ক্ষমতায় গেলে জনগণের সম্পদে হাত দেব না
মোহাম্মাদ মহাব্বাতুল্লাহ মাহাদ : আল্লাহর নামে তিনবার শপথ করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতি আমাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করলে জনগণের সম্পদের ওপর আমরা হাত দেব না। আমরা দলীয় নেতাকর্মীদের পেট ভরার রাজনীতি করি না। তিনি বলেন, ৫৪ বছর ধরে দেশটাকে খাবলে-খামছে একেবারে তছনছ করে দিয়েছে। তরুণ প্রজন্ম ও নারীরা পুরোনো বস্তাপচা রাজনীতি আর ফেরাবে না। চাঁদাবাজদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সত্যিই যদি সংসারে অভাব-অনটনের কারণে আপনারা এই কাজ করেন, এখান থেকে সরে আসুন। আল্লাহ আমাদের যে রিজিক দিয়েছেন, ওইটাই আপনাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খেতে রাজি আছি।
সোমবার দুপুরে কুষ্টিয়ায় আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম এবং মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ১১ দলীয় জোট আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি, যারা ৫৪ বছর ধরে দেশটাকে খাবলে-খামছে একেবারে তছনছ করে দিয়েছে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চরিত্র পরিবর্তন না হলে দেশের জন্য ভালো কিছুই করতে পারবে না। মামলা বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর আমরা অন্যায়ভাবে কারও বিরুদ্ধে একটি মামলাও করিনি। আমাদের দেওয়া আটটি মামলায় একজন করে আসামি করা হয়েছে। কারণ দ্বিতীয় কোনো দোষী ব্যক্তিকে আমরা খুঁজে পাইনি। অথচ কেউ কেউ হাজার হাজার মামলা দিয়ে ডায়ালগ শুরু করেছে-নাম ঢুকে গেছে, এখন নাম তুলতে হলে মাল-পানি (টাকা) লাগবে, এভাবেই শুরু হয়েছে মামলা বাণিজ্য।
জামায়াত আমির বলেন, কুষ্টিয়ার চালকল ও পণ্যবাহী ট্রাক থেকে অবৈধ খাজনা (চাঁদা) আদায় করা হচ্ছে। ট্রাকপ্রতি ৫ হাজার টাকা নেওয়ার খবর আমরা জানি। বিভিন্ন স্ট্যান্ড দখলের খেলা চলছে। যারা এসব করছেন, ফিরে আসুন। মানুষ আপনাদের ঘৃণা করে, অভিশাপ দেয়। পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট নির্মূলের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, আমরা চাঁদাবাজদের বুক থেকে দূরে ঠেলে দেব না, বরং তাদের বুকে টেনে নিয়ে ভালো কাজে যুক্ত করব।বক্তব্যের শুরুতে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, এই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে-এ দেশের তরুণরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে পরোয়া করে না। শাসকরা ফাহাদ ও হাদিদের বিদায় করেছে, কিন্তু তাদের রক্তে আজ হাজারো বিপ্লবী তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, গত ১৭ বছর গুমের শিকার পরিবারগুলো সবচেয়ে বড় মজলুম। যে জাতি মায়েদের সম্মান করতে পারে না, তারা বিশ্বব্যাপী অপমানিত হয়। আমরা এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে সবার হাতে সম্মানের কাজ তুলে দেওয়া হবে।
জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দেশের সব সেক্টরে পরিবর্তন আসবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের সরকার কুষ্টিয়া চিনিকল পুনরায় চালু করবে। নারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের এত তালা কেনার টাকা নেই যে নারীদের ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখব। আমরা নারীদের জন্য নিরাপদ সমাজ ও কর্মস্থল নিশ্চিত করব। বড় শহরগুলোতে আলাদা বাস সার্ভিস চালু করা হবে, যাতে নারীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারেন। জামায়াত ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতি থেকে ভিখারি পর্যন্ত সবার জন্য একই বিচার নিশ্চিত করা হবে।কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির ও কুষ্টিয়া-২ আসনের দলীয় প্রার্থী আব্দুল গফুরের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শিবগাতুল্লাহ শিবগা, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি সুজা উদ্দিন জোয়ার্দ্দার, কুষ্টিয়া-৩ আসনের প্রার্থী মুফতি আমির হামজা, কুষ্টিয়া-১ আসনের প্রার্থী বেলাল উদ্দিন, কুষ্টিয়া-৪ আসনের প্রার্থী আফজাল হোসাইন ও কুষ্টিয়া শহর জামায়াতের আমির এনামুল হক প্রমুখ।
চাঁদাবাজদের পুনর্বাসন নয়, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে : মেহেরপুর প্রতিনিধি জানান, মেহেরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বিগত সব সরকারের উদ্দেশে বলেন, কেউ বলতে পারবেন না আমাদের সময় দুর্নীতি হয়নি। কেউ বলতে পারবেন না আমাদের সময় দেশের মানুষের সম্পদ লুটতরাজ হয়নি। কেউ বলতে পারবেন না আমাদের সময় ব্যাংক ডাকাতি হয়নি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতি আমাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করলে আল্লাহর কসম, আল্লাহর কসম, আল্লাহর কসম জনগণের সম্পদের ওপর আমরা হাত দেব না। আমরা জনগণের চৌকিদার হয়ে আমানত হেফাজত করব। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ বৃদ্ধি হতে দেব না। প্রতিবছর আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরব। চাঁদাবাজদের পুনর্বাসন নয় বরং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। মেহেরপুর-১ আসনের প্রার্থী মাও.লানা মো. তাজউদ্দীন খান এবং মেহেরপুর-২ গাংনী আসনের প্রার্থী মো. নাজমুল হুদার সমর্থনে এ জনসভার আয়োজন করা হয়।
১২ তারিখে আরেকটা বিপ্লব ঘটাতে হবে : চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, সোমবার বিকালে চুয়াডাঙ্গা টাউন মাঠে ১১ দলের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য, তুমি দুর্নীতিবাজ তোমাকে লাল কার্ড, তুমি চাঁদাবাজ তোমাকে লাল কার্ড, তুমি দখলবাজ তোমাকে লাল কার্ড, তুমি আবালবৃদ্ধবনিতাকে সম্মান করো না তোমাকে লাল কার্ড, এদেশের ফ্যাসিজমকে চিরতরে লাল কার্ড। চাঁদাবাজ, দখলবাজ, টেন্ডারবাজ, মামলাবাজ এই চুয়াডাঙ্গাকে গিলে খাক, তা কি আপনারা চান? যদি না চান চব্বিশের ৫ আগস্ট যেমন একটা বিপ্লব হয়েছিল ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে আরেকটা বিপ্লব ঘটাতে হবে। চব্বিশের বিপ্লব ছিল বুলেটের বিরুদ্ধে। এবারের বিপ্লব হবে ব্যালটের মাধ্যমে দেশে ন্যায় ও ইনসাফ কায়েমের জন্য, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য, আধিপত্যবাদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য।
কেউ কেউ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার ভয়ে জামায়াতের নারী কর্মীদের সঙ্গে অমানবিক ও অভদ্র আচরণ করছে দাবি করে তিনি বলেন, মনে রাখবা, আমাদের জীবনের চেয়ে আমাদের মা-বোনদের ইজ্জতের দাম আমাদের কাছে অনেক বেশি। সুতরাং বেয়াদবি করলে আগুনের ফুলকি দেখতে পাবা। কাউকে আমরা ছেড়ে কথা বলব না। যুক্তি নিয়ে এসো, কর্মসূচি নিয়ে এসো। ভদ্রভাবে, শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনি মাঠে তুমি তোমার মতো করে খেলো। কিন্তু যদি ফ্যাসিবাদী চেহারা নিয়ে কেউ আমাদের সামনে আসে, চব্বিশের ফ্যাসিবাদকে এ দেশের সম্মিলিত জনগণ, বিশেষ করে যুবসমাজ যেভাবে লাল কার্ড দেখিয়েছে, ১২ তারিখে সেই লাল কার্ড দেখিয়ে দেওয়া হবে।