ফেসবুক-টিকটকে ভোটের জমজমাট লড়াই - Alokitobarta
আজ : রবিবার, ৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
নিয়ন্ত্রণহীন চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার,নিষ্ক্রিয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গায়ে হাত তোলার দাবি, কিন্তু ঘটনাস্থলে নেই ক্যামেরা,মামলার এজাহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন বিএনপি ছেড়ে জামায়াতে যোগ দেয়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়েছে ৬ টাকার বিদ্যুৎ ১২ টাকায় ব্যয় ৩১টি কারিগরিভাবে নষ্ট,৬০ শতাংশ মেডিকেল অক্সিজেন প্ল্যান্ট অচল রোগীর পথ্য এখন বিলাসপণ্য শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ,বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্ব বিআরটিসির ডিজিএম আশরাফুল আলমের খুঁটির জোর কোথায় : প্রধানমন্ত্রী ও দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে কর্মক...

ফেসবুক-টিকটকে ভোটের জমজমাট লড়াই


মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।দলীয় প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে ভোটারদের জন্য কে কী করবেন-সেই স্বপ্নের কথাও শোনাচ্ছেন।রিলস-গ্রাফিক পোস্টেও ভোটার সংযোগের কাজ চলছে বেশ উৎসাহের সঙ্গে। নির্বাচনি এই প্রচারের সঙ্গে আবার আছে কিছু অপপ্রচারও।এক দল আরেক দলকে বা এক প্রার্থী আরেক প্রার্থীকে আক্রমণ করছেন। সেটিও সাধারণ মানুষের কাছে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি প্রচারে অপতথ্য ও ভুয়া কনটেন্ট প্রার্থীদের শঙ্কায় ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরো প্রচারকাজ এমনকি অপতথ্য বা অপপ্রচার ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনকে আরও সক্রিয় হতে হবে। সাধারণ মানুষ দেখছেন, শুনছেন, ভাবছেন-আলোচনা করছেন। তারা এবার প্রতীক বেছে নেবেন নাকি যোগ্য প্রার্থী, সেটিও আছে আলোচনায়। বড় দলের শীর্ষ নেতাদের গণসংযোগ, বক্তব্য বা দৈনন্দিন নির্বাচনি প্রচারকাজ মূলধারার গণমাধ্যমে জায়গা পেলেও ছোট দল বা স্বতন্ত্র অনেক প্রার্থীর প্রচার-প্রচারণা প্রকাশ বা প্রচারে ঠাঁই না মিললেও থেমে নেই কারোরই প্রচারকাজ। তাদের প্রায় সবারই রয়েছে সাইবার টিম। সেই টিমের সদস্যরা প্রার্থীর সব ধরনের কার্যক্রম অনুসরণ করেন। রেকর্ড করেন। ফেসবুক-ইউটিউবে সরাসরি প্রচারে নিযুক্ত থাকেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে প্রার্থীদের প্রচারকেন্দ্র।

এবারের নির্বাচনে চিরচেনা পোস্টার, ব্যানার ও দেওয়াললিখন নেই। যদিও কোনো কোনো প্রার্থী আচরণবিধি ভঙ্গ করে কিছু কিছু পোস্টার-ব্যানার সাঁটাচ্ছেন। তবে নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধের কারণে সেটি প্রকাশ্যে করা সম্ভব নয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জমজমাট প্রচারে নির্ভরতা বেড়েছে প্রার্থীদের। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা, বিভাগীয় শহর-নির্বাচনি প্রচারণার বড় অংশ এখন অনলাইনভিত্তিক। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্সের (সাবেক টুইটার) মতো প্ল্যাটফর্মই দলের পাশাপাশি প্রার্থীদের প্রচারমাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পোস্টার ও ব্যানার ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এবং তুলনামূলকভাবে নন-হেভিওয়েট প্রার্থীদের মেইনস্ট্রিম গণমাধ্যমে চাহিদামতো কাভারেজ না পাওয়ায় বিকল্প মাধ্যম হিসাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের সব কার্যক্রম তুলে ধরছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া একদিকে ছোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, বড় দলগুলোর প্রার্থীদের খবর বেশি কাভারেজ পাচ্ছে, আর স্বতন্ত্র বা ছোট প্রার্থীরা অনেক সময় মিডিয়ার নজর এড়িয়ে যাচ্ছেন। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া কাভারেজ না দেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সোশ্যাল মিডিয়া ছোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। এতে তারা সরাসরি ভোটারের কাছে পৌঁছাতে পারছেন। তবে ফেক নিউজ, গুজব ও অপপ্রচারের ঝুঁকি বেড়েছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য প্রার্থীদের ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে ভোটাররা বিভ্রান্তও হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই এসব অপপ্রচার থেকে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো এই অপপ্রচার শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।

১১ দলীয় জোটের (এনসিপি) মনোনীত ঢাকা-২০ আসনের প্রার্থী প্রকৌশলী নাবিলা তাসনিদ বলেন, টেলিভিশন চ্যানেল বা পত্রিকায় বড় দলগুলোর আধিপত্য বেশি দেখা যায়। সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে আমাদের অনেক কষ্ট হতো। তিনি বলেন, একটি ফেসবুক লাইভ বা ইউটিউব ভিডিও মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যা প্রচলিত প্রচার পদ্ধতিতে সম্ভব নয়। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে মোট ভোটারের একটি বড় অংশই তরুণ, যাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় সময় কাটে স্মার্টফোনকেন্দ্রিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। প্রচলিত গণমাধ্যমের তুলনায় ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই তারা বেশি সক্রিয় থাকেন। হ্যাশমেটা নামের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী সাড়ে ৪ কোটির বেশি। টিকটক ব্যবহারকারী প্রায় ২ কোটি। ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩ কোটির বেশি। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাতে তুলনামূলকভাবে কম খরচ হয় এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। একটি ছোট ভিডিও, লাইভ বক্তব্য কিংবা গ্রাফিক পোস্টের মাধ্যমেই প্রার্থীরা তাদের কর্মসূচি, প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক অবস্থান সহজ ভাষায় তুলে ধরতে পারছেন। এতে তরুণ ভোটাররা সরাসরি প্রার্থীদের বক্তব্য জানতে পারছেন, মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরশীলতা কমছে। একই সঙ্গে ভোটারদের পক্ষেও তথ্য সংগ্রহ সহজ হয়ে গেছে। কারা প্রার্থী, তাদের অতীত কর্মকাণ্ড, নির্বাচনি অঙ্গীকার কিংবা বিতর্কিত বক্তব্য-সবই এখন কয়েকটি ক্লিকেই পাওয়া যাচ্ছে। ফলে তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতার সুযোগও বাড়ছে।৭০ লাখের বেশি ফলোয়ারযুক্ত ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা। প্রতিদিন সক্রিয় থাকছেন ফেসবুকে। নির্বাচনি ইশতেহার, ভিডিও পোস্টের মাধ্যমে তুলে ধরছেন পরিকল্পনা, সহায়তা চাচ্ছেন সমর্থকদের কাছে। তার ফলোয়াররাও লাইক, শেয়ার এবং কমেন্টে জানাচ্ছেন পছন্দের প্রার্থীকে নিয়ে উচ্ছ্বাস। দিচ্ছেন পরামর্শও।

নারী প্রার্থীদের মধ্যে ঢাকা-১৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলির সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলোয়ার রয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার। তিনি নিয়মিত ভিডিও পোস্টের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছাচ্ছেন, ভোটে জিতলে কী কী কার্যক্রম করবেন, তা তুলে ধরছেন। এছাড়া পেজ থেকে গণসংযোগের ভিডিও, ফটোকার্ডসহ বিভিন্ন আপডেটও দেওয়া হচ্ছে, যা ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করছে।বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা বলেন, ‘টিভি চ্যানেলের সামনে বসে রাজনীতির খবর খুব বেশি দেখা হয় না। কোন প্রার্থী কী বলছেন, কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন-সবকিছুই ফেসবুক বা ইউটিউবেই দেখি। অনেক সময় প্রার্থীদের লাইভ বক্তব্য বা ছোট ভিডিও দেখেই তাদের অবস্থান বোঝা যায়। এতে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়। কে কী বলছেন, কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন-সবই সহজে অনলাইনে পাওয়া যায়।

প্রচারে নেতিবাচক দিক নিয়ে কথা বলেন বিএনপি দলীয় লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের প্রার্থী আশরাফ উদ্দিন। তিনি জানান, তার নামে এমন পোস্ট ছড়ানো হয়েছে, যা তিনি কখনো করেননি। অপপ্রচারের কারণে কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি, যেন এ ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এদিকে এবারের নির্বাচনি প্রচারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। বিভিন্ন ধরনের ডিপফেক ভিডিও, ছবি ও কনটেন্ট তৈরি করে প্রচার-অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়াকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় অভিযোগ অপপ্রচারের।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক ইমরান হোসেন বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে অল্পসময়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠী এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব। তবে এর বিপরীত প্রভাবও আছে, ধর্মীয় বিদ্বেষ, বিভাজন এবং সহিংসতা দ্রুত ছড়াতে পারে। একটি ছোট ক্লিপই পুরো ক্যাম্পেইন ভেঙে দিতে পারে।

সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় পাওয়া তথ্যকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে। রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ফেসবুকে যা দেখি, সেটাই অনেক সময় সত্য মনে হয়। তথ্য যাচাই করার সুযোগও থাকে না। এছাড়া দেখা যায়, একই ঘটনার সংবাদ বা ছবি একাধিক আইডি থেকে একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে, যা সত্যতা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে।বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দলীয়ভাবে সরব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফেসবুকে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি ‘কার্ড নয়, কাজ দেব’, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ’-এমন স্লোগান ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের প্রচারণায় জুলাই আন্দোলনে নিজেদের অবদানের দাবিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষেও তারা জোরালো প্রচার চালাচ্ছেন অনলাইনে। এনসিপিও অনলাইনে বিরামহীন প্রচার চালাচ্ছে। কোথায় সভা, কোথায় ভোট চাওয়া হচ্ছে, তার লাইভ ভিডিও ও ছবি সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে। দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ডিজিটাল প্রচারণাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

Top