আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা হেরে গেলেও তাদের নিয়ে ঐক্যের সরকার গঠন করা হবে
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামীতে নির্বাচিত হলে ১১ দলীয় জোট দেশে একটি ঐক্যের সরকার গঠন করবে। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা হেরে গেলেও তাদের নিয়ে ঐক্যের সরকার গঠন করা হবে।আমাদের লক্ষ্য-বাংলাদেশে ঐক্য সৃষ্টি করা। আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাচ্ছি না, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাচ্ছি।১৮ কোটি মানুষের বিজয়ই হবে ১১ দলের বিজয়। শনিবার দুপুরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনি সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।এছাড়াও তিনি কুমিল্লার দাউদকান্দি, নিমসার বাজারে পথসভায় বক্তব্য রাখেন। বিকালে তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জে বিশাল নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য রাখেন। আগামীর বাংলাদেশ হবে তারুণ্যের বাংলাদেশ, যুবকদের বাংলাদেশ। পেছনের সব ঐতিহ্যকে ধারণ করে আমরা সামনে এগিয়ে যাব।
চৌদ্দগ্রাম : চৌদ্দগ্রামের জনসভায় জামায়াতের আমির বলেন, আমাদের প্রতিপক্ষ যদি ভোটে পরাজিত হয় তারপরও আমরা তাদের নিয়ে ঐক্যের সরকার গঠন করব। তবে তাদের কথা দিতে হবে ব্যাংক ডাকাতি, অনিয়ম-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। মানুষের পকেটে হাত দেওয়া বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, দেশের যুবসমাজকে আমরা দেশ গড়ার হাতিয়ারে পরিণত করব। তারা বেকার ভাতা চায় না। তারা দক্ষ যুবসমাজে পরিণত হতে চায়। আমরা এই বাংলাদেশকে যুবকদের হাতে তুলে দিতে চাই। আমরা যাদের প্রার্থী করেছি তাদের ৬২ ভাগ যুবক। আমরা এ দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করব। দেশের একজন সাধারণ নাগরিকের যে বিচার, প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও সেই বিচার নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, সব ধর্মের মানুষকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, আপনারা ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবেন। কেউ আপনাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ একটা পরিবর্তন চায়। ১৩ তারিখ যে পরিবর্তনটা আসবে সেটা আসবে যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে। আমরা আর কোনো ফ্যাসিবাদ দেখতে চাই না। আমরা একটি মানবিক বাংলাদেশ দেখতে চাই। আমরা শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে চাই। ৫ আগস্টের পর আপনারা দেখেছেন কার কী ভূমিকা। স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মন্ত্রিপরিষদে সিনিয়র একজন সদস্য পাবেন চৌদ্দগ্রামের জনগণ। জামায়াত আমির বলেন, সরকারি-বেসরকারি চাকরি যারা করছেন, অনেকেই সম্মানজনক বেতন পাচ্ছেন না। সরকারি-বেসরকারি সব কর্মকর্তা-কর্মচারী যেন সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে সেই ব্যবস্থা করা হবে। ক্ষমতায় গেলে কওমি মাদ্রাসার উন্নয়নের স্বার্থে যা লাগে তাই আমরা করব। আমরা কওমি মাদ্রাসাবিরোধী নই।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন-এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা এটিএম মাসুম, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এই নির্বাচন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই নির্বাচন জুলাই আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিকতা। এ নির্বাচন গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আমরা এমন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাই, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন শহীদ ওসমান হাদি। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন জুলাই যোদ্ধারা। আল্লামা মামুনুল হক বলেন, ৭১ থেকে ২৪ পর্যন্ত কায়েমি শাসকগুলো শাসনের নামে মানুষকে শোষণ করেছে। নতুন করে আবার ফ্যাসিবাদ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। নারীদের ওপর নির্যাতন করলে গোটা বাংলাদেশে আগুন জ্বলবে।
বুড়িচং : কুমিল্লা-৫ আসনের নিমসারে জুনাব আলী কলেজ মাঠে জামায়াতের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৩ তারিখ নতুন বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য ১৮ কোটি মানুষ মুখিয়ে আছে। আমাদের কোনো মামা-খালুর দেশ নেই, বেগমপাড়া নেই। আমাদের পাড়া একটাই-আমাদের গর্বের বাংলাদেশ। হাঁচি-কাশি হলেও যে নেতারা বিদেশে চলে যান দেশের প্রতি তাদের কোনো আস্থা নেই। অথচ তারাই এক সময় বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন। তাহলে দেশটাকে গড়লেন না কেন? এই দেশের প্রতি আপনাদের আস্থা নেই। কারণ, এই দেশ আপনাদের কাছে শুধুই টাকা কামানোর মেশিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুমিল্লা-৫ আসনের জামায়াত প্রার্থী ড. মুহাম্মদ মোবারক হোসাইন। যৌথভাবে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন উপজেলার সহকারী সেক্রেটারি প্রধান শিক্ষক মো. কবির হোসাইন ও জামায়াত নেতা মো. আব্দুল আউয়াল। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মাসুম, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম এবং ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি সিগবাতুল্লাহ। আরও উপস্থিত ছিলেন বুড়িচং উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুল আউয়াল, অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নান, বর্তমান আমির অধ্যাপক মুহাম্মদ অহিদুর রহমান, সেক্রেটারি মুহাম্মদ আবুল হোসাইন, ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা আমির মাওলানা মুহাম্মদ রেজাউল করিম, মাওলানা মিজানুর রহমান আতিকীসহ ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী।
দাউদকান্দি : শনিবার দুপুরে দাউদকান্দি উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিশ্বরোডের মডেল মসজিদ কেন্দ্রীয় ঈদগাঁ মাঠ প্রাঙ্গণে ১১ দলীয় জোট আয়োজিত কুমিল্লা-১ আসনের প্রার্থী মনিরুজ্জামান বাহলুলের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের আগে ৫৪ বছরে বাংলাদেশের অন্যরকম রূপ আমরা দেখেছি। সন্ত্রাস, ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, শেয়ার মার্কেট লুট দেখেছি। এই রাজ্যে একটি পরিবার, একটি গোষ্ঠী, একটি দল ছাড়া এর বাইরে সবাইকে তারা দেশের ভাড়াটিয়া মনে করত। ৫ তারিখের পর অনেকের মধ্যে আত্মসমালোচনা এসেছে। অনেকের আবার চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা বাংলাদেশে বস্তাপচা বন্দোবস্ত আর চলতে দেব না। ওই পচা রাজনীতিকে এখন লালকার্ড দেখাব। এমন একটি বাংলাদেশ বানাতে চাই যে দেশের অসংখ্য বন্ধু রাষ্ট্র থাকবে। তবে আমাদের কোনো প্রভু থাকবে না। আমরা সেই দেশ বানাতে চাই যেখানে আমাদের মা-বোনরা ঘরে-বাইরে, কর্মস্থলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব জায়গায় মায়ের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে চলাফেরা করবে। জামায়াতে ইসলামী কুমিল্লা উত্তর জেলা কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মোশাররফ হোসেনের সঞ্চালনায় কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা) আসনের প্রার্থী মনিরুজ্জামান বাহলুলের সভাপতিত্বে আরও উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা উত্তর জেলা আমির অধ্যাপক আ. মতিন, ইসলামী ছাত্রশিবির সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ প্রমুখ।
কেরানীগঞ্জ : শনিবার বিকালে কেরানীগঞ্জের শাক্তা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক নির্বাচনি জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতির ধাক্কা খেয়ে এখন কেউ কেউ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলতে শুরু করেছে। প্রথমে গণভোটের বিরোধিতা করা হলেও জনচাপের মুখে একই দিনে গণভোট ও সংসদ নির্বাচন মেনে নেওয়া হয়। এখন আবার তারা গণভোট মানে না বলে বক্তব্য দিচ্ছে। জনগণ যখন জবাব চাইছে, তখন বাধ্য হয়ে তারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের কথা বলতে শুরু করেছে।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ঢাকা-১ আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম, ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল হক এবং ঢাকা-৩ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহীনুর ইসলাম। এনসিপির প্রার্থীদের মধ্যে বক্তব্য দেন ঢাকা-১৯ আসনের দিলশানা পারুল ও ঢাকা-২০ আসনের ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসনিম।
ঢাকা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি অধ্যক্ষ আফজাল হোসেনের সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তৃতা করেন জেলা আমির মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন।ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতের শাসকরা গুম, খুন ও ‘আয়নাঘর’ সংস্কৃতির মাধ্যমে দেশকে ভয়াবহ অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার।