যথেচ্ছ আড়ি পাতা রোধে জারি হচ্ছে অধ্যাদেশ - Alokitobarta
আজ : সোমবার, ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যথেচ্ছ আড়ি পাতা রোধে জারি হচ্ছে অধ্যাদেশ


নুর নবী জনী : টেলিফোনে আড়ি পাতা ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সরকার বিদ্যমান টেলিযোগাযোগ আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করতে যাচ্ছে।তবে জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষার প্রশ্নে এ ধরনের সংশোধনী আনাসহ বেশকিছু প্রস্তাবের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। এ কারণে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশটি সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। খসড়া অধ্যাদেশে ফোনে আড়ি পাতার আগে সংশ্লিষ্ট আধা বিচারিক আদালতের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়।

সূত্র বলছে, বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেওয়া আপত্তির বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করতে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এত তাড়াহুড়া করে অধ্যাদেশ জারির পক্ষে একমত নন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানায়, আধা বিচারিক আদালতের অনুমতি নেওয়ার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং স্পিকারের নেতৃত্বে একটি কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে আড়ি পাতলেও পরে কাউন্সিল থেকে ভূতাপেক্ষভাবে অনুমোদন করে নিতে হবে। তবে কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা রাখার বিধান রাখা হচ্ছে। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি নিষ্পত্তি করে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে অধ্যাদেশটি জারি করা হবে। ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ওসমান সরোয়ার বলেন, দেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন সংস্থা এনটিএমসিতে কাজ করছে। এগুলো সবই সরকারি এজেন্সি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কার ফোনে কে কখন আড়ি পাতে, এটি এনটিএমসির জানার কথা নয়। কারণ, বিভিন্ন এজেন্সির লোকবল এখানে এসে তাদের মতো করে কাজ করেন। তবে এখানে কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার দায়দায়িত্ব নেবে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। এনটিএমসি নেবে না। তিনি বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে এনটিএমসি শুধু দেশের নিরাপত্তা সুরক্ষার প্রশ্নে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকে।

ভুক্তভোগী মহলসহ একাধিক সূত্র জানায়, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে টেলিফোনে আড়ি পাতার বিষয় একরকম যথেচ্ছ গোপন কারবার। অভিযোগ আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের যেসব সংস্থা এ ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তাদের কেউ কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে সমাজের এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির টেলিফোনে আড়ি পাতার কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন, যার সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং বেশির ভাগ কারণের পেছনে কাজ করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা দ্বান্দ্বিক বিষয়। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, এমনকি এ ক্ষমতাকে পুঁজি করে ইন্টারসেপশনে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন সিপাহি এবং এএসআই-এর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ অনেকটা প্রতিষ্ঠিত।

এদিকে ফোনে আড়ি পাতার ক্ষমতার অপব্যবহার করা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন ফোরামে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার) ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নাগরিকদের ডেটা বা ফোন কলের অপব্যবহার না করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল বারী বলেন, ১৭/১৮টি সংস্থা আড়ি পাতার বিষয়টি বিভিন্ন ফোরামে বিশেষ সহকারী উপস্থাপন করেছেন। তবে এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এনটিএমসির বিষয়।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের ১৮টি সংস্থা যেভাবে ফোনে আড়ি পাতছে বা নজরদারি করছে, সেটি একেবারেই ঠিক নয়। বলা যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার। গত ১৬ বছরে আড়ি পাতা বা নজরদারির যে সিস্টেম চালু ছিল, এর কোনো পরিবর্তন এখনো হয়নি। শুধু কিছু মানুষের পরিবর্তন হয়েছে। তিনি বলেন, এভাবে ঢালাও আড়ি পাতা একপ্রকার আত্মঘাতী। সরকারের দায়িত্বশীলদের বিষয়টি উপলব্ধি করা দরকার।

এদিকে নাগরিকদের ফোন কলের সুরক্ষা এবং টেলিকম খাতের আধুনিক প্রযুক্তি উপযোগী করতে সরকার টেলিযোগাযোগ আইন, ২০১০ সংশোধন করে টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া চূড়ান্ত করছে। কয়েকদিনের মধ্যে এটি উপদেষ্টা পরিষদে উঠতে পারে।

তবে কল ফাঁসের ইস্যুটি নিয়ে পর্দার আড়ালে এক ধরনের অদৃশ্য দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গেছে টেলিযোগাযোগ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ফোনালাপ রেকর্ড করার এখতিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। ফলে তারা এটি নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় বলছে, এটি তাদের আওতাধীন বিষয়।বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বলেন, সীমান্তে চোরাচালান বন্ধে তাৎক্ষণিক অনেক খবর নিতে হয়।

কল রেকর্ড পেতে দেরি হলে দেশের ক্ষতি হবে।

এনটিএমসির ডিজি মোহাম্মদ ওসমান সরোয়ার বলেন, এনটিএমসি মনে করে, আড়ি পাতার ক্ষেত্রে মানবাধিকার সুরক্ষা এবং জবাবদিহি থাকা দরকার। তবে এটি অবশ্যই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকতে হবে। নতুবা সমস্যা হবে। তিনি বলেন, স্পর্শকাতর এই অধ্যাদেশ সংশোধন তাড়াহুড়া করা ঠিক হচ্ছে না। সবার মতামত নেওয়া দরকার। তারপর এটি অনুমোদন করলে ভালো হবে।

সংশোধনীতে যা থাকছে : টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০৬ সালের ৯৭-ক ধারায় বলা আছে, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, তদন্তকারী এবং গোয়েন্দা সংস্থা কল রেকর্ড করতে পারবেন। এই ধারাটি নিয়ে যতসব বিতর্ক। খসড়া টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশে এনটিএমসির নাম পরিবর্তন করে সেন্ট্রাল ইন্টারসেপশন প্ল্যাটফর্ম নামকরণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আড়ি পাতার বিষয়ে অনুমোদন নিতে হবে। এজন্য আধা বিচারিক আদালত থাকবে। টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এমন প্রস্তাবসহ সংশোধিত প্রস্তাবিত অধ্যাদেশটি গত মাসে উপদেষ্টা পরিষদে পাঠানো হয়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আপত্তির কারণে তা মন্ত্রণালয়ে ফেরত আসে। এ ব্যাপারে আপত্তিগুলো নিষ্পত্তি করতে দায়িত্ব দেওয়া হয় পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে।

সর্বশেষ জানা যায়, অধ্যাদেশের ৯৭ ধারায় আধা বিচারিক আদালত থেকে অনুমোদন নেওয়ার বিষয়টি থাকছে না। এর পরিবর্তে রাস্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং স্পিকারের প্রতিনিধি নিয়ে একটি কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে অনুমতি ছাড়া কল রেকর্ড করতে পারবে সংস্থাগুলো। পরে তারা সেটি কাউন্সিলের কাছে অনুমোদন নিয়ে নেবে। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, নিয়ম না মেনে কেউ আড়ি পাতলে তার জন্য শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়া অধ্যাদেশে।

Top