গে বেইমানি করতে পারব না। জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তারের সভাপতিত্বে জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াতের সাংগঠনিক সেক্রেটারি ড. ছামিউল হক ফারুকী, ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আব্দুল আওয়াল।প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন শেরপুর থেকে রফিক মজিদ ও জামালপুর থেকে মাহফুজুর রহমান।